কুমিল্লার চান্দিনায় ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের দুই নেতাকে গুলি করার অভিযোগে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) মহাসচিব ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেদোয়ান আহমেদকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল সোমবার বেলা পৌনে ৩টার দিকে চান্দিনা পৌরসভা ভবনসংলগ্ন চান্দিনা রেদোয়ান আহমেদ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ক্যাম্পাস-২-এর সামনে গুলি ছোড়ার ওই ঘটনা ঘটে।
রেদোয়ান নিজ গাড়িতে বসে নিজের লাইসেন্স করা শটগান দিয়ে তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন বলে দাবি ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক নেতাকর্মীদের। আর রেদোয়ান আহমেদ বলেছেন, কলেজে এলডিপির পূর্বনির্ধারিত একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গেলে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীরা তার গাড়িতে হামলা চালালে আত্মরক্ষার জন্য তিনি গুলি ছুড়তে বাধ্য হন। এদিকে রেদোয়ান আহমেদ হামলার শিকার হয়েছেন দাবি করে এ ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো আলাদা আলাদা বিবৃতিতে তারা রেদোয়ানকে গ্রেপ্তারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ এবং এলডিপি ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গতকাল বিকেলে চান্দিনা উপজেলা সদরের রেদোয়ান আহমেদ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ক্যাম্পাস-২-এর মমতাজ আহমেদ ভবনের মিলনায়তনে এলডিপির ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। একই জায়গায় কর্মিসভার আয়োজন করে ছাত্রলীগ। সেখানে বিপক্ষদলীয় দুটি রাজনৈতিক সংগঠনের সমাবেশকে কেন্দ্র করে গতকাল সকাল থেকেই কলেজ ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। মমতাজ আহমেদ ভবনের সামনে ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাকর্মীরা আগে থেকেই অবস্থান করছিল। বেলা পৌনে ৩টার দিকে গাড়ি নিয়ে ক্যাম্পাসের সামনে আসার পর কলেজ ফটকে ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতারা রেদোয়ান আহমেদের গাড়ি থামিয়ে কথা বলেন। এর কিছুক্ষণ পর তিনি গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যাওয়ার সময় স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগ কর্মীরা ওই গাড়িতে তরমুজ ছুড়ে মারেন। এ সময় রেদোয়ান আহমেদ গাড়িটি থেকে পরপর দুই রাউন্ড গুলি ছোড়েন। এতে ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের দুই কর্মী গুলিবিদ্ধ হন। তখন স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগ কর্মীরা ধাওয়া করলে আত্মরক্ষার জন্য চান্দিনা থানায় গিয়ে আশ্রয় নেন রেদোয়ান আহমেদ। এ সময় উত্তেজিত ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাকর্মীরা চান্দিনা থানার প্রধান ফটক ঘেরাও করে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে কুমিল্লার জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (দাউদকান্দি সার্কেল) মো. ফয়েজ ইকবাল রেদোয়ান আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। এরপর এলডিপি মহাসচিবকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়। গুলিবর্ষণের এ ঘটনার পর থেকে উপজেলা সদরসহ পুরো চান্দিনা থানা এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
গুলিবিদ্ধরা হলেন চান্দিনা পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদস্য রূপনগর এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম সরকারের ছেলে মাহমুদুল হাসান ওরফে জনি সরকার (২২)। মাহমুদুল পৌর ছাত্রলীগ সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। অন্যজন উপজেলার চান্দিয়ারা গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে নাজমুল হোসেন (২৮)। তিনি উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য। আহত দুজনকে চান্দিনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসার পর কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে চান্দিনা উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সামিরুল খন্দকার রবি অভিযোগ করে বলেন, ‘রেদোয়ান আহমেদ কলেজ ছাত্রলীগ ঈদের আগে থেকেই ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান করতে প্রস্তুতি নিয়েছে। এরই মধ্যে পৌর এলডিপিও একইদিন একই স্থানে ঈদ পুনর্মিলনীর আয়োজন করে। দুপুর থেকে ছাত্রলীগের আয়োজনে যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীরা কলেজ ক্যাম্পাসে আসতে শুরু করে। পরে রেদোয়ান আহমেদ গাড়ি নিয়ে ক্যাম্পাসের সামনে এসে গাড়ি থেকে দুটি গুলি করে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে থানায় গিয়ে আশ্রয় নেন।’
আর পৌর স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা কাজী আখলাকুর রহমান জুয়েল বলেন, ‘রেদোয়ান আহমেদ রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করতে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর অমানবিকভাবে গুলি চালান।’
তবে রেদোয়ান আহমেদের দাবি, তিনি আত্মরক্ষার জন্য গুলি চালিয়েছেন। থানায় তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, ‘আমাদের পূর্বনির্ধারিত প্রোগ্রাম ছিল। আমাকে প্রধান অতিথি করে চিঠির মাধ্যমে পৌর এলডিপি কার্যক্রম পরিচালনা করে। এরই মধ্যে আমাদের প্রধান ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগকে প্রোগ্রাম করার জন্য অনুমতি দেওয়া হয়। ক্যাম্পাস-২-এর মমতাজ আহমেদ ভবনে আমাদের পূর্বনির্ধারিত প্রোগ্রাম করার কথা ছিল। দুপুরে আমি ক্যাম্পাস-২-এর সামনে গেলে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের লোকজন আমার গাড়িতে হামলা করে। আমি আত্মরক্ষার্থে আমার লাইসেন্স করা শটগান দিয়ে গুলি চালাই। কার গায়ে গুলি লেগেছে আমি বলতে পারব না। পরে আমি থানায় এসে আশ্রয় নিই।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কুমিল্লার জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (দাউদকান্দি সার্কেল) মো. ফয়েজ ইকবাল গতকাল বিকেলে বলেন, ‘জনগণের রোষানলে পড়ে রেদোয়ান আহমেদ থানায় আশ্রয় নিতে আসলে আমরা তাকে আটক করি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ ঘটনায় মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।’
মির্জা ফখরুল ও অলি আহমদের নিন্দা-প্রতিবাদ : রেদোয়ান আহমেদ হামলার শিকার হয়েছেন দাবি করে এ ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলেন, ‘একদিকে বর্তমান সরকার তাদের বক্তৃতা, বিবৃতিতে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ চাইছে, অন্যদিকে সরকার তার দলীয় সন্ত্রাসীদের দিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশে নেতৃবৃন্দের ওপর হামলা করছে। এতে করে আগামী নির্বাচনে সরকার কী করবে তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘চান্দিনায় এক সভায় আওয়ামী সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা এলডিপি মহাসচিবের গাড়িতে বর্বরোচিত হামলা, গাড়ি ভাঙচুর, বাড়িতে হামলা চালিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেছে। শুধু তাই নয়, হামলার পর আত্মরক্ষার্থে থানায় আশ্রয় নেওয়ার পর পুলিশ আবার রেদোয়ান আহমেদকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। এ ঘটনা গভীর উদ্বেগের।’ মির্জা ফখরুল অবিলম্বে এলডিপি মহাসচিবের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিরও দাবি জানান।
অন্যদিকে এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হামলার মুখে থানার ভেতরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন আমাদের দলের মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আটক করে এখন নতুন করে মামলা সাজাচ্ছে তার বিরুদ্ধেই। এর মাধ্যমে পুলিশ রক্ষক হয়ে ভক্ষকের পরিচয় দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘রেদোয়ান আহমেদের গাড়িতে যেভাবে ন্যক্কারজনক হামলা চালানো হয়েছে তা বর্তমান গণবিচ্ছিন্ন সরকারের আমলে চলমান সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের আরও একটি ঘৃণ্য বহিঃপ্রকাশ।’
বিবৃতিতে এলডিপির মহাসচিবের গাড়িতে হামলার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং রেদোয়ান আহমেদের মুক্তি দাবি করেন অলি আহমদ।
