‘অশনির’ শঙ্কা কাটছে বৃষ্টিপাতে

আপডেট : ১০ মে ২০২২, ০২:০০ এএম

আশঙ্কা ছিল ঘূর্ণিঝড় অশনি ভারত ও বাংলাদেশের ওপর আছড়ে পড়তে পারে। কিন্তু আন্দামানের কাছে তৈরি হওয়া এই ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি ক্রমশ কমছে। গতকাল সোমবার সকালেও ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রে বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১১০ থেকে ১২০ কিলোমিটার। দুপুরে তা কমে দাঁড়ায় ৯৫ থেকে ১০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা। আর সন্ধ্যায় ছিল ৮৯ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, মঙ্গলবার সকালে নিজের চরমে পৌঁছাবে অশনি। তবে তা অতি ভীষণ সাইক্লোন হওয়ার আশঙ্কা নেই। উপকূলের সমান্তরালে এগোতে থাকা ঘূর্ণিঝড়টি শেষ পর্যন্ত স্থলভাগে আঘাত না-ও হানতে পারে। তবে এর প্রভাবে বাংলাদেশ ও ভারতের কয়েকটি রাজ্যের উপকূলীয় জেলাগুলোতে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। আর বৃষ্টি ঝরিয়ে সাগরেই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে সেটি। সেটি যদিও দিক বদলে স্থলে আঘাত হানেও, তবে তা  সাধারণ ঘূর্ণিঝড় হিসেবেই আছড়ে পড়বে। বুধবারই গভীর নিম্নচাপে পরিণত হবে অশনি।

‘ঘূর্ণিঝড় অশনি’ এখনো বাংলাদেশ উপকূল থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে রয়েছে। তবে এর প্রভাবে বরিশাল থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত দেশের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে এরই মধ্যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এতে করে উপকূলীয় অঞ্চলে রবি ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কাও রয়েছে।

গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছে, গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় চট্টগ্রাম থেকে ১১০০ কিলোমিটার দূরে ছিল এই ঘূর্ণিঝড়। কক্সবাজার থেকে এর দূরত্ব ছিল ১০৪৫ কিলোমিটার। মোংলা বন্দর থেকে দূরত্ব ছিল ৯৯০ কিলোমিটার আর পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে দূরত্ব ছিল ৯৮৫ কিলোমিটার। 

ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের কাছে সাগর বিক্ষুব্ধ থাকার জন্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ২ নম্বর দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অফিস। সমুদ্র বিক্ষুব্ধ থাকবে বলে মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার উপকূলের কাছে সাবধানে চলাচল করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তাদের গভীর সমুদ্রে না যাওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

তবে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের উপকূলে বড় ধরনের আঘাত হানবে কি না, তা নিয়েও একধরনের ধোঁয়াশা রয়েছে আবহাওয়াবিদের। তারা বলছেন, ঘূর্ণিঝড়টির গতিমুখ এখন পর্যন্ত ভারতের অন্ধ্র উপকূলের দিকে রয়েছে। তবে আজ (মঙ্গলবার) ঝড়টি দিক পরিবর্তন করে কোন দিকে যায় তা বোঝা যাবে। শেষ পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড়টি  দুর্বল হয়ে বঙ্গোপসাগরেই শেষ হয়ে যেতে পারে বলে মনে করেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা।

ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, অশনির প্রভাবে সোমবার রাত থেকেই দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলোতে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে কলকাতা, হাওড়া, পূর্ব মেদিনীপুর, উত্তর-দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও নদিয়া জেলায়। আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বৃষ্টি নামতে পারে এই জেলাগুলোতে।  মঙ্গলবার থেকে ওড়িশার দিকে ঘুরতে পারে ঘূর্ণিঝড় অশনির গতিপথ। সন্ধ্যানাগাদ পৌঁছাতে পারে উপকূলের খুব কাছে। ইতিমধ্যে এই ঝড়ের প্রভাব শুরু হয়েছে দক্ষিণবঙ্গে। পূর্বাভাস অনুযায়ী অশনির প্রভাবে ভিজবে উপকূলবর্তী সব জেলা।

এদিকে বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় অশনি আঘাত হানার আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ঘূর্ণিঝড় অশনি ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশে আঘাত হানতে পারে আগামীকাল। এরপর দুর্বল হয়ে যাবে। তাই বাংলাদেশে এটি আঘাত হানার আশঙ্কা নেই।

তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় অশনি এখন সুপার সাইক্লোন হয়ে অন্ধ্রপ্রদেশের দিকে অবস্থান করছে। এটি ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। তবে ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় ব্যাপক পদক্ষেপ নিয়েছিল।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ছানাউল হক মণ্ডল বলেন, ঘূর্ণিঝড়টি আগামীকালের (আজ মঙ্গলবার) মধ্যে তার গতিমুখ বদলাতে পারে। এতে করে যেদিকেই তার গতিপথ পরিবর্তন করুক না কেন কিছুটা দুর্বল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে করে উপকূলীয় অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে ভারী বর্ষণের সতর্কবাণীতে বলা হয়, পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও আশপাশের এলাকায় অবস্থানরত প্রবল ঘূর্ণিঝড় অশনির অগ্রবর্তী অংশের প্রভাবে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী (২৩ থেকে ৪৩ মিলিমিটার) থেকে অতি ভারী (৮৯ মিলিমিটার বা তারও বেশি) বর্ষণ হতে পারে।

গতকাল উককূলের কয়েক জেলায় বৃষ্টি শুরুও হয়েছে। ভোলায় ঘূর্ণিঝড় অশনির প্রভাবে বৃষ্টিপাত বাড়ছে। জেলার সবখানেই থেমে থেমে মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ হচ্ছে। সকাল থেকেই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন রয়েছে। মেঘনা ও সাগর মোহনার পানি স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে।

অশনির প্রভাবে পটুয়াখালীর উপকূলীয় এলাকার আকাশ বেশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে আছে। গতকাল ভোররাত থেকে টানা হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হয়। মাছ ধরা বন্ধ করে গভীর সাগরে অবস্থানরত ট্রলারগুলো সার বেঁধে উপকূলে ফিরতে শুরু করেছে। কয়েক শ মাছ ধরার ট্রলার ইতিমধ্যে মহিপুর-আলীপুর মৎস্য বন্দরের লতাচাপলী পোতাশ্রয়ে আশ্রয় নিয়েছে।

ঈদ-পরবর্তী ছুটিতে সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটায় অবস্থান করছে কয়েক হাজার পর্যটক। এসব পর্যটককে নিরাপদে চলাচলসহ সাগরে সাঁতার না কাটার জন্য ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে ট্যুরিস্ট পুলিশসহ স্থানীয় প্রশাসন। বৃষ্টিপাতের ফলে রবিশস্যের ক্ষতির শঙ্কায় রয়েছেন কৃষক।

খুলনাজুড়ে মাঝারি ও ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। তবে দমকা বা ঝড়ো বাতাস নেই। গতকাল সোমবার বেলা ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত জেলায় ১৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।

খুলনা আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ আমিরুল আজাদ বলেন, খুলনায় সোমবার বেলা ১১টা থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ৩টা পর্যন্ত খুলনায় ১৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত এটি অব্যাহত থাকবে। আগামীকাল বুধবার  ঘূর্ণিঝড়টি উপকূলে আঘাত হানতে পারে। তখন কিছুটা জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হতে পারে।

খুলনা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা রনজিত কুমার সরকার বলেন, ঘূর্ণিঝড় অশনির প্রভাবে ২ নম্বর সতর্ক সংকেত চলছে। এতে ঝুঁকি কম। তবুও প্রতিটি উপজেলায় সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত প্রবল ঘূর্ণিঝড় অশনির প্রভাবে বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে বরগুনায়। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বৃষ্টির কারণে তাদের রবি ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষকরা।

বরগুনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় প্রাথমিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত বাড়লে জেলা প্রশাসন দুর্যোগবিষয়ক সভা করে প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। বরগুনা জেলায় ৬২৯টি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষের পাশাপাশি কয়েক লাখ গবাদিপশুও রাখা যাবে।

অশনির প্রভাবে মোংলা সমুদ্রবন্দর ও সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকায় দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল সকাল থেকে এ এলাকার আকাশ মেঘাচ্ছন্নতার পাশাপাশি গুঁড়ি ও মাঝারি বৃষ্টি হচ্ছে, রয়েছে হালকা বাতাসও।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত