শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিক্ষা

আপডেট : ১০ মে ২০২২, ১০:২৫ পিএম

অনেকটা অবধারিতই ছিল বিষয়টি। কেবল অপেক্ষার পালা ছিল, কখন ঘটে বিস্ফোরণ। সেই বিস্ফোরণটা অবশেষে ঘটেই গেল। ক্ষমতা বাঁচাতে পারলেন না শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে। তার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে ছোট্ট এই দ্বীপদেশটিতে যে অরাজকতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, সেটা অনাকাক্সিক্ষত; কিন্তু অনেকটা অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। অনুরাধাপুর থেকে কলম্বোর রাজপথ যেন ফুঁসে উঠেছে, রাজাপাকসের পৈতৃক বাড়িতে জ্বলছে আগুন, বিশেষ ব্যবস্থায় পরিবারসহ উদ্ধার করে নিয়ে যেতে হয়েছে তাকে।

এই পরিস্থিতির আগাম আভাস তো পাওয়া যাচ্ছিল গত কয়েক মাস ধরেই। খাদ্যপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর প্রবল সংকটে হিমশিম খাচ্ছিল পুরো শ্রীলঙ্কা। বৈদেশিক মুদ্রার চরম সংকটে পড়ে অনন্যোপায় সরকার বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অর্থনৈতিক সংস্থার কাছে হাত পেতেও কুল পাচ্ছিল না আর অন্য দিকে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া জনতা ফুঁসছিল বিক্ষোভে। সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে দেশটিতে।

কেন এমন হলো, এই নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে গত দুই মাসে। রীতিমতো রাজপরিবার হয়ে ওঠা শ্রীলঙ্কার শাসক পরিবারের একের পর এক ভুল সিদ্ধান্তের ময়না-তদন্ত হয়েছে, হচ্ছে বিশ্বজুড়েই। তবে এখানেই কিন্তু শেষ নয়!

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সহযোগী সংগঠন আঙ্কটাড বলছে, শ্রীলঙ্কার এই ঘটনা উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশের জন্যই এক সতর্কসংকেত। শ্রীলঙ্কাকে দিয়ে শুরু হলো, কিন্তু এর প্রভাবে এমন ঘটনা আরও ঘটতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আরও অর্ধশতাধিক দেশ আছে এমন ঝুঁকিতে। কেবল নিজেদের প্রশাসনিক ভুলভ্রান্তি আর দুর্বলতাই যে নয়, এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরও গুরুত্বপূর্ণ দুটি অনুষঙ্গসারা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দেওয়া মহামারী; আর তার রেশ ভালো করে কেটে ওঠার আগেই বেজে ওঠা যুদ্ধের দামামা।

শ্রীলঙ্কার ব্যাপারটাই ধরা যাক। রাজাপাকসে সরকারের অনেকগুলো ভুল পদক্ষেপ তো অবশ্যই ছিল। তারপরও সংকটটা এমন মারাত্মক আকার হয়তো ধারণ করত না, যদি না করোনা মহামারী থাবা বসাত তাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথে। শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি কিন্তু অনেকটাই বাংলাদেশের মতো মূলত দুটি ধারার ওপর নির্ভরশীল। এর একটি বাংলাদেশের মতোই অনাবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিট্যান্স, অন্যটি পর্যটন। করোনায় পর্যটন খাত একেবারেই স্থবির হয়ে পড়ায় এর একটা একেবারেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল; অন্যটিও দুর্বল হয়ে পড়েছিল সারা বিশ্বের মহামারীজনিত মন্দায়। রাজাপাকসে সরকার সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল অনেকগুলো মেগা প্রকল্প নিয়ে, যেগুলোর উপযোগিতা নিয়েই প্রশ্ন আছে। বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর এইসব মেগা প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুবিধা কাজে লাগানোর সময় আসার আগেই সংকট ঘনীভূত হওয়ায় তারা আর এখান থেকে বের হওয়ার সুযোগই পায়নি।

আঙ্কটাডের পর্যবেক্ষণ অনুসারে, এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্তত ১০৭টি দেশ ত্রিমুখী এক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। বৈদেশিক সাহায্য এবং আমদানিনির্ভর এই দেশগুলোর ঘাড়ে বৈদেশিক ঋণের বোঝা তো ছিল আগে থেকেই, কভিড-১৯ অতিমারীতে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মন্দার কবলে পড়ে সেই ঋণ আরও বড় হয়ে উঠেছে আসলে মুদ্রামানের অবমূল্যায়নের কারণে। রপ্তানির চেয়ে আমদানির চাপ বেশি হওয়ায় বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা এবং সেই সঙ্গে অবধারিতভাবেই বাড়ছে ডলারের দামও। আর অতিমারী শেষ হতে না হতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বেড়ে গেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর মূল্যও। বাড়বে না-ই বা কেন?

এই দুটি দেশই যে আসলে এক অর্থে বিশ্বের সবচেয়ে বড় খাদ্যভা-ার! আঙ্কটাডেরই হিসাবে বিশ্বের অর্ধশতাধিক দেশ রাশিয়া অথবা ইউক্রেন থেকে আমদানি করা খাদ্যশস্যের ওপর অন্তত পঞ্চাশ শতাংশ নির্ভরশীল। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলোও আছে; আর বাধ্য হয়ে তারা যখন বিকল্প উৎসের দিকে হাত বাড়াচ্ছে তখন প্রতিযোগিতায় অন্য দেশগুলো তো পিছিয়ে পড়বেই। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ এরচেয়েও বড় প্রভাব ফেলছে জ্বালানির বাজারে। ইউরোপের প্রায় সব দেশই রাশিয়ার উৎপাদিত গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল; সেই উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানির বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে, হু হু করে বাড়ছে তেল ও গ্যাসের দাম। উন্নত দেশগুলোর শক্তিশালী অর্থনীতি সেটা সামাল দিচ্ছে কোনো রকমে, কিন্তু তার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলো।

বাংলাদেশের রান্নার তেলের বাজার এর আদর্শ উদাহরণ। বাংলাদেশ সয়াবিন-পাম অয়েল আমদানির জন্য নির্ভরশীল লাতিন আমেরিকা আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ওপর। আর্জেন্টিনা-ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়ায় যুদ্ধাবস্থা নেই, কিন্তু যুদ্ধের প্রভাবেই এসব দেশ থেকে আনা তেলের দামও বাড়তে শুরু করেছে। দেশের ব্যবসায়ীরা একচেটিয়া ব্যবসার সুবাদে কিছু বেশি লাভ করছেন বটে; তবে বাংলাদেশের রান্নার তেলের বাজার কিন্তু বিশ্ববাজারের বিচারে অস্বাভাবিক নয়। বরং এখনো এমনকি প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের তুলনায়ও কম দামেই তেল বিক্রি হচ্ছে এখানে। সংকট হলো, অন্য দেশের তুলনায় হয়তো কম দাম, কিন্তু সেটাই যে আবার এদেশের মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বিচারে অনেক উঁচু!

আঙ্কটাডের বিচারে, অতিমারী, ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক ঋণভার আর চড়তে থাকা খাদ্যশস্য ও জ্বালানির বাজারএই তিনটি সংকটই একসঙ্গে ভোগাচ্ছে বিশ্বের অন্তত ৬৭টি দেশকে। আফ্রিকার ২৫টি, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ২৫টি আর লাতিন আমেরিকার ১৭টি। নামগুলো প্রকাশ করেনি তারা, কিন্তু অনুমান করা অসম্ভব নয়, এর মধ্যে আছে বাংলাদেশও। সম্প্রতি বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকাগুলোর প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে এই মুহূর্তে তুলনামূলক স্বস্তিতে থাকলেও আগামী তিন বছরের মধ্যে চলমান মেগাপ্রকল্পগুলোর জন্য নেওয়া ঋণ চাপে ফেলবে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে। এই সব প্রকল্প থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা নিতে না পারলে তখন বিপদটা টের পাবে বাংলাদেশ।

তখন কি বাংলাদেশের অবস্থা শ্রীলঙ্কার মতোই হবে? আশার কথা, পূর্বাভাস কিন্তু সে রকম নয়। মেগা প্রকল্পগুলো থেকে সুবিধা পাওয়া আসলে এ বছরের মধ্যেই শুরু হয়ে যাবে; আমরা সেটা ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারলে অতটা খারাপ পরিস্থিতিতে পড়তে না-ও হতে পারে। অতিমারীকালে তৈরি পোশাক ও রেমিট্যান্স খাতের ব্যবস্থাপনায় যে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছে বাংলাদেশ, সেটাও আশাব্যঞ্জক। অতিমারীশেষে চলতি বছর আমদানিতে রেকর্ড হয়েছে বাংলাদেশে, কিন্তু একই সঙ্গে রেকর্ড হচ্ছে রপ্তানিতেও! দুই মাস বাকি থাকতেই রপ্তানি খাতে আগের রেকর্ড ভেঙে ফেলেছে বাংলাদেশ। তাই শ্রীলঙ্কার চেয়ে কিছুটা হলেও সুবিধাজনক অবস্থানে আছি আমরা।

কিন্তু বিশ্ব পরিস্থিতির চাপ তো আর এড়ানো যাবে না! তাই বিশেষ করে আমরা যেসব জিনিস আমদানির ওপর নির্ভরশীল, সেগুলোর ব্যবস্থাপনায় নজর দিতে হবে। শ্রীলঙ্কায় যা ঘটছে, আমাদের দেশে সেটার পুনরাবৃত্তি হতে দেওয়া যাবে না কিছুতেই।

লেখক অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত