রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় অভিযানের পরও নিয়ন্ত্রণে আসেনি সয়াবিন তেলের বাজার। বড় কয়েকটি বাজারে সরবরাহ সামান্য বাড়লেও পাড়া-মহল্লার বাজারগুলোতে বোতলজাত সয়াবিনের দেখা নেই। সব দোকানে নেই খোলা সয়াবিনও। বিক্রেতারা বরাবরের মতোই বলছেন, সরবরাহ না থাকায় সয়াবিন তেল বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। এদিকে ঘূর্ণিঝড় অশনির প্রভাব পড়েছে রাজাধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে। ফলে বেড়ে গেছে ডিম, মাছ, মাংসসহ সব ধরনের সবজির দাম।
গতকাল রাজধানীর বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা বাজারে এখনো সয়াবিন তেলের সংকট। বিক্রেতাদের অভিযোগ, সয়াবিন তেলের নতুন দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার পরও কোম্পানিগুলোর বিক্রয় প্রতিনিধিরা আসছেন না।
ঢাকার নিউমার্কেট কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, কোনো দোকানে সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে না। অর্ণব সরকার নামে এক ক্রেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো দোকানে সয়াবিন তেল বিক্রি করছে না। শুধু সূর্যমুখী তেল পাওয়া যায়। দামও অনেক বেশি। আমাদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে তো দামি তেল কেনা সম্ভব নয়। একটা দোকানে শুধু আধা লিটারের একটা সয়াবিনের বোতল পেয়েছি, তবে অন্য পণ্য না কিনলে তাও বিক্রি করবে না।’
এই বাজারের মুদি ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘কোম্পানির কাছে অগ্রিম টাকা দিয়েও তেল মিলছে না। কারওয়ান বাজার ঘুরে ৭০ লিটার তেল পেয়েছি। দোকানে আনার সঙ্গে সঙ্গে শেষ। আমরা তেল সাপ্লাই না পেলে কাস্টমারের কাছে কী করে বিক্রি করব।’
একই অবস্থা রাজধানীর মোহাম্মদপুরে দোকানগুলোতে। দুয়েকটি বাদে বেশিরভাগ দোকানে সয়াবিন তেল বিক্রি বন্ধ রেখেছে। মোহাম্মদপুর কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী সোলায়মান জানান, পাইকারি বাজারে যেসব সয়াবিন তেল পাওয়া যায় তা আগের দামের। ঈদের পর সয়াবিনের নতুন দাম নির্ধারণ হয়েছে। আগের দামের বোতল বিক্রি করতে গেলে ক্রেতাদের সঙ্গে ঝামেলা হয়। আবার ভোক্তার জরিমানা গুনতে হয়। তাই আপাতত তেল বিক্রি বন্ধ রেখেছেন।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ডিলার দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের বাজারে অনেক ব্যবসায়ী আগেই সয়াবিন তেল মজুদ করে রেখেছেন। অন্যদিকে নতুন দাম নির্ধারণের পর কোম্পানি থেকে স্বাভাবিক সাপ্লাই শুরু করেনি। তবে আগামী সপ্তাহের মধ্যে ভোজ্য তেলের বাজার কিছুটা স্বাভাবিক হবে।
ভোক্তার উপপরিচালক বিকাশ চন্দ্র দাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সারা দেশে আমরা অভিযান চালাচ্ছি। এ দফায় দাম বাড়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৮০ হাজার ৯৬৯ লিটারের বেশি মজুদ করা সয়াবিন তেল উদ্ধার করেছি। এসব তেল ইতিমধ্যে বিক্রিরও ব্যবস্থা করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘সয়াবিন তেলের নতুন নির্ধারিত দামের বোতল মার্কেটে আসতে শুরু করেছে। আশা করি কয়েক দিনের মধ্যে ভোজ্য তেলের বাজার স্বাভাবিক হবে। এছাড়া আজ (বৃহস্পতিবার) ভোক্তা অধিদপ্তরের সভাকক্ষে ভোজ্য তেলের মিলমালিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় হবে। সেখান থেকে সংকট সমাধানের একটা পথ তৈরি হবে।’
এদিকে ঘূর্ণিঝড় অশনির প্রভাবে দাম বেড়েছে নিত্যপণ্যের। বিশেষ করে মুরগি-ডিম ও সবজির দাম বেড়েছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি ডজন ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা। যা গত সপ্তাহে বিক্রি হয়েছে ১০৫ টাকায়।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ডিম কিনতে আসা আবু জাফর নামে এক ক্রেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিন-চার দিন আগেও ডিমের ডজন বিক্রি হয়েছে ১০০-১০৫ টাকা। আজ (গতকাল) এক ডজন ডিমের দাম রাখা হয়েছে ১২০ টাকা। বৃষ্টির অজুহাত দেখিয়ে ডিমের অতিরিক্ত দাম রাখা হচ্ছে।’
এ বাজারের খুচরা বিক্রেতা মো. জামাল উদ্দিন বলেন, ‘গত কয়েক দিন ধরে ডিমের সংকট চলছে। কী কারণে সংকট তা জানি না। চাহিদা অনুযায়ী ডিম পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বাড়তি দাম দিয়ে ডিম কিনতে হয়।’
এদিকে আবারও বেড়েছে ব্রয়লার মুরগির দাম। প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৮৫-১৯০ টাকা। যা গত সপ্তাহে ছিল ১৬০-১৬৫। দাম বৃদ্ধির বিষয়ে কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে বাজারে সবজিসহ মাছের সরবরাহ কম। ফলে ব্রয়লারের চাহিদা বেড়ে গেছে। কিন্তু সরবরাহ তুলনামূলক কম। এ কারণেই দাম বেড়েছে।’ তিনি জানান, সরবরাহ বেশি থাকায় ঈদের সময়ও দাম কম ছিল। এখন পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি মুরগিতে ২০ টাকা বেড়েছে। এভাবে আরও কয়েক দিন চলতে থাকলে মুরগির কেজি আবারও ২০০ টাকায় গিয়ে ঠেকবে বলে জানান এ ব্যবসায়ী।
সপ্তাহ ব্যবধানে আবারও বেড়েছে সব ধরনের সবজির দাম। মহল্লার বাজারগুলোতে প্রতি কেজি বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৮০-১০০, যা গত সপ্তাহে বিক্রি হয়েছে ৬০-৭০ টাকায়। এছাড়া প্রতি কেজি ঢেঁড়স ৫০, পটোল ৬০, টমেটো ৬০, শসা ৪০-৫০, কাঁকরল ৬০-৭০, বরবটি ৫০-৬০, করলা ৬০-৭০, ধন্দুল ৫০-৬০, ঝিঙা ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
হাতিরপুলের সবজি বিক্রেতা মনির হোসেন বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সবজির সরবরাহ কম। পাইকারি বাজারে সব ধরনের সবজি ১০-২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে দাম আবার কমবে।’
বেড়েছে মাছের দামও। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে চাহিদার তুলনায় মাছের সরবরাহ কম। তাই মাছের দাম চড়া। আকারভেদে চাষের শিং মাছ প্রতি কেজি ৬০০-৬৫০, রুই ২৮০-৪০০, চাষের পাঙ্গাশ ১৬০-১৮০, কাতলা আকারভেদে ৩২০-৪০০, তেলাপিয়া ১৪০-১৫০, আকারভেদে আইড় ৯০০-১১০০, দেশি শিং ৯৫০-১০০০, দেশি চিংড়ি (ছোট) ৮০০-৯০০, ইলিশ কেজি প্রতি ১২০০-১৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
