টিআইবির গবেষণাপত্র

তিন বিদ্যুৎ প্রকল্পে ৩৯০ কোটি টাকার দুর্নীতি

আপডেট : ১২ মে ২০২২, ০২:৩২ এএম

দুটি কয়লা ও একটি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে জমি ক্রয়, অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণে ৩৯০ কোটি টাকার বেশি দুর্নীতি হয়েছে। এর মধ্যে বরিশাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ১৫ কোটি ৫৯ লাখ ৯০ হাজার, চট্টগ্রামের বাঁশখালী এসএস বিদ্যুৎকেন্দ্রে ২৫৫ কোটি ও কক্সবাজার মাতারবাড়ী এলএনজি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ১১৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা দুর্নীতি হয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল বুধবার ওয়েবিনারের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশে কয়লা ও এলএনজি বিদ্যুৎ প্রকল্প : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এ গবেষণাপত্র প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন টিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মাহফুজুল হক ও রিসার্চ ফেলো নেওয়াজুল মাওলা। ওয়েবিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জমান।

টিআইবি বলছে, বিপুল পরিমাণ অর্থ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ভূমি অধিগ্রহণ শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারী, এনজিওকর্মী ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের পকেটে গেছে। জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারক এবং মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে যথাযথ বিশ্লেষণ না করে প্রভাবশালীদের স্বার্থে কয়লা ও এলএনজি প্রকল্পগুলো অনুমোদনের অভিযোগ রয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত, চীন, পাকিস্তান ও অস্ট্রেলিয়ায় নির্মিত কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৩ দশমিক ৪৬ থেকে ৫ দশমিক ১৫ টাকার মধ্যে থাকলেও বাংলাদেশে নির্বাচিত প্রকল্পে বেশি মূল্যে বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ রেখে প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তুলনামূলকভাবে এদেশের বিদ্যুতের দাম ২২ থেকে ৪৯ শতাংশ বেশি পড়বে।

এতে বলা হয়, জ্বালানি খাতের উন্নয়নে দাতানির্ভর নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। একদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারে সরকারের উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেই; অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্পে অধিক দুর্নীতি ও দ্রুত মুনাফা তুলে নেওয়ার সুযোগ থাকায় প্রয়োজন না থাকলেও কয়লা এবং এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘প্রভাবশালী মহলকে অনৈতিক সুবিধা দিতে প্রকল্প অনুমোদন, বিবিধ চুক্তি সম্পাদন, ইপিসি ঠিকাদার নিয়োগ, বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ এবং বিদ্যুৎ কিনতে প্রতিযোগিতাভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার না করে বিশেষ বিধানের আওতায় চুক্তি ও কার্যক্রম সম্পাদন করা হয়েছে। কয়লা ও এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে, পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে পরিবেশ দূষণ ও সংকটাপন্ন এলাকাসমূহে ঝুঁকি বৃদ্ধি পেলেও পরিবেশ অধিদপ্তর বিদ্যমান আইন এবং বিধি কার্যকরভাবে প্রয়োগে ব্যর্থ। ফলে বন, নদী, খাস জমিসহ প্রাকৃতিক সম্পদের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি, পুলিশের গুলিতে আন্দোলকারীদের মৃত্যু; মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলেও বিচার না হওয়াসহ অপরাধীদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে, যা খাত সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালীদের অনিয়ম ও দুর্নীতিতে আরও উৎসাহিত করছে বলে মনে করি।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার জ্বালানি খাতের মহাপরিকল্পনা (পিএসএমপি) নিজেরা প্রস্তুত করতে পারেনি। বরং জাইকার অর্থ গ্রহণ করায় বারবার তারা নিজ দেশের টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি-টেপকোকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। ফলে জীবাশ্ম জ্বালানি খাতে জাপানের নিজস্ব ব্যবসা সম্প্রসারণের স্বার্থে কয়লা এবং এলএনজিকে প্রধান্য দিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি মহাপরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয়েছে। তাছাড়া পিএসএমপি প্রস্তুতে দেশীয় বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়নি।

পিএসএমপিতে (২০১৬) ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা নিরূপণে অসংগতি ও ভুল পদ্ধতির কারণে ২০২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) মোট ৬২ হাজার ৭০২ কোটি টাকার পুঞ্জীভূত ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া জ্বালানি মিশ্রণে (এনার্জি মিক্স) আমদানি নির্ভর কয়লা ও এলএনজিকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ায় বারবার নীতি পরিবর্তনে এক দশকে বিদ্যুতের দাম গড়ে ৯১ শতাংশসহ মোট ৯ বার দাম বেড়েছে। পিএসএমপি (২০১৬) প্রস্তুতে জ্বালানি ব্যবস্থার রূপান্তরকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়নি। বিশেষ করে বৈশ্বিক বাজারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন খরচ ৮৯ শতাংশ পর্যন্ত কমলেও এ জ্বালানিতে গুরুত্বে ঘাটতি রয়েছে। পিএসএমপি (২০১৬) প্রণয়নে জ্বালানি উৎপাদনে গুরুত্ব প্রদান করা হলেও সঞ্চালন লাইন প্রস্তুতে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তিনটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনের অধিক প্রায় ৯৪২ একর জমি ক্রয় কিংবা অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এতে শুধুমাত্র জমি ক্রয়, অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণে ৩৯০ কোটি টাকার বেশি দুর্নীতি হয়েছে। এ ছাড়া কৃষিজমি, বন, নদী, খালসহ স্থানীয় আদিবাসী ও লবণ চাষিসহ বিভিন্নজনের জমি জোর করে দখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত