প্রধানমন্ত্রীর বিদায়েই শ্রীলঙ্কার সংকট কাটবে না

আপডেট : ১২ মে ২০২২, ১০:০৮ পিএম

গণবিক্ষোভের মুখে সোমবার শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী, দুইবারের নির্বাহী ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। তার পদত্যাগের ফলে অনেকে মনে করছেন এটি হয়তো দ্বীপদেশটিতে রাজাপাকসে পরিবারের আধিপত্যের অবসানের সূচনা। রাজাপাকসেরা স্বাধীনতা-পরবর্তী শ্রীলঙ্কার দুটি সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের একটি। বর্তমান প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে পদত্যাগকারী প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসেরই ছোট ভাই।

তবে বাস্তবতা হচ্ছে, রাজাপাকসে ভাইয়েরা চলে গেলেও দেশটির আর্থিক ও রাজনৈতিক সংকট শিগগিরই শেষ হতে যাচ্ছে না।

কলম্বোর কেন্দ্রস্থলে প্রতিদিন হাজার হাজার বিক্ষোভকারী জড়ো হচ্ছেন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে এবং তার সরকারের পদত্যাগের দাবিতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার জন্য। এর মধ্যে দেশের অর্থনীতির পতন অব্যাহত রয়েছে।

সোমবার রাজাপাকসের অনুগতরা রাজপথে বিক্ষোভকারীদের অবস্থানে চড়াও হয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়। সহিংসতা শহর এবং এর বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। এতে একজন এমপিসহ কমপক্ষে পাঁচজন নিহত হন। প্রতিক্রিয়ায় সরকার দ্বীপদেশটি জুড়ে কারফিউ ঘোষণা করে। মোতায়েন করা হয় সেনা। ‘রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায়’ সেনাদের দেওয়া হয় দেখামাত্র গুলির নির্দেশ।

শ্রীলঙ্কার বিক্ষোভকারীরা দেশের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে বিক্ষুব্ধ। তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের ফলে অতি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। গত চার মাস ধরে, জ্বালানি ও গ্যাসের জন্য জনগণের সারি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। ওষুধ ও সরঞ্জামের অভাবে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। বাজারে নেই খাদ্যপণ্যের সরবরাহ।

বিক্ষোভকারীরা তাদের বর্তমান দুর্ভোগের জন্য রাজাপাকসে পরিবারকে দায়ী করে তাদের নেতৃত্ব থেকে সরে যাওয়ার দাবি করে আসছে। শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় তলানিতে এসে নেমেছে। বহুপক্ষীয় দাতা সংস্থাগুলো দেশটির সরকারকে আশানুরূপ সমর্থন করেনি, যার মধ্যে আছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), যারা জরুরি সহায়তা প্রস্তাব করেনি। গত মাসে শ্রীলঙ্কা তার ৫১ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে খেলাপি হয়ে পড়ে।

গত ৩ মে রাজাপাকসে সরকারের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে অনাস্থা প্রস্তাব পেশ করা হয়েছিল। এটি নিজেদের ওপর রাজাপাকসে পরিবারের আস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে বলে মনে করা হয়। এর পর পরই প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে রাজনৈতিক উত্তাপ প্রশমিত করতে প্রধানমন্ত্রী বড় ভাইকে পদত্যাগ করতে বলেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। ওই সময়ের মধ্যে প্রশাসন একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের জন্য নতুন প্রধানমন্ত্রী মনোনীত করার পরিকল্পনাও ঘোষণা করে। তবে জনসাধারণ এটি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে। তারা প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী উভয়ের পদত্যাগের দাবি আরও জোরদার করে তোলে।

জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ : শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে মাহিন্দা রাজাপাকসে এক অতি পরিচিত মুখ। প্রথম দফা প্রেসিডেন্ট পদে থাকার সময় তাকে বিদ্রোহী বাহিনী লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলমের (এলটিটিই) বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ শেষ করার কৃতিত্ব দেওয়া হয়েছিল। দ্বীপের উত্তর-পূর্বে তামিলদের জন্য একটি পৃথক আবাসভূমি তৈরি করতে লড়াই করে আসছিল এলটিটিই। দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে অস্ত্র হাতে নিয়েছিল তামিলদের একাংশ।

এলটিটিই’র বিদ্রোহ দমনে কৃতিত্ব পেলেও শাসনকালে দুর্নীতির অভিযোগ মাহিন্দার নামকে কলঙ্কিত করেছে। বিক্ষোভকারীরা বলছে, তার দুর্নীতি দেশের অর্থনৈতিক সংকটের একটি বড় কারণ। অনেকে রাজাপাকসেদের শ্রীলঙ্কার ‘মার্কোস পরিবার’ বলে উল্লেখ করেন।

ভারত মহাসাগরে ২০০৪ সালের ভয়ংকর সুনামির পর অভিযোগ উঠেছিল, রাজাপাকসে প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য পাওয়া তহবিল আত্মসাৎ করেছে। ২০০৯ সালে শেষ হওয়া গৃহযুদ্ধের সময়কালে সামরিক কেনাকাটা নিয়েও সরকারের বিরুদ্ধে বড় আকারের দুর্নীতির অভিযোগ ছিল।

এমনকি তার গৃহযুদ্ধের জয়ও বিতর্কিত। অনেকেই বলেছেন, এর মাধ্যমে দেশকে জাতিগত ভিত্তিতে তিক্তভাবে বিভক্ত করে ফেলা হয়েছে। গৃহযুদ্ধের শেষদিকে (২০০৯ সালের মে মাসে) তামিল বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে নির্বিচার হামলা চালিয়ে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও আছে মাহিন্দার প্রথম সরকারের বিরুদ্ধে। ২০০৫ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল ওই সরকার। জাতিসংঘের অনুমান, ওই সময়ে প্রায় ৪০ হাজার বেসামরিক তামিল নিহত হয়েছিল। বিশ্বসংস্থার তরফ থেকে তার তদন্ত চলমান।

রাজনৈতিক জীবন : ৭৬ বছর বয়সী প্রবীণ রাজনীতিক মাহিন্দা রাজাপাকসে ১৯৭০ সালে ২৪ বছর বয়সে প্রথম তার বাবার সংসদীয় আসন বেলিয়াত্তা থেকে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৭৭ সালে পরের নির্বাচনে পরাজিত হলেও ১৯৮৯ সালে পার্লামেন্টে ফিরে আসতে সক্ষম হন।

মাহিন্দা রাজাপাকসে ২০০৪ সালে প্রথমবারের মতো শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী হন। প্রতিদ্বন্দ্বী রনিল বিক্রমাসিংহকে সামান্য ভোটের (২ লাখ) ব্যবধানে পরাজিত করেন। এর এক বছর পরে দেশের পঞ্চম নির্বাহী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। টানা দুই মেয়াদে এই পদে বহাল থাকেন মাহিন্দা। ২০১৫ সালের নির্বাচনে নিজের দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাইথ্রিপালা সিরিসেনার কাছে আশ্চর্যজনকভাবে পরাজয় ঘটে তার।

নির্বাচনে হারলেও রাজনীতির মাঠ ছাড়েননি মাহিন্দা। ২০১৮ ও ২০১৯ এর মধ্যে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে রাজনীতিতে তৎপর ছিলেন। তারপরে ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত অর্থমন্ত্রী পদে ছিলেন তিনি। ২০২১ সালে ভাই প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী দপ্তর অর্থ মন্ত্রণালয় তুলে দেন তাদেরই আরেক ভাই বাসিল রাজাপাকসের হাতে। গোতাবায়া শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট পদে আছেন ২০১৯ সাল থেকে। ব্যাপক গণবিক্ষোভের মধ্যে বাসিল রাজাপাকসে এক মাস আগে পদত্যাগ করেন।

‘প্রেম ঘৃণাতে পরিণত হলে এমনটাই হয়। ২০০৫ সালের আগের জীবনধারার সঙ্গে তার বিশাল ব্যক্তিগত সম্পদের সামঞ্জস্য নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও মাহিন্দা দীর্ঘদিন ধরে একজন জনপ্রিয় রাজনীতিক ছিলেন। ছিলেন সম্মানিত আর বিশ্বস্ত। তবে আসার একটা সময় আছে। তেমনি আছে যাওয়ার সময়। সময় হলেও কেউ চলে যেতে না চাইলে লোকে তাদের যেতে বাধ্য করবে’, বলেছেন রাজাপাকসে-বিরোধী বিক্ষোভকারী অরুণা নিশানথা।

লেখক দিলরুকশি হানদুনেত্তি শ্রীলঙ্কার আইনজীবী ও সাংবাদিক। শ্রীলঙ্কার প্রথম আন্তর্জাতিক সংবাদপত্র ডেইলি ও উইকেন্ড এক্সপ্রেস-এর উপদেষ্টা সম্পাদক। আল জাজিরা অনলাইন থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত