সাধারণ যাত্রী পারাপারের ব্যবস্থা থাকলেও সন্দ্বীপ থেকে চট্টগ্রামে দ্রুত জরুরি রোগী পারাপারের জন্য নেই কোনো বিশেষ ব্যবস্থা। সন্দ্বীপের অনুন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা ও চিকিৎসক সংকটের কারণে প্রতিদিনই উন্নত চিকিৎসার জন্য সংকটাপন্ন রোগীকে পাঠাতে হয় চট্টগ্রামে। যাদের মধ্যে বেশিরভাগই গর্ভবতী নারী, নবজাতক, শিশু, বৃদ্ধ ও দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি। অথচ স্বাস্থ্য ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া দুটি সি-অ্যাম্বুলেন্স পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, সি-অ্যাম্বুলেন্স দুটি সাগরে চলার উপযোগী নয় বলে ব্যবহার করা হচ্ছে না।
সন্দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সাধারণ যাত্রীদের মতো সংকটাপন্ন রোগীকেও গুপ্তছড়া ঘাটে এসে চট্টগ্রামে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। জাহাজ ও ইঞ্জিনচালিত কাঠের নৌকা (সার্ভিস বোট) ছাড়ার নির্দিষ্ট সময়সূচির পরে ঘাটে পৌঁছালে জরুরি রোগীদের অনেক সময় চট্টগ্রাম নেওয়া সম্ভব হয় না।
গুপ্তছড়া ঘাট এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ সুমন আক্ষেপ করে বলেন, সন্দ্বীপ চ্যানেল পার হয়ে চট্টগ্রাম যেতে না পারায় গুপ্তছড়া ঘাটেই সন্তান প্রসবের ঘটনা ঘটেছে গত ২০ এপ্রিল। এ ঘটনায় দুই নবজাতকের একজন মারা গেছে। এর আগেও কয়েকবার এ রকম ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রামে যেতে না পারায় চিকিৎসার অভাবে মুমূর্ষু রোগী মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে গুপ্তছড়া ঘাটে।
ভুক্তভোগী একাধিক রোগীর স্বজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দিনের বেলা সংকটাপন্ন রোগীকে (বিশেষ করে গর্ভবতী, নবজাতক, বৃদ্ধ, দুর্ঘটনায় আহত) কোনোমতে চট্টগ্রামে পাঠানো গেলেও রাতের বেলায় চলে না সরকারি জাহাজ। তখন একমাত্র ভরসা ইঞ্জিনচালিত কাঠের নৌকা ও লাল বোট (লাইফ বোট)। কাঠের নৌকায় জনপ্রতি নিয়মিত ভাড়া ১৫০ টাকা হলেও রাতে জরুরি রোগী পারাপারের জন্য ভাড়া গুনতে হয় ১৩ থেকে ১৫ হাজার টাকা। অনেকের পক্ষে এত টাকা দেওয়া সম্ভব হয় না।
আবু নাসের নামে এক বাসিন্দা বলেন, ২৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় তার মামি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে স্থানীয় স্বর্ণদ্বীপ ফাউন্ডেশন হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। গুপ্তছড়া ঘাটে যোগাযোগ করলে ঘাট কর্তৃপক্ষ রাতে কোনো নৌযান ছাড়া সম্ভব নয় বলে জানায়। পরে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় একটি ইঞ্জিনচালিত কাঠের নৌকার (সার্ভিস বোট) মাধ্যমে রাত ১২টার পর তাকে চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়।
জানা যায়, সন্দ্বীপ-চট্টগ্রাম নৌপথে জরুরি রোগী পারাপারের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে দুই দফায় দেওয়া হয়েছিল দুটি সি-অ্যাম্বুলেন্স।
সরেজমিনে দেখা যায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সি-অ্যাম্বুলেন্সটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে হারামিয়া ১০ শয্যা হাসপাতাল এলাকার জঙ্গলের ভেতর। আর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া সি-অ্যাম্বুলেন্সটি অযত্নে পড়ে আছে গুপ্তছড়া ঘাটের কাছে ম্যানগ্রোভ বনের ভেতর।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, ২০০৮ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জন্য ২৫ লাখ টাকায় কেনা একটি সি-অ্যাম্বুলেন্স দেয়। ওই বছর ১৭ এপ্রিল অ্যাম্বুলেন্সটি বুঝিয়ে দেওয়া হলেও কোনো চালক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি জ্বালানির খরচের বিষয়েও ছিল না নির্দেশনা। ২০১৫ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রায় ৬৫ লাখ টাকায় কেনা আরেকটি সি-অ্যাম্বুলেন্স উপজেলা প্রশাসনের অধীনে দেওয়া হয়। আগেরটির মতো এর জন্যও চালক আর জ¦ালানি বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ফলে একদিনের জন্যও রোগী পারাপার করেনি এই সি-অ্যাম্বুলেন্সটি।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফজলুল করিম বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সি-অ্যাম্বুলেন্সটি সন্দ্বীপ চ্যানেলে চলাচলের উপযোগী নয়। এটি হাওর অঞ্চলের জন্য উপযোগী। মন্ত্রণালয় যদি এই চ্যানেলের উপযোগী কোনো সি-অ্যাম্বুলেন্স দেয় এবং সঙ্গে চালক, হেলপার ও জ্বালানির ব্যবস্থা করে তাহলে কম সময়ে জরুরি রোগী পারাপার করা সম্ভব হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সম্রাট খীসা বলেন, ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যে সি-অ্যাম্বুলেন্সটি দেওয়া হয়েছে, সেটা সন্দ্বীপ চ্যানেলে বড় বড় ঢেউয়ের মধ্যে চলার উপযোগী নয়।’ তিনি বলেন, ‘সি-অ্যাম্বুলেন্সের ব্যাপারে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে বলেছি, অ্যাম্বুলেন্সটি অকেজো পড়ে আছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।’
স্থানীয় সমাজকর্মী শামসুল আজম মুন্না বলেন, ‘ইঞ্জিনচালিত নৌকায় আর লাইফ বোটে সন্দ্বীপ থেকে চট্টগ্রাম যেতে দেড় ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। দ্রুত জরুরি রোগী পারাপারের জন্য এটি কোনো সঠিক ব্যবস্থাপনা হতে পারে না। এমন রোগীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে চালক ও জ্বালানির ব্যবস্থাসহ সন্দ্বীপ চ্যানেলে চলাচলের উপযোগী দুটি সি-অ্যাম্বুলেন্স দিতে হবে।’
