দেশীয় বাজারে দাম কমানোর লক্ষ্যে গম রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে ভারত। গত শুক্রবার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে এ নিষেধাজ্ঞা। তবে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকায় বাংলাদেশে ভারতের গম রপ্তানি বন্ধ হচ্ছে না। যদিও এক্ষেত্রে ভারত সরকারের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। প্রতিবেশী ও খাদ্য সংকটের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোতে গম রপ্তানি অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত।
অবশ্য, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তে থাকা গমের মূল্য ভারতের এই নিষেধাজ্ঞায় আরও ঊর্ধ্বমুখী হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারতের ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফরেন ট্রেডের (ডিজিএফটি) জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ভারত সরকার দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং প্রতিবেশী ও অন্যান্য অরক্ষিত দেশগুলোর চাহিদাকে সমর্থনের জন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে এনডিটিভি জানিয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, যেসব রপ্তানি চালানের লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) বিজ্ঞপ্তির আগে ইস্যু করা হয়েছে, সেগুলো যেতে দেওয়া হবে। এ ছাড়া সরকারি অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে অন্য দেশেও গম রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হবে। ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গম উৎপাদক হলেও বৈশ্বিক রপ্তানিতে তাদের অংশ মাত্র ১ শতাংশের মতো। পরিমাণ ও মূল্য উভয় দিক থেকে ভারতীয় গমের সবচেয়ে বড় ক্রেতা বাংলাদেশ। ২০২০-২১ অর্থবছরে ভারতের মোট গম রপ্তানির ৫৪ শতাংশই এসেছে বাংলাদেশে। ওই বছর ভারতীয় গমের শীর্ষ ১০ ক্রেতা ছিল বাংলাদেশ, নেপাল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, শ্রীলঙ্কা, ইয়েমেন, আফগানিস্তান, কাতার, ইন্দোনেশিয়া, ওমান ও মালয়েশিয়া।
বিশ্বের মোট গম রপ্তানির ২৯ শতাংশই সরবরাহ করে রাশিয়া ও ইউক্রেন। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে সংঘাত শুরুর পর থেকে আন্তর্জাতিক ভোগ্যপণ্যের বাজারে রীতিমতো আগুন লেগেছে। হু হু করে দাম বেড়েছে গমেরও। যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের রপ্তানি বন্ধ আর রাশিয়ার ওপর পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার কারণে সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী ভারতীয় গমের চাহিদা বেড়েছে। ভারতের গম রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, রাশিয়া-ইউক্রেনের বিকল্প হিসেবে অনেক ক্রেতাই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
এ অবস্থায় বৈশ্বিক চাহিদা ও মূল্যের ঊর্ধ্বগতি বিবেচনায় এ বছর রেকর্ড পরিমাণ গম রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল ভারত। ২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশটি রেকর্ড ৬৫ লাখ টন গম রপ্তানি করেছিল। তবে চলতি অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই তাদের সেই সীমা পার হয়ে গেছে। কিন্তু স্থানীয় বাজারে গমের দাম ক্রমাগত বাড়তে থাকায় শেষপর্যন্ত রপ্তানি নিষিদ্ধ করল ভারত সরকার।
এদিকে গত এক বছর ধরেই বাংলাদেশে গমের দাম বাড়ছে, যা রাশিয়া-ইউক্রেন সংকট আরও উসকে দিয়েছে। সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, দেশের বাজারে গত এক বছরে আটার দাম কেজিতে বেড়েছে ৬ থেকে ১৩ টাকা এবং ময়দায় বেড়েছে ১৮ থেকে ২৪ টাকা পর্যন্ত। গত এক সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের মূল্য বেড়েছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ।
বর্তমানে দেশে গমের বার্ষিক চাহিদা ৭০ থেকে ৭৫ লাখ টন। সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ১২ দশমিক ৩৪ লাখ টন গম। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, গত ২০২০-২১ অর্থবছরে মোট ৫৩ লাখ ৪২ হাজার টন গম আমদানি করা হয়। চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১১ মে পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ৩৪ লাখ ৭ হাজার ৭৯০ টন। বাংলাদেশ যে পরিমাণ গম আমদানি করে তার সিংহভাগই আসে ইউক্রেন ও রাশিয়া থেকে। এ ছাড়া ভারত, কানাডা থেকেও আমদানি হয়। তবে বর্তমানে ইউক্রেন-রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধ চলমান থাকায় দেশ দুটি থেকে আমদানি প্রায় বন্ধ।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের আগে থেকেই নির্ধারিত মানের চেয়ে কম প্রোটিনসমৃদ্ধ গম আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আগে ইউক্রেন, রাশিয়া ও আর্জেন্টিনা থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ প্রোটিনসমৃদ্ধ গম আমদানি হতো। এখন ভারত থেকে সাড়ে ১১ শতাংশ প্রোটিনসমৃদ্ধ গমও আমদানি করা হচ্ছে। প্রতি টনের দাম প্রায় ৪০০ ডলার।
