এসডিজি অর্জনে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গুরুত্ব প্রধানমন্ত্রীর

আপডেট : ১৭ মে ২০২২, ০৬:০৫ এএম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে সম্মিলিত প্রচেষ্টার পাশাপাশি যথাযথ ও উদ্ভাবনী কর্মপরিকল্পনা এবং কার্যকর পর্যবেক্ষণ পদ্বতির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ে এসডিজি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। কিন্তু আমি এখনো বিশ্বাস করি সম্মিলিত প্রচেষ্টার পাশাপাশি যথাযথ উদ্ভাবনী কর্মপরিকল্পনা ও কার্যকর পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে এই লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো সম্ভব।’

গতকাল সোমবার সকালে গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের জেনারেল ইকোনমিক ডিভিশন (জিইডি) আয়োজিত ‘এসডিজি বাস্তবায়ন পর্যালোচনা বিষয়ক তিনদিনব্যাপী দ্বিতীয় জাতীয় সম্মেলন-২০২২’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, আমরা সবাই মিলে এক সঙ্গে কাজ করলে ২০৩০ এর আগেই নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে এবং ২০৪১ সালের আগেই জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত এবং উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে সক্ষম হব।’

বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ও এসডিজি অর্জনে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সরকার এ লক্ষ্যে সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা দেবে। আমরা এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য নীতি-সহায়তা এবং তহবিল প্রদান অব্যাহত রাখব, তবে আমাদের অবশ্যই তহবিলের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং অপচয় রোধ করতে হবে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি যথাযথভাবে পূরণ এবং তা যেন বাস্তবায়িত হয় তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া দরকার।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘বাংলাদেশ এসডিজিকে কেবল একটি বৈশ্বিক উন্নয়ন ধারণা হিসেবে গ্রহণ করেনি। বৈশ্বিক এ লক্ষ্যমাত্রাকে দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নিজের উপযোগী করে প্রণয়ন করার কার্যক্রম শুরু করেছে; যা এসডিজি স্থানীয়করণ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। এ কার্যক্রমের আওতায় ১৭টি অভীষ্ট থেকে ৩৯টি সূচককে বাংলাদেশের জন্য ‘এসডিজি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সে সঙ্গে প্রতিটি জেলার বাস্তবতা বিবেচনায় ১টি করে অতিরিক্ত সূচক নির্ধারণ করা হয়েছে। আশা করা যায়, এই অগ্রাধিকার তালিকা অনুযায়ী জেলা, উপজেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের সব সরকারি দপ্তরে দ্রুত ও সফলতার সঙ্গে এসডিজি পরিবীক্ষণ এবং বাস্তবায়ন সম্ভব হবে, এবং দেশের চলমান উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হবে।’

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের পথে আমরা সাত বছর অতিক্রম করছি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, গত দুই বছর কভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারীর কারণে এসডিজি বাস্তবায়ন গতি কিছুটা মন্থর হয়েছে। তবে তার সরকার সামর্থ্যরে সর্বোচ্চ ব্যবহার করে লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে যাচ্ছে এবং কাজ করে যাবে।

উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলায় সবার অংশগ্রহণের ওপর আবারও গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, লক্ষ্য অর্জনে সবাই একসঙ্গে কাজ করলে বাংলাদেশ ২০৩০ সালের আগেই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে সক্ষম হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে সময়োচিত প্রণোদনা প্যাকেজ প্রদান ও যথাযথ নীতি-সহায়তা প্রদানের কারণে অর্থনীতি আবারও ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসছে। নির্দিষ্ট সময়ে এসডিজি’র পথপরিক্রমা নিশ্চিত করা কঠিন, তবে আমি বিশ্বাস করি সঠিক ও উদ্ভাবনী কর্মপরিকল্পনা এবং কার্যকর পরিবীক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। এ প্রেক্ষাপটে ‘এসডিজি ইমপ্লিমেন্টেশন রিভিউ কনফারেন্স ২০২২’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করেই আমাদের এটা পর্যালোচনা করা দরকার।

শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের পানি, বিদ্যুৎ, খাদ্যশস্যÑ প্রতিটি জিনিসের ব্যবহারেই সবাইকে সাশ্রয়ী হতে হবে। কারণ, আমরা জানি কভিড-১৯ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট মন্দার ধাক্কা সবখানেই দেখা দিচ্ছে। ফলে আমাদের দেশের মানুষের যাতে কষ্ট না হয় সেজন্য দেশের প্রতিটি পরিবার এবং মানুষকে এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। তিনি এসডিজি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও আশু করণীয় এবং দীর্ঘমেয়াদি করণীয় যথাযথভাবে নির্ধারণ করে তা বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম ও জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক (ভারপ্রাপ্ত) তুওমো পাউতিয়ানেন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন এসডিজি-বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক জুয়েনা আজিজ।

জিইডি’র সদস্য (সচিব) ড. মো. কাওসার আহমেদ বাংলাদেশের এসডিজি অগ্রগতি এবং এসডিজি অর্জনের পরিকল্পনা সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনা করেন। অনুষ্ঠানে এসডিজি বিষয়ক একটি ভিডিও ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী এসডিজি বিষয়ক একটি প্রকাশনার মোড়কও উন্মোচন করেন। শেখ হাসিনা সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) সফলভাবে বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, এর ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এ সম্মেলনের মাধ্যমে এসডিজি বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা করার এবং বাস্তবায়ন সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে সমর্থ হবে।

এ সম্মেলনে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ সম্মেলনের উদ্দেশ্য পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসডিজি একটি বৈশ্বিক উন্নয়ন ধারণা হলেও বাংলাদেশের উন্নয়নের পথপরিক্রমার সঙ্গে এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এসডিজি প্রণয়নের প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

তিনি বলেন, ভূখণ্ডের দিক থেকে আমরা ছোট হলেও আমাদের যে বৃহৎ জনগোষ্ঠী রয়েছে তাদের উন্নত জীবন দেওয়াই তার সরকারের লক্ষ্য। ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের চেয়ার হিসেবে, বাংলাদেশ ‘মুজিব ক্লাইমেট প্রোসপারিটি প্ল্যান’-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে, যার রূপকল্প হলো জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা অর্জন এবং বাংলাদেশের পরিকল্পিত অগ্রযাত্রাকে সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাওয়া। কার্বন পদচিহ্ন হ্রাস করার প্রতিশ্রুতিতে তার সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সরকারপ্রধান বলেন, এসডিজি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের গৃহীত উদ্যোগ ও কার্যক্রম বিশ্ব দরবারে সমাদৃত হয়েছে। জাতিসংঘের সব সদস্য দেশের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম ৫ বছরে এসডিজি অর্জনে সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি লাভ করেছে এবং সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সল্যুশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশকে ‘এসডিজি প্রোগ্রেস অ্যাওয়ার্ডে’ ভূষিত করেছে।

সরকারের উন্নয়ন নিয়ে যারা সমালোচনা করেন তাদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী রাজধানীতে বসে তার সরকারের করে দেওয়া স্বাধীন গণমাধ্যমের সুযোগে ঢালাও সমালোচনা না করে দেশের তৃণমূল পর্যায় ঘুরে এসে স্বচক্ষে উন্নয়ন প্রত্যক্ষ করে তারপর বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানান। শেখ হাসিনা বলেন, ‘ঢাকায় বসে অনেকেই সমালোচনা করেন। তাদের প্রতি আমার অনুরোধ থাকবে সারা বাংলাদেশটা আপনারা একটু ঘুরে দেখবেন। পরিবর্তনটা কোথায় এসেছে, কতটুকু এসেছে। সেটা বোধহয় সবাই গ্রাম পর্যায়ে একটু যোগাযোগ করলেও জানতে পারবেন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অনেকেই হয়তো এখন সমালোচনা করেন। এটা করা হচ্ছে কেন বা এত টাকা খরচ হয়েছে। খরচের দিকটা অনেকে শুধু দেখেন কিন্তু এই খরচের মধ্য দিয়ে দেশের জনগণ যে কত লাভবান হবে এবং আমাদের অর্থনীতিতে কতটা অবদান রাখবে, আমাদের উন্নয়ন গতিশীল হবে, মানুষের জীবন পরিবর্তনশীল হবে সেটা বোধহয় তারা বিবেচনা করেন না। এটা হচ্ছে খুব দুঃখজনক।’ বাসস

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত