২০২০ সালের সমীক্ষা মতে, ঢাকায় প্রতিদিন ডিভোর্স হয় গড়ে ৩৯টি। এই বিপুল পরিমাণ ডিভোর্সের প্রত্যেকটির পেছনেই কোনো না কোনো গল্প থাকে। থাকে সম্পর্কের টানাপোড়েন, থাকে একটা সময়ে দুটো মানুষের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার তাগিদ অনুভব না করা কিংবা আরও হাজারও রকমের কারণ। ডিভোর্স নিছক কোনো শব্দ নয়, সহজ কোনো ক্রাইটেরিয়াও নয়। বিচ্ছেদের গল্প নিয়ে সিনেমাও নেহাত কম নেই। কিন্তু কী কী ঘটতে পারে যখন দুটো মানুষ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া থেকে বিচ্ছেদ গড়ানো অবধি পুরো সময়জুড়ে? ঠিক এই অস্বস্তিকর এক গল্প নিয়ে ‘আ সেপারেশন’ সিনেমা বানিয়েছেন ইরানি পরিচালক আসগার ফারহাদি।
২০১১ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমার গল্পটাকে ঠিক কোন জনরায় ফেলা যায় তা বুঝে ওঠার জন্য দর্শককে অপেক্ষা করতে হয়, কিন্তু সিনেমা শেষ হয়ে যায় দর্শক এই সিনেমার সারমর্ম তৈরির আগেই। সিমিন ও নাদের দুজন ত্রিশ পার করা দম্পতির খুবই তুচ্ছ একটা কারণে ডিভোর্সের সিদ্ধান্ত নেওয়া দিয়ে শুরু হয় এই সিনেমার স্ক্রিনশেয়ারিং। নাদের একজন ক্লাস সিক্স পড়ুয়া মেয়ের (তারমেহ) বাবা যিনি একই সাথে দুটো বড় সিদ্ধান্তের লড়াই মোকাবিলা করতে করতে ক্লান্ত। এক. সপরিবারে বিদেশ যাওয়া আর, দুই. আলজেইমার কিংবা ডিমেনশিয়াগ্রস্ত বৃদ্ধ বাবাকে বাঁচিয়ে রাখা। তার ডাক্তার স্ত্রী সিমিন একজন এলিট স্বাবলম্বী মহিলা যে তার সন্তানের সুস্থ ভবিষ্যৎ তৈরি করতে কমিটেড। বাবার দেখভাল নিশ্চিত করতে গিয়ে নাদের শেষ অবধি সিদ্ধান্ত নেয় বিদেশ না যাওয়ার এবং সেখান থেকেই ডিভোর্সের এক লম্বা জার্নির সূত্রপাত। খুব স্বাভাবিকভাবেই ডিভোর্স হওয়ার দিকেই যাচ্ছিল যে গল্প সেখানে এসে সমান্তরাল আরেকটা গল্প দাঁড়িয়ে যায় নাদেরের বাবাকে দেখভাল করতে আসা গৃহপরিচারিকাকে ঘিরে। ভুল বোঝাবুঝি, দারিদ্র্যের কশাঘাত আর ধর্মের সুশীতল ছায়ায় ঠাঁই নেওয়ার সব পক্ষেরই বাসনাকে উপজীব্য করে এই সিনেমার শেষ দৃশ্যে যখন ক্যাওজের দৃশ্যের ওপরে ক্রেডিট নেইম গুলো হাঁটছিল তখনও ফারহাদি কোনো উপসংহার দাঁড় করাননি।
এই মুভিতে দুটো দম্পতির গল্প সমান্তরালে এগিয়েছে। নাদের-সিমিন দম্পতি হিসেবে অভিনয় করেছেন ইরানের পরিচিত তারকা পায়মান মোয়াদি ও লায়লা হাতেমি। এই গল্পে সবচেয়ে সহানুভূতিশীল ক্যারেক্টার হলো নাদের চরিত্রে মোয়াদির ক্যারেক্টার। তিনি একইসঙ্গে কমপ্লেক্সুয়াল, একজন আদর্শ ছেলে কিংবা বাবা হওয়ার চেষ্টারত ব্যাংকার যার কাছে মনে হয় নিজের বাউন্ডারির ভেতরে থেকে ভালো থাকাটাই জরুরি। তিনি তার জন্য অনেক কিছুকেই এড়িয়ে চলতে পারেন। তার অনেক বেশি বিস্তৃত জগৎজুড়ে আনাগোনা নেই, বন্ধু নেই এমনকি তিনি হাসেন না। তেহরানের রাস্তাগুলোয় তিনি ‘টেস্ট অব চেরি’র মতো সুন্দর দৃশ্য খুঁজে পান না (যা কিনা ইরানের এখনকার সিনেমার সবচেয়ে সংবেদনশীল সংযোজন)। তার চোয়াল শক্ত থাকে যেন সবকিছু তিনি সুন্দরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন হাসিমুখে। তিনি আবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন অসুস্থ বাবাকে গোসল করাতে গিয়ে। লায়লা হাতেমি একজন পরিণত মা, অবশ্যই উচ্চাকাঙ্ক্ষী; ২১ শতকের আর সব উচ্চাকাঙ্ক্ষী মায়ের মতনই যিনি সবকিছু বাদ দিয়ে নিজেদের উন্নত জীবনযাপনের দিকে ছুটছেন। একান্নবর্তী পরিবার ভাঙার টেন্ডেন্সিও তার ভেতরে যে সুপ্তাবস্থায় ছিল সেটা শেষে মিথ্যা হয়ে ধরা দেয়।
অন্য আরেকটি দম্পতি হলো হোজ্জাত (সাহাব হোসাইনী যিনি ফারহাদির অস্কার-জয়ী ‘সেলসম্যান’-এও অভিনয় করেছেন) আর রাজিয়া (সারাহ বয়াত) দম্পতি। হোজ্জাত একটা সময়ে জুতার দোকানে কাজ করতেন যে তার চাকরি হারিয়েছেন, আবার একইসঙ্গে যিনি আটকা পড়ে আছেন মহাজনের দেনার কাছে। নিম্নমধ্যবিত্ত কিন্তু ইগোস্টিক এক পুরুষ তিনি যার কাছে সময়ে সময়ে নিজের পৌরুষের পরিচয় দেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে৷ আর এই সিনেমার সবচেয়ে কমপ্লিকেটেড চরিত্রটি হলো রাজিয়ার চরিত্র। রাজিয়া নাদেরের বাবাকে দেখাশোনা করার চাকরি নেন এবং সেখানে গিয়ে একে একে নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে থাকেন, বাধ্য হন গর্ভপাত করাতেও। রাজিয়া বারবার নিজেকে ভাঙছেন, গড়ছেন। তিনি কোনো সিদ্ধান্তে দৃঢ় থাকতে পারেন না, পারিপার্শ্বিকতা তাকে বারবার নিজের কাছেই নিজের পরাজয় নিশ্চিত করায়। তাকে একইসঙ্গে একজন আলজেইমার রোগী, একটা কমপ্লেক্সুয়াল চরিত্র নাদের আবার তার মেজাজি স্বামী হোজ্জাতের সঙ্গে ডিল করতে হয়।
এই মুভিতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জগুলো উপরোক্ত ক্যারেক্টারের কেউই নেননি যা নিয়েছেন সারিনা ফারহাদি (তারমেহ) এবং কিমিয়া হোসাইনী (সুমায়াহ)। তারমেহ নাদের দম্পতি আর সুমায়াহ হোজ্জাত দম্পতির মেয়ে। দুজন সোসাইটির দুটো আলাদা ক্লাসে এক্সিস্ট করেন, অথচ শান্তিপ্রিয়। দুটো পরিবার পরস্পর মুখোমুখি অবস্থায়ও তারা দুজন দুজনকে ভালোবাসতে পারেন। শান্তি খুঁজতে ব্যস্ত থাকেন। আবার তারাই নিজের মতো করে নিজ বাবা-মাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে ব্যাকুল থাকেন, তাদের মনকে বোঝাতে চেষ্টা করেন বাবা-মা'রা দোষী হয় না।
ফারহাদি ইরানের মুভির একজন চেইঞ্জমেকার। তার নির্মাণশৈলী নিয়ে নতুনভাবে কিছু বলার থাকে না। এই সিনেমায় তিনি গল্পের সঙ্গে নির্মাণের যে কম্বিনেশন দেখিয়েছেন তা গোটা দুই ঘণ্টা তিন মিনিট সময় জুড়ে আপনাকে একটা অস্বস্তির ঘোরে ফেলে রাখবে। ব্যাপারটা অনেকটা এমন যে কোনো দৃশ্যে আপনার মনে হচ্ছে এই ঘটনা যাতে না ঘটে, কিন্তু সেটাই বারবার ঘটবে। আপনি চাইবেন রাজিয়া একটু মনোবল নিয়ে দাঁড়াক আর দেখতে পাবেন ভেঙে চুরমার হচ্ছেন তিনি। আপনি চাইবেন নাদের কোর্টে রেগে গিয়ে হোজ্জাতকে একটা ঘুষি মেরে দিক কিন্তু দেখতে পাবেন নাদের হোজ্জাতের হয়ে এপোলজি করছেন বিচারকের কাছে। পুরোটা সময় জুড়ে ক্যামেরা কেবলই নড়ছে, বারবার অ্যাঙ্গেল পরিবর্তন করছে যেন রাজিয়ার মন দিয়ে আপনি এই সিনেমা দেখছেন। এই সিনেমায় বলতে গেলে লং শট আছে হাতেগোনা। বেশিরভাগই সিঙ্গেল টেক শট, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শটই ক্লোজ শট। আপনার স্ক্রিনে আপনি দেখবেন ক্যারেক্টার গুলো নড়ছে অনেক বেশি, সাথে অতিরিক্ত নয়েজ, এমন অনেক নয়েজ যার কারণে ক্যারেক্টারের ডায়ালগও হালকা শোনাচ্ছে। সব মিলিয়ে একটা পীড়াদায়ক স্ক্রিনপ্লে এই সিনেমা দাঁড় করিয়েছে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে।
এই সিনেমা শেষ হওয়ার পর আপনার বোধোদয় হবে এখানে হাসি নেই। নেই কোনো মিউজিক, গান। বরঞ্চ সময়ে সময়ে এত বেশি শব্দ, ইকো আর নয়েজ যে গোটা সময়টাতেই কেমন যেন আমার পাশের ফ্ল্যাটেই গোলমাল হচ্ছে ধরনের একটা মাথাব্যথা আপনার সামনে দাঁড় করাবে। তার ওপরে আছে তো গল্পের বিশেষত্ব যেখানে ডেইলি রুটিন জুড়েই আপনি কেবল দেখবেন অপেক্ষা, নেগোসিয়েশন, বিচ্ছেদ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা প্রভৃতির একটা গোলকধাঁধা।
একজন অসুস্থ বাবাকে তার স্ত্রীর অভিলাষের ওপরে জায়গা করে দিতে গিয়ে শুরু হওয়া এই গল্পটা কেন গুরুত্বপূর্ণ এমন প্রশ্ন করাটা বারণ। এই সিনেমার সবচেয়ে সুন্দর ঘটনা হলো আপনি চাইলে প্রত্যেকটি চরিত্রের পক্ষে কথা বলতে পারবেন, বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে পারবেন। ফারহাদি তার সিনেমায় প্রত্যেকটা চরিত্রকে নিজের মতো বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। তা করতে গিয়ে বের হয়ে এসেছে তেহরানের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের পরিবারের গল্প যারা রিলিজিয়নের ওপরে অন্য কিছুকে ঠাঁই দিতে চান না আবার দৈনন্দিন জীবনের সমীকরণ কীভাবে ধর্মীয় রুলস অ্যান্ড রেগুলেশনসকে মুখোমুখি এনে দাঁড় করাচ্ছে। আবার কত সহজে একটা সত্যকে সামনে আনতে গিয়ে মিথ্যাগুলো বারবার ভেঙে পড়ছে তার প্রকৃষ্ট স্ক্রিনিং এই সিনেমা।
যে ডিভোর্সের বন্দোবস্ত করতে গিয়ে এক অস্বস্তিকর গল্পের শুরু হয় সে গল্পটা নিজেই অপারগ ওই ডিভোর্স কি শেষমেশ হয়েছিল কিনা তা দর্শককে জানাতে। এই সিনেমার এন্ডিং আলাদাভাবে আলোচনার দাবি রাখে। খুব কম সিনেমায়ই এত সাবলীল কিন্তু সাধারণ এন্ডিং হয় যা আপনাকে কোনো উপসংহারেও যেতে দেয় না। নাদের-সিমিন দুজনেই তো ডিভোর্সের দিকে আগাচ্ছিলেন, সেই পথে হাঁটতে হাঁটতে পরাবাস্তবতাই তাদের বারবার একজনকে অন্যের পাশে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সম্ভবত ওই ট্রানজিশন পিরিয়ডই সবচেয়ে সুন্দর সময় দর্শকের জন্য, কারণ তা উপভোগ্য৷ আর সিনেমা দেখে ক’টা ডিভোর্সই বা কমবে ইট-কংক্রিটের শহরে?
লেখক: সিনেমাকর্মী, [email protected]
