সোনালি অতীত নিয়ে স্মৃতিকাতর ববিতা

আপডেট : ১৮ মে ২০২২, ১১:৪৩ পিএম

দেশের প্রথম আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেত্রী ববিতা। বাংলাদেশের মানুষের মনে তিনি রাজত্ব করছেন দীর্ঘকাল। কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের নায়িকা হয়ে তিনি হয়ে ওঠেন রেড কার্পেটের রানী। এখন বাংলাদেশর তারকারা কান বা বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে গেলে যে আলোচনা হয়, ববিতার সময় হয়তো এতটা হতো না। কিন্তু মস্কো, বার্লিনসহ বিশে^র অসংখ্য চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। শুধু রেড কার্পেটেই আলো ছড়িয়েছেন তা কিন্তু নয়। জুরি বোর্ডেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। ববিতা বলেন, ‘অশনি সংকেত ছবিটি করার পর থেকেই আমি নিয়মিত বিশে্বর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবে ডাক পেয়েছি। সে সময় দেশের সম্মানের কথাই আমি ভেবেছি। হাতে অনেক ছবি থাকত। শ্যুটিং সিডিউল মিলিয়ে দেশের বাইরে কয়েক দিনের জন্য থাকাটা ভীষণ চ্যালেঞ্জিং ছিল। তারপরও আমি ব্যালেন্স করেছি। কারণ আমার সময়ে আন্তর্জাতিক মহল থেকে এ ধরনের বিরল সুযোগ আর কেউ পেতেন না। দেশের চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতিকে বিদেশের এত বড় বড় মঞ্চে তুলে ধরার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইনি। এজন্য অনেক ভালো ভালো ছবিও আমাকে ছেড়ে দিতে হয়েছে। কিন্তু আমি তোয়াক্কা করিনি। সব সময় চেয়েছি আমাদের সিনেমা দেশের গ-ি পেরিয়ে বিশ^ময় ছড়িয়ে পড়ুক।’ তিনি আরও বলেন, ‘এত কষ্ট করে দেশের চলচ্চিত্রকে যখন বিদেশে পরিচিত করা শুরু করলাম, তখনই আমাদের সিনেমা যেন আস্তে আস্তে পেছনের দিকে যেতে লাগল। বাণিজ্যিক ঘরানার ছবি ছাড়া আর কিছু নির্মাণই বন্ধ হয়ে গেল। অথচ আমরা একটা সময় জহির রায়হান, খান আতাউর রহমান, নারায়ণ ঘোষ মিতা, কাজী জহিরসহ কত বিজ্ঞ পরিচালকের ক্ল্যাসিক ছবি করেছি। সেগুলো দর্শক টিকিট কেটে হলে গিয়ে দেখেছে। ছবি একদিকে সুপারহিট হয়েছে, অন্যদিকে সমালোচকদের মন জয় করেছে। কিন্তু সেই সোনালি অতীত যেন তলিয়ে গেল অস্থিরতার জোয়ারে। এখন তো নায়ক-নায়িকার নাচ-গান আর ফাইট ছাড়া কিছুই দেখি না ছবিতে।’

তবে আশাবাদী ববিতা। তিনি বলেন, ‘এরমধ্যে শুনেছি বেশকিছু ভালো সিনেমা হয়েছে। আমি ভালো সিনেমা বলি সেই ছবিকে, যা জীবনের কথা বলে। যাতে কল্পনা একেবারেই বর্জিত। আর সেই ছবির ভাষা হতে হবে আধুনিক, সর্বজনীন। এমন ছবিতে যদি আমার করার মতো কোনো চরিত্র থাকে আমি যে কোনো মুহূর্তে অভিনয়ে ফেরার জন্য প্রস্তুত। আমি হয়তো এখন অভিনয় করছি না। কিন্তু কখনো বলিনি, আর অভিনয় করব না। কারণ, অভিনয়টা আমি মন থেকে ভালোবাসি, হৃদয়ে ধারণ করি। আজীবন তো অভিনয়টাই করে গেছি। ভালো ভালো ছবি করে যেমন অসংখ্য দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা পেয়েছি, তেমনি পেয়েছি সবার সম্মান। আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সম্মানের সঙ্গে আমাকে ডাকা হয়েছে। তাই চলচ্চিত্রের প্রতি আমার ঋণ আজন্ম। এখনো তেমন ভালো ছবি হলে আমি করতে চাই।’

কিন্তু তিনি আক্ষেপের সঙ্গে বললেন, ‘ছবির প্রস্তাব নিয়মিত পাই। কিন্তু এখন যারা ভালো ছবি করছেন তারা তো আমার কাছে আসছেন না। আর যারা আসছেন তাদের ছবির গল্প আর চরিত্র আমার মতঃপূত হচ্ছে না।’ ববিতা ২০১৫ সালে সর্বশেষ নারগিস আক্তারের ‘পুত্র এখন পয়সাওয়ালা’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এরপর উন্নত গল্প চরিত্রের অভাবে তিনি অভিনয় থেকে দূরে সরেন। তবে তিনি চলচ্চিত্রের খোঁজখবর রাখেন। এবারের ঈদে মুক্তি পাওয়া ছবিগুলো ভালো দর্শক সাড়া পেয়েছে জেনে তিনি খুব খশি। বললেন, ‘আসলে সুনির্মিত ও ভালো গল্পের ছবি পেলে যে দর্শক সিনেমা হলে এসে দেখে এই ঈদের ছবি দিয়ে আবারও প্রমাণ হলো। আসলে চলচ্চিত্রের সুদিন ফেরাতে হলে মানসম্মত ছবির বিকল্প নেই। ছবির মান ভালো থাকলে শুধু আমি নই অনেক খ্যাতিমান সিনিয়র অভিনয়শিল্পী আবার অভিনয়ে ফিরবে। তাই নির্মাতাদের কাছে অনুরোধ, আপনারা গল্প ও প্রযুক্তির দিক দিয়ে উন্নত মানের ছবি নির্মাণ করুন, তবেই দেশীয় চলচ্চিত্রের হারানো গৌরব আবার ফিরবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত