নরসিংদী রেলওয়ে স্টেশনে ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা তরুণীকে পোশাক পরা নিয়ে হেনস্তা ও শ্লীলতাহানির ঘটনার সময়ই থানা পুলিশ গিয়ে ওই তরুণী ও হেনস্তাকারী সবার নাম-ঠিকানা লিখে নিয়েছিল। কিন্তু ঘটনাটি আমলে নিয়ে হেনস্তাকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নেয়নি থানা পুলিশ। তরুণীকে হেনস্তা ও মারধরের ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হলে টনক নড়ে সংশ্লিষ্টদের। বিষয়টি নিয়ে নরসিংদীসহ দেশজুড়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আলোচনা-সমালোচনার মুখে ঘটনার দুদিন পর গত শুক্রবার রাতে তরুণীকে মারধরে জড়িত অভিযোগে ইসমাইল মিয়া (৩৫) নামে এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ।
এদিকে পোশাক পরা নিয়ে তরুণী শ্লীলতাহানির ঘটনাকে নারীর স্বাধীনতায় আঘাত বলে মনে করছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। ওই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
তরুণী শ্লীলতাহানির ঘটনায় আটক ইসমাইল নরসিংদী সদর উপজেলার করিমপুর ইউনিয়নের বুদিয়ামারা এলাকার প্রয়াত বাদল মিয়ার ছেলে। পেশায় সে নির্মাণশ্রমিক।
গত বুধবার সকালে নরসিংদী রেলস্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে ঢাকাগামী চট্টগ্রাম মেইল ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন দুই তরুণ ও এক তরুণী। তরুণীর পরনে ছিল জিন্স প্যান্ট ও টপস। তাই দেখে স্টেশনে অবস্থানরত এক নারী প্রথমে ওই তরুণীর সঙ্গে ইচ্ছে করে ঝগড়া বাধায়। পরে তাকে আঘাতও করে। এরপর আরও কয়েকজন ব্যক্তি তরুণীর ওপর হামলার চেষ্টা চালায়। এমন পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগী ওই তরুণী দৌড়ে স্টেশন মাস্টারের কক্ষে গিয়ে আশ্রয় নিয়ে তাকে বাঁচানোর অনুরোধ করেন। পরে স্টেশন মাস্টারের মধ্যস্থতায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তরুণ-তরুণীদের ঢাকাগামী চট্টগ্রাম মেইল ট্রেনে উঠিয়ে দেওয়া হয়। এরই মধ্যে তরুণীকে হেনস্তা ও মারধরের ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর টনক নড়ে সংশ্লিষ্টদের। ঘটনার দুদিন পর নড়ে বসে জেলা প্রশাসন ও রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষ। শুক্রবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শ্যামল বসাকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল নরসিংদী রেলস্টেশন পরিদর্শন করে। ওই সময় ম্যাজিস্ট্রেট শ্যামল বসাক সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। জেলা প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদারক করছে। সিসিটিভির ফুটেজগুলো রেলওয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সংগ্রহ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সার্বিক ব্যবস্থা নিতে তৎপর জেলা প্রশাসন।’
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, তরুণীর ওপর হামলার সময় স্টেশন থেকে এক ব্যক্তি জাতীয় জরুরি সেবার নম্বর ৯৯৯-এ কল করে বিষয়টি জানান। এর কিছুক্ষণ পর নরসিংদী সদর মডেল থানার এএসআই ইকবাল হোসেন রেলস্টেশনে গিয়ে হামলার শিকার তরুণী ও তাকে হেনস্তাকারী সবার নাম-ঠিকানা লিখে নিয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনাটি আমলে নিয়ে হেনস্তাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি থানা পুলিশ।
এর কারণ জানতে চাইলে গতকাল শনিবার নরসিংদী সদর মডেল থানার ওসি সওগাতুল আলম বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কোনো বক্তব্য দিতে পারব না। বিষয়টি যেহেতু রেলওয়ে পুলিশের অধীন, এ বিষয়ে তারা বলবে।’
তরুণীর শ্লীলতাহানির ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হলে ঘটনার দুদিন পর শুক্রবার রাতে নরসিংদী শহরের ইউএমসি জুট মিলের সামনে থেকে ইসমাইল মিয়াকে আটক করে নরসিংদী সদর মডেল থানা পুলিশ। পরে রাতেই তাকে রেলওয়ে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। গতকাল আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে ইসমাইলকে।
ভৈরব রেলওয়ে থানার সামনে গতকাল এ প্রতিবেদকের কথা হয় আটক ইসমাইল মিয়ার স্ত্রী কুলসুম বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী গাজীপুরের টঙ্গীর একটি নির্মাণাধীন ভবনে ইট-বালু ওঠানোর কাজ করেন। টঙ্গী যাওয়ার জন্য বুধবার ভোরে নরসিংদী রেলস্টেশনে যান। সেখানে তরুণীর “অশালীন” পোশাক দেখে তার সঙ্গে এক নারী ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়ে। তখন তরুণীর সঙ্গে থাকা এক তরুণ ওই নারীর সঙ্গে “খারাপ আচরণ” করলে আমার স্বামী তাকে থাপ্পড় দেন। এটাই তার অপরাধ।’
তবে গতকাল পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় আটক ইসমাইল দেশ রূপান্তরের কাছে দাবি করেন, তরুণীকে হেনস্তার সময় তিনি কাউকে মারেননি। তবে ভিডিও ক্লিপে তার সম্পৃক্ততা দেখা গেছে জানালে তিনি এর কোনো সদত্তর দিতে পারেননি।
ভৈরব রেলওয়ে থানার ওসি ফেরদাউস আহমেদ বিশ্বাস বলেন, ‘ঘটনার ভিডিও ও সিসিটিভির ফুটেজ দেখে ইসমাইল মিয়াকে শনাক্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত আরও বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই করে তাদেরও গ্রেপ্তার করা হবে।’
হামলার শিকার তরুণীর পরিচয় পেয়েছেন জানালেও তা জানাতে অস্বীকৃতি জানান এ পুলিশ কর্মকর্তা। নির্যাতনের শিকার তরুণী মামলা না করলে ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আটক ইসমাইলের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
পোশাক পরা নিয়ে তরুণী শ্লীলতাহানির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নারী অধিকার কর্মীরা। তারা ঘটনাটিকে নারীর স্বাধীনতায় আঘাত বলে মনে করছেন। একই সঙ্গে রেলপথে যাত্রীর নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নরসিংদী জেলা শাখার আন্দোলন সম্পাদক জয়শ্রী সাহা বলেন, ‘এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। এ ধরনের ঘটনা আমরা শুনতে চাই না। তবুও আমাদের বারবার শুনতে হচ্ছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এ ঘটনায় উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত বখাটেদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানাচ্ছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার পোশাক কেমন হবে, এটা একান্ত আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। একটা স্বাধীন দেশে বসবাস করে আমি নিরাপদে বের হতে পারব না, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ও ন্যক্কারজনক বিষয়। এরকম ঘটনা ভবিষ্যতে যাতে না ঘটে, তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।’
