নরসিংদীতে স্ত্রী ও ছেলেমেয়েকে হত্যা

আপডেট : ২৩ মে ২০২২, ০২:০২ এএম

মানিকগঞ্জের একটি গ্রামে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে হত্যার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার নরসিংদীতে ঘটল একই ঘটনা। গতকাল রবিবার সকালে নরসিংদীর বেলাবোর একটি গ্রাম থেকে উদ্ধার করা হয়েছে এক রংমিস্ত্রির স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়ের লাশ। হত্যাকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগে আটক করা হয়েছে ওই রংমিস্ত্রিকে। সে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্ত্রী-সন্তানদের ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে পিটিয়ে ও ছুরিকাঘাত করে হত্যার কথা স্বীকার করেছে।

পুলিশ বলছে, গতকাল সকালে উপজেলার পাটুলি ইউনিয়নের ভাবলা গ্রামের গিয়াস শেখের বাড়ির দুই ঘর থেকে তার স্ত্রী রাহিমা বেগম (৩৫), ছেলে রাব্বি শেখ (১৩) ও মেয়ে রাকিবা শেখের (৬) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর দিনভর নানা রহস্য থাকলেও বেলা গড়াতেই খুলতে শুরু করে রহস্যের জট। সর্বশেষ গিয়াসকে আটকের পর স্ত্রী-সন্তানসহ একে একে তিনজনকে হত্যার দায় স্বীকার করেছে। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি ও ক্রিকেট ব্যাট জব্দ করা হয়।

স্বামী গিয়াস উদ্দিন শেখ পুলিশকে জানায়, শনিবার রাতে ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে আঘাত করে তাদের আহত করে। পরে ছুরি দিয়ে আঘাত করে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করে। গিয়াসের দাবি, শত্রুদের ঘায়েল করার জন্য সে এ নৃশংস হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। তবে এর পেছনে পরকীয়ার সম্পর্ক পেয়েছে পিবিআই।

স্থানীয়দের বরাতে পুলিশ জানায়, নিহত রাহিমা বেগম এলাকায় দর্জি হিসেবে পরিচিত। রাব্বি স্থানীয় একটি মাদ্রাসার ছাত্র ও রাকিবা স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত। আর গিয়াস রংমিস্ত্রির কাজ করে। সে বেশিরভাগ সময়ই বাড়ির বাইরে থাকত।

গতকাল সকালে শরীফা আক্তার নামে এক প্রতিবেশী সেলাই করতে দেওয়া কাপড় নিতে রাহিমাদের বাড়ি এসে দেখেন একটি ঘরের মেঝেতে তার রক্তাক্ত দেহ পড়ে রয়েছে। পাশের ঘরে দেখেন চৌকির ওপর দুই সন্তানের দেহ। তার চিৎকারের প্রতিবেশীরা এসে পুলিশে খবর দেন।

সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বেলাবো থানার ওসি সাফায়েত হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। বেলা ১১টার দিকে নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) সাহেব আলী পাঠানও ঘটনাস্থলে যান। পরে পিবিআই নরসিংদীর পুলিশ সুপার এনায়েত হোসেন মান্নান ও সিআইডির পুলিশ সুপার এনামুল কবিরের নেতৃত্বে দুটি দল যোগ দেওয়ার পর লাশ উদ্ধারের কাজ শুরু হয়।

সরেজমিন দেখা গেছে, ভাবলা গ্রামটি লাল মাটির পাহাড়ি টিলা ও সমতল জায়গায় বিস্তৃত। ফলে বেশিরভাগ বাড়িই একটি থেকে আরেকটির মধ্যে বেশ দূরত্ব। গিয়াসের বাড়িতে পাশাপাশি লাগোয়া দুটি মাটির ঘর। পশ্চিম দিকের ঘরটিতে রাহিমা বেগমকে এবং দক্ষিণ দিকের ঘরে রাব্বি ও রাকিবাকে হত্যা করা হয়েছে।

নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) সাহেব আলী পাঠান জানান, নিহতদের শরীরে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। রাহিমার শরীরে আঘাতের চিহ্ন সবচেয়ে বেশি। তার মাথায়, গলায়, বুকে ও হাতে উপর্যুপরি আঘাত করা হয়েছে। তাদের শ্বাসরোধে হত্যার আলামতও দেখা যাচ্ছে।

দুপুরের দিকে গিয়াস দাবি করে, সে খবর পেয়ে গাজীপুর থেকে এসেছে। রাতে বাড়িতে ছিল না। এক সপ্তাহ আগে বাড়িতে কয়েকটি গাছ কেটেছিল। এ নিয়ে তখন তার এক চাচাতো ভাই রেনু মিয়ার সঙ্গে ঝগড়া হয়। ওই চাচাতো ভাই এ ঘটনা ঘটাতে পারে। তবে ঘটনাস্থলে গিয়াসের ভাবলেশহীন চলাফেরা পিবিআইয়ের নজরে পড়ে। সে সময় সে ঘন ঘন একটি মেয়ের সঙ্গে কথাও বলছিল। বিষয়গুলো নিয়ে সন্দেহ হলে পিবিআই গিয়াসের ফোন ট্র্যাক করে জানতে পারে, রাতে সে এলাকায়ই ছিল। পরে দুপুর ১টার দিকে তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে।

পিবিআই নরসিংদীর পুলিশ সুপার এনায়েত হোসেন মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিহতের স্বামী গিয়াস উদ্দিন নিজের তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার কথা আমাদের কাছে স্বীকার করেছে। সে জুয়া ও মাদকে আসক্ত। আমরা সব বিষয় যাচাই-বাছাই করে হত্যাকান্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটনের চেষ্টা করছি।

এর আগে গত ৮ মে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বালিয়াখোড়া ইউনিয়নের আঙ্গুরপাড়া গ্রাম থেকে স্থানীয় এক পল্লী দন্ত চিকিৎসকের স্ত্রী ও দুই মেয়ের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ওই দন্ত চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সে পরে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটিয়েছে বলে স্বীকার করে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত