ছোটবেলা থেকেই ‘আল্লাহ’ নামটি শুনলেই একটি ভয় কাজ করত। কারণ এই নামটি দিয়ে জীবনে যতটি ভয় দেখানো হয়েছে, অন্য কোনো নাম দিয়ে দেখানো হয়নি। ছোটবেলায় বিদ্যুৎ চলে গেলে, আব্বা চুলার পাড়ে বসিয়ে নামাজের সুরা মুখস্থ করাতেন। তখন বলতেন, ‘এগুলো শিখতে হবে, নামাজও পড়তে হবে। তা না হলে আল্লাহ পাপ দেবেন এবং আগুনে নিক্ষেপ করবেন।’ তার পর খেলতে গিয়ে কারও সঙ্গে ঝগড়া হলে আম্মা বলতেন, ‘ঝগড়া করা খুব খারাপ। আল্লাহ খুবই অপছন্দ করেন। এ কারণে আল্লাহ কিন্তু ‘তোমাকে কঠিন শাস্তি দেবেন।’
ছোটবেলায় সব অপরাধের শাস্তিস্বরূপ আল্লাহর ভয় দেখানো হতো। আর এভাবেই ‘আল্লাহ’ নামটি শুনলেই আমার মনে ভীতি কাজ করত। মনে হতো আল্লাহ যেন খুবই রাগী কেউ! যিনি সারাক্ষণ রাগে গজগজ করেন। কেউ অপরাধ করলে কিংবা কোনো অন্যায় করলে আল্লাহ রাগে আগুন হয়ে যান। তার পর মানুষ মরে গেলে আল্লাহ সেই আগুনে মানুষকে নিক্ষেপ করেন। কেউ তার হাত থেকে নিস্তার পাবে না। কিন্তু ‘দয়াময় আল্লাহতায়ালা কি আসলেই প্রচণ্ড রাগী?
এই প্রশ্নের উত্তর বলার আগে একটি ঘটনা বলি। একবার যুদ্ধের ময়দানে একটি ছোট শিশু হারিয়ে যায়। আর সেই শিশুর মা যুদ্ধের ময়দানে পাগলের মতো সন্তানকে খুঁজতে থাকে। সে হন্যে হয়ে খুঁজতে খুঁজতে একসময় নিজের সন্তানকে পেয়েও যায়। সন্তানকে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের স্তনের সঙ্গে চেপে ধরে দুধ খাওয়াতে থাকে।
আর এই দৃশ্যটি আল্লাহর রাসুল (সা.) তার সাহাবাদের নিয়ে অবলোকন করছিলেন। আল্লাহর রাসুল (সা.) সাহাবাদের উদ্দেশে বললেন, ‘আচ্ছা বলত দেখি, এই মা কি তার নিজের সন্তানকে কখনো আগুনে নিক্ষেপ করতে পারবে? উপস্থিত সাহাবিরা বললেন, কক্ষনও পারবে না। তখন আল্লাহর রাসুল (সা.) বললেন, ‘এই মা তার সন্তানকে যতটা ভালোবাসে ও মহব্বত করে, আল্লাহতায়ালা তার বান্দাদের তার চেয়েও অনেক গুণ বেশি ভালোবাসেন এবং মহব্বত করেন।’ আর আল্লাহ নিজের ব্যাপারে নবী করিম (সা.)-কে দিয়ে বলিয়েছেন, ‘আমার রহমত, করুণা ও দয়া সব সময় আমার রাগ বা ক্রোধের তুলনায় বেশি।’ সহিহ্ মুসলিম : ৬৭১৬
এবার প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ ইমাম সুফিয়ান আস সাওরি (রহ.)-এর একটি ঘটনা উল্লেখ করি। তিনি মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে সবাইকে ডেকে বললেন, ‘আজ আমি ভীষণ খুশি। কারণ, রোজ হাসরের দিন আমার জন্মদাত্রী মা বা বাবা আমার বিচার করবেন না। বিচার করবেন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। আর আমি আমার মা-বাবার মমতার তুলনায় মহান আল্লাহর রহমতের প্রতি অনেক বেশি আস্থাশীল।’ হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর করুণা ও দয়ার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘মহান আল্লাহ তার করুণাধারাকে শতভাগে বিভক্ত করেছেন। সেই রহমতের মাত্র একভাগ তিনি পৃথিবীতে দিয়েছেন।’ সহিহ্ বোখারি : ৬০০০
আল্লাহর রাসুল (সা.) আরও বলেছেন, ‘যদি কাফেরও আল্লাহর রহমতের পরিমাণ জানত, তা হলে সেও জান্নাতে যাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে উঠত।’ সহিহ্ মুসলিম : ৬৭২৬
অর্থাৎ মহান আল্লাহ কখনো প্রচণ্ড রাগী নন, বরং মমতাপূর্ণ মহান মালিক। আর মানুষের একান্ত আপন বলতে আল্লাহ ছাড়া আর কেউই নেই।
