বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বসানো ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা কৌশলে বন্ধ রাখা হচ্ছে। এমনকি ইচ্ছে করে ক্যামেরার সঙ্গে যুক্ত ডিভাইসগুলো অচল রাখা হচ্ছে। বিমানবন্দরে ঘটে যাওয়া অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য আড়াল করতেই কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এটি করছেন বলে সম্প্রতি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের (বেবিচক) এক প্রতিবেদেন উঠে এসেছে। এতে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাজুক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে উদাহরণ হিসেবে এনে বাকিগুলোর চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। শাহ আমানতের চারপাশে বড় বড় গাছ থাকায় দুর্বৃত্তরা সহজেই বিমানবন্দরে প্রবেশ করতে পারছে। রানওয়ের চারপাশ অরক্ষিত। বিমানবন্দরগুলোর জরাজীর্ণ কাঁটাতারের বেড়া দ্রুত মেরামতসহ নিরাপত্তা জোরদারে পদক্ষেপ না নিলে বড় ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার আশঙ্কা করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, বরিশাল, সিলেট, কক্সবাজার, রাজশাহী, যশোর, সৈয়দপুরসহ দেশের প্রতিটি বিমানবন্দরেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নাজুক। হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে যাত্রীদের নামকাওয়াস্তা তল্লাশি করা হয়। বিনা বাধায় যে কেউ কার্গো ভিলেজে যেতে পারে। সব জেনেশুনেও নির্বিকার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা।
এ বিষয়ে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। সব বিমানবন্দরে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে যা যা করা দরকার, করা হচ্ছে। এখানে কোনো অপরাধী চক্র থাকতে পারবে না। তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যেসব বিমানবন্দরে কাঁটাতারের বেড়া নষ্ট হয়ে গেছে, তা মেরামত করা হচ্ছে। আমরা যেখানেই নিরাপত্তার ঘাটতি পাচ্ছি, সেখানেই কাজ করছি।’
বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, কমবেশি দেশের সবকটি বিমানবন্দরেই নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের শাহ আমানত, সিলেটের এমএজি ওসমানী, যশোর, কক্সবাজার, সৈয়দপুর ও বরিশাল বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। এসব বিমানবন্দরের চারপাশে থাকা কাঁটাতারের বেড়ার অবস্থা ভালো নয়। যাত্রীদের ঠিকমতো তল্লাশি করা হয় না। বিশেষ করে ভিআইপি যাত্রীদের তল্লাশি করা সম্ভব হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বেবিচকের মাঠপর্যায়ের কর্মীরাও বিপাকে রয়েছেন।
সূত্রে জানা গেছে, বেবিচক বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে করা তাদের গোপন প্রতিবেদন গত ২৬ এপ্রিল সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটির চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেকটাই খারাপ। চারপাশের কাঁটাতারের বেড়াগুলো প্রায়ই নষ্ট, বেশিরভাগ তার ছিঁড়ে গেছে। সীমানা প্রাচীরের উভয় পাশের বড় গাছ ও আবাসিক ভবনের ছাদ ব্যবহার করে দুষ্কৃতকারীরা সহজেই বিমানবন্দরের ভেতরে আসছে। বিমানবন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপ্রোন, টারমাক এরিয়া, ট্যাক্সিওয়ে এমনকি অবাধে রানওয়েতে আসা-যাওয়া করতে পারছে। এখানে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে সিসি ক্যামেরা লাগানো হলেও ত্রুটির অজুহাত দেখিয়ে কৌশলে দিনের পর দিন বন্ধ রাখা হচ্ছে। কে বা কারা শাহ আমানতের সাতটির মধ্যে পাঁচটি ভিডিও রেকর্ড নষ্ট করে রেখেছে। বিমানবন্দর লাগোয়া পদ্মা ওয়েল কোম্পানির রিজার্ভ ট্যাংকসংলগ্ন এলাকায় সীমান প্রাচীরের উচ্চতা ৭ ফিটেরও কম। ওই এলাকায় সিসি ক্যামেরা নেই বললেই চলে।
বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিবেদনে শাহ আমানত বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি উদাহরণ হিসেবে বোঝানো হয়েছে। বাস্তবে অন্যান্য বিমানবন্দরের অবস্থাও একই। নিরাপত্তা জোরদারে কিছু সুপারিশসহ প্রতিবেদনটি বেবিচক চেয়ারম্যান, প্রকৌশল শাখাসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। সুপারিশে যেসব বিমানবন্দরে কাঁটাতারের বেড়া নষ্ট হয়ে গেছে, সেগুলো দ্রুত মেরামতে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। শাহ আমানতের নষ্ট সিসি ক্যামেরাগুলো দ্রুত মেরামত, রানওয়ের চারপাশে নতুন ক্যামেরা বসানো, পদ্মা ওয়েল কোম্পানির পার্শ্ববর্তী দেয়াল উঁচু, বড় বড় গাছ কেটে ফেলা, ছাদ থেকে ভেতরে আসা ঠেকাতে প্রতিবন্ধক দেয়াল তৈরির পাশাপাশি সার্বক্ষণিক তদারকি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যান্য বিমানবন্দরে দায়িত্বরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সতর্ক ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, নাজুক নিরাপত্তায় শাহ আমানতের পরই সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অবস্থান। এখানকার কাঁটাতারের বেড়াগুলো খুবই জরাজীর্ণ। পাশের বেশ কয়েকটি উঁচু ভবন থাকায় ছাদ হয়ে দেয়াল টপকে বিমানবন্দরে প্রবেশ করতে পারবে দুর্বৃত্তরা। বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাও সন্তোষজনক নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কক্সবাজার বিমানবন্দরের চারপাশও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। কাঁটাতারের বেড়াগুলো ছিঁড়ে গেছে। বিমানবন্দরে যাত্রীদের তল্লাশি করা হয় না বললেই চলে। নিরাপত্তার সরঞ্জামেরও যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। যশোর, বরিশাল ও সৈয়দপুর বিমানবন্দরের চারপাশ অনেকটাই খোলামেলা। নিরাপত্তারক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে যে কেউ ভেতরে প্রবেশ করতে পারে বলে বেবিচকের আরেকটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বরিশাল বিমানবন্দরে ১৫টি ত্রুটি চিহ্নিত করা হয়েছে। রানওয়ের টিএইচআর ও সেন্ট্রাল লাইন মার্কিং নেই। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা দেয়ালভাঙা। অনেক স্থানে দেয়ালের নিচের অংশের মাটি সরে গেছে। রাজশাহীর শাহ মাখদুম বিমানবন্দরে ১৭টি ত্রুটি চিহ্নিত করেছে বেবিচক। তবে প্রতিবেদনে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা অন্যগুলোর তুলনায় কিছুটা আলাদা বলা হয়েছে। এরপরও এখানে কার্গো ভিলেজে বিনা বাধায় বহিরাগতরা ঢুকতে পারছে।
বেবিচক কর্মকর্তারা জানান, দেশের সবকটি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বাড়াতে আরও কী উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, তা নির্ধারণে মাস দুয়েক আগে বিমানবন্দরগুলোর ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন বেবিচক চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বেবিচক কার্যালয়ের ওই বৈঠকে ব্যবস্থাপকরা জানান, নিরাপত্তার প্রতিটি পয়েন্টে ব্যাপক জনবল ঘাটতি রয়েছে। তল্লাশিতে সাধারণ যাত্রীরা সহায়তা করলেও ভিআইপিরা ঝামেলা করেন। তাদের শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। স্ক্যানিং অপারেটর বাড়ানোসহ দ্রুত লোকবল নিয়োগের পরামর্শ দেন তারা।
বর্তমানে বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি ৩৪টির মতো বিমান সংস্থা ফ্লাইট পরিচালনা করছে। ৪৭টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বিমান চলাচল চুক্তি রয়েছে। বাংলাদেশ বিমানের পাশাপাশি বেসরকারি কয়েকটি এয়ারওয়েজ যাত্রী পরিবহন, ১০-১২টি বিমান সংস্থা কার্গো বিমান ও হেলিকপ্টার সার্ভিস পরিচালনা করছে। এসব ফ্লাইটে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ হাজার যাত্রী ছাড়াও মালামাল আসা-যাওয়া করে।
