পশ্চিম আফ্রিকায় দুঃশাসনের ইতিহাস গড়ে নজির সৃষ্টি করেন গাম্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জামমেহ। বিরোধী মত দমনে তার দীর্ঘ ২২ বছরের শাসনামলে নিত্যকার ঘটনা ছিল হত্যা, গুম, আটক ও নির্যাতন। স্বৈরশাসনের সাক্ষী হিসেবে গত অক্টোবরে উন্মুক্ত করা হয়েছে মেমোরি হাউজ। লিখেছেন নাসরিন শওকত
কোনো এক ব্যাপ্টিস্ট ধর্মাবলম্বীর একটি প্রশংসাপত্র, একটি বেসবল ক্যাপ, কয়েকটি ওয়ালেট ও বেল্ট, কয়েকটি নেকটাই এবং ব্যাংকের সদস্যপদের কিছু কার্ডের পাশেই রাখা অল্প
কথায় লেখা কয়েকটি কাগজের টুকরো। প্রশংসাপত্রটি ‘কম্পিউটার অপারেশন কোর্স’ শেষ করার জন্য কানিবা ক্যানালকে দেওয়া হয়েছে। পাশের নোটে লেখা আছে‘২০০৬-এ ১৮ সেপ্টেম্বর তাকে জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তার ভাগ্যে কী ঘটেছে তা এখনো অজানা।’ এটি একটি মেমোরি হাউজ বা স্মৃতি জাদুঘর। সাধারণত কোনো জাদুঘরে এ ধরনের সাধারণ কোনো উপকরণ প্রদর্শনীতে রাখা হয় না। কিন্তু এখানে রাখা এই স্মারকচিহ্নগুলো দর্শনার্থীর সামনে প্রতিদিন এক ভয়ংকর অতীতকে তুলে ধরে। সাবেক স্বৈরশাসক ইয়াহিয়া জাম্মেহের ২২ বছরের দুঃশাসনের শিকারদের উদ্দেশে জাদুঘরটি উৎসর্গ করা হয়েছে।
গাম্বিয়া
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। এর আনুষ্ঠানিক নাম রিপাবলিক অব দি গাম্বিয়া। ১০ হাজার ৬৮৯ বর্গকিলোমিটারের দেশটিতে ২৪ লাখ মানুষের বাস। ১৯৬৫ সালে গাম্বিয়া স্যার দাউদা জাওয়ারার নেতৃত্বে স্বাধীনতা লাভ করে। আফ্রিকার কেন্দ্রভাগে অবস্থিত দেশটি তিনদিক সেনেগাল দিয়ে ঘেরা। আটলান্টিকের তীরে এর ছোট্ট উপকূল রয়েছে। গাম্বিয়া নদীর তীরে অবস্থিত দেশটির রাজধানী এবং সবচেয়ে বৃহত্তম শহর বানজাল। গাম্বিয়ার অর্থনীতি মূলত কৃষি, মৎস্যচাষ ও পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। ২০১৫ সালে পরিসংখ্যান অনুসারে, দেশটির মোট জনগোষ্ঠীর ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে। তবে গ্রামাঞ্চলে কোথাও কোথাও দারিদ্র্যের এই হার প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত দেখা যায়।
১৪৫৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম ইউরোপীয় জাতি হিসেবে পর্তুগিজরা গাম্বিয়া অঞ্চলে আসে। তবে এ অঞ্চলে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য গড়ে তোলেনি তারা। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে এ এলাকা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একটি অংশ করে নিয়ে গাম্বিয়া প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৬৫ সালে স্বাধীনতা লাভ করে রক্তপাতহীন এক সামরিক অভ্যুত্থান পর্যন্ত (১৯৯৪ সাল) দাউদা জাওয়ারের নেতৃত্বে গাম্বিয়া শাসিত হয়। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে স্বৈরশাসক জামমেহকে পরাজিত করেন আদামা ব্যারো। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে তিনি গাম্বিয়ার তৃতীয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। প্রাথমিক অবস্থায় জামমেহ নির্বাচনের ফল মেনে নিলেও দায়িত্ব ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। এতে দেশটিতে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়। এসময় ইকোনমিক কমিউনিটি অব ওয়েস্ট আফ্রিকান স্টেট গাম্বিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপ চালায়। এর জেরে প্রেসিডেন্ট হিসেবে জামমেহের দায়িত্ব শেষ হওয়ার দুদিন পর তাকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করা হয়।
ইয়াহিয়া জামমেহর শাসনকাল
ইয়াহিয়া জামমেহ গাম্বিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট, রাজনীতিক ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা। তিনি ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত প্রথমবারের মতো দেশটির সামরিক বাহিনী আর্মড ফোর্সেস প্রভিশনাল রুলিং কাউন্সিলের (এফপিআরসি) চেয়ারম্যান ছিলেন। পরবর্তীকালে চার মেয়াদে ১৯৯৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৪ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন জামমেহ। পরপর চারটি নির্বাচনে জয়ী হয়ে গাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২২ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। তবে তার বিরুদ্ধে সব নির্বাচনেই কারচুপির অভিযোগ ছিল। সে সময় নির্বিচারে গ্রেপ্তার, জোরপূর্বক গুম এবং মৃত্যুদ- দেওয়া বছরের পর বছর ধরে চলে। তার দুই দশকেরও বেশি সময়ের এ শাসনকাল গাম্বিয়ার ইতিহাসে স্বৈরশাসনের স্বর্ণযুগ হিসেবে চিহ্নিত।
১৯৬৫ সালে ২৫ মে গাম্বিয়ার কানিলাইয়ের জোলা নৃগোষ্ঠীর এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জামমেহ। পুরো নাম ইয়াহিয়া আবদুল-আজিজ জেমুস জাঙ্কুং জামমেহ। তিনি ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত বনজুলের গাম্বিয়া হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীকালে ছয় বছর জামমেহ গাম্বিয়ার জাতীয় পুলিশ বাহিনীতে কাজ করেন। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত তিনি গাম্বিয়ার জাতীয় সেনাবাহিনীর পুলিশ বিভাগে কমিশনার কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৪ সালে তিনজন কনিষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্যার দাউদা জাওয়ারার সরকারকে উৎখাত করেন। নিজেকে সামরিক জান্তা বাহিনী এএফপিআরসির চেয়ারম্যান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং ১৯৯৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত সামরিক শাসনের অধীনে গাম্বিয়া শাসন করেন। ১৯৯৬ সালে জামমেহ এপিআরসি প্রার্থী হিসেবে দেশটির প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট দাউদা জাওয়ারাকে পরাজিত করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হন। একই বছর সংবিধানের অধীনে নতুন জাতীয় পরিষদ গঠিত হয়। এ পরিষদের অধীনে পরের বছর ১৯৯৭ সালের সংসদীয় নির্বাচনে এপিআরসি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় পায়। এ দুটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রথম সামরিক শাসন থেকে গাম্বিয়ায় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার উত্তরণ ঘটে।
পরবর্তীকালে তিন মেয়াদে ২০০১, ২০০৬ এবং ২০১১ সালে জামমেহ পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কিন্তু ২০১৬ সালে রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড পার্টির নেতা আদামা ব্যারোর কাছে পরাজিত হন গাম্বিয়ার ক্ষমতাধর এ স্বৈরশাসক। তার কর্তৃত্ববাদী প্রেসিডেন্টের মেয়াদকালে গাম্বিয়ায় সাংবাদিক, এলিজিবিটি অধিকারকর্মী ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ করতে দেখা যায়। তার সরকারের পররাষ্ট্রনীতির জেরে কাছের প্রতিবেশী দেশ সেনেগালের সঙ্গে সম্পর্কের চরম অবনতি চলে ২০১৩ সাল পর্যন্ত। জামমেহ প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন থেকেও নাম প্রত্যাহার করে নেয় গাম্বিয়া। প্রথমে কমনওয়েলথ থেকে ও পরবর্তীকালে ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত থেকে গাম্বিয়াকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেন তিনি। তবে ব্যারো সরকার ২০১৮ সালে পুনরায় কমনওয়েলথে ও পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যোগ দেয়।
জামমেহের বিরুদ্ধে দেশের কফার তহবিল থেকে কয়েক মিলিয়ন ডলার চুরি করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্য এই বপিুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেন তিনি। দেশত্যাগের পরে অনেক দেশ তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে। এরপর তিনি প্রতিবেশী দেশ গিনিতে নির্বাসনে চলে যান। দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি তরুণীকে ধর্ষণ করারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জামমেহ। লিবিয়ার প্রয়াত প্রেসিডেন্ট কর্নেল গাদ্দাফির বন্ধু হিসেবে পরিচিত ছিলেন জামমেহ।
মেমোরি হাউজ
স্মৃতি জাদুঘরটি রাজধানী বানজালের একটু পরেই ধুলামাখা সেরাকুন্ডা রাস্তার পাশেই অবস্থিত। জামমেহের ২২ বছরের শাসনামলে নির্যাতনের শিকারদের ছবি ও লিখিত বিবৃতি দিয়ে এই শিল্প স্মারকগুলো তৈরি। ভুক্তভুগীরাই এই শিল্প স্মারকগুলো তৈরি করেছে। ২০১৬ সালে জামমেহকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এর ঠিক পাঁচ বছর পর গত অক্টোবরে দর্শনার্থীদের জন্য জাদুঘরটি উন্মুক্ত করা হয়। একটি মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে মাত্র চারটি ছোট আকারের কক্ষ নিয়ে এ জাদুঘরের শুরু। জামমেহের শাসনামলের নিষ্পেষণের ইতিহাস পুনর্লিখন হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এর আগের অপ্রকাশিত নতুন গল্পও প্রথমবারের মতো এতে স্থান পেয়েছে। এই স্মৃতি জাদুঘরের আফ্রিকান নেটওয়ার্ক এগেন্টেস এক্সট্র্রা জুডিশিয়াল কিলিংস অ্যান্ড এসফোরসড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স (এএনইকেইডি) গাম্বিয়ার প্রতিনিধি স্যারা এনড্যাও বলেন, সেসব দর্শনার্থী আমাদের লক্ষ্য ‘যারা জামমেহের শাসনযুগ সম্পর্কে শুনেছে, কিন্তু তারা নিশ্চিত নয় যে, যা শুনেছে তা বিশ^াস করা উচিত কি উচিত না।’
জামমেহের দুঃশাসন
১৯৯৪ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসেন সামরিক কর্মকর্তা ইয়াহিয়া জামমেহ। এর পরের দুই দশকেরও বেশি সময়ের শাসনে গাম্বিয়ার কয়েকশ’ নাগরিক, সাংবাদিক, অভিবাসী, রাজনৈতিক অধিকারকর্মী, এমনকি বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থী এবং সাধারণ নাগরিকদের জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। দেশটির জনগণের অভিমত, এত সংখ্যক মানুষকে হয় হত্যা করা হয়েছে, নয়তো তারা গুম হয়ে গেছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব
প্রেসিডেন্ট হিসেবে জামমেহের পুরো শাসনামলে প্রেস, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। ১৯৯৮ সালে দেশটির বেসরকারি রেডিও সিটিজেন এফএমের অনেক কর্মীকে গ্রেপ্তার করার পর রেডিওটি জোর করে বন্ধ করা হয়। ২০০৪ সালে আইন করে প্রেসের স্বাধীনতা ক্ষুণœ করে জামমেহ সরকার। সে সময় বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে জামমেহ লক্ষ্যবস্তু করেন। ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে দ্য পয়েন্ট সংবাদপত্রের তৎকালীন সম্পাদক দেয়াদা হায়দারা প্রেসের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়াকে চ্যালেঞ্জ জানান। ১৬ ডিসেম্বর অফিস থেকে গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফেরার সময় বানজালে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর দেয়াদা হায়দারার এ হত্যাকা-কে ঘিয়ে কয়েক হাজার মানুষ প্রতিবাদ বিক্ষোভ করে। এ ঘটনায় জামমেহ সরকারকে হত্যাকারী হিসেবে অনেকেই দায়ী করে। এ হত্যাকা-ের কোনো বিচার হয়নি পরবর্তীকালে। এরপর ২০০৬ সালে জামমেহের বিষয়ে একটি গুরুতর প্রতিবেদন বিবিসিতে প্রকাশের অপরাধে দ্য ডেইলি অবজারভারের সাংবাদিক এব্রিমা মাননেহকে সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা গ্রেপ্তার করে। পরে তাকে বন্দি রাখা হয়। নাম প্রকাশ না করে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, ‘তিনি বিশ^াস করেন মাননেহ এখন আর জীবিত নেই ।’
মানবাধিকার লঙ্ঘন
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য মতে, গাম্বিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির আধাসামরিক বাহিনী ‘জংগুলার্স’ প্রায়ই সরাসরি নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়ে থাকে। প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এ বিশেষ বাহিনী দেশের নৃশংস অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে জড়িত। এ বাহিনীর কমপক্ষে ৪০ সদস্য রয়েছে। এ বাহিনীর উল্লেখযোগ্য অপরাধের মধ্যে ২০০৫ সালে পশ্চিম আফ্রিকার ৫০ অভিবাসীকে হত্যার নির্দেশ দেয়। ওই অভিবাসীদের মধ্যে ঘানার ৪৪ জন, নাইজেরিয়ার ১০ জন, সেনেগালের দুজন, আইভরিকোস্টের তিনজন এবং একজন টোগোর নাগরিক ছিল। এ বাহিনীর সন্দেহ ছিল, এই অভিবাসীরা জামমেহকে ক্ষমতাচ্যুত করতে গাম্বিয়ায় এসেছে। তাই তারাই সম্ভবত তাদের হত্যার নির্দেশ দেয়।
শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি
২০০০ সালের ১০ ও ১১ এপ্রিলে ১৪ শিক্ষার্থী ও একজন সাংবাদিককে হত্যার অভিযোগ ওঠে জামমেহ সরকারের বিরুদ্ধে। একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে গাম্বিায়ায় এ দুই দিন শিক্ষার্থীদের ব্যাপক বিক্ষোভ চলে। জামমেহের বিরুদ্ধে সেসময় ওই শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এতে অনেকেই আহত হন। জামমেহ সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। পরবর্তীকালে ওই কমিশন দেশটির পুলিশ ইন্টারভেশন (পিআইইউ) ইউনিটকে এই বড় হত্যাকা-ের জন্য ‘সবচেয়ে বেশি দায়ী’ বলে ঘোষণা দেয়। তবে পরে দোষীদের কোনো শাস্তি দেওয়া হয়নি।
দেশটির একাধিক সংবাদমাধ্যম নিখোঁজ বা গুম হওয়া কয়েক ডজন নাগরিকের তালিকা তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাদের তথ্য মতে, ওই নিখোঁজ ব্যক্তিদের সাধারণ পোশাকের কিছু ব্যক্তি জোরপূর্বক ধরে নিয়ে গেছে। এ ছাড়াও অন্যদের কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে আটকে রাখা হয়েছে। আঞ্চলিক ইকোনমিক কমিউনিটি অব ওয়েস্ট আফ্রিকান স্টেটস আদালত ২০১৬ সালে নিখোঁজ হওয়া এক সাংবাদিক ও এক বিক্ষোভের সময় আটক করা কমপক্ষে ৫০ জনকে মুক্তির নির্দেশ দেয় জামমেহ সরকারকে। একই বছর অন্য এক ঘটনায় আরও দুজনের সঙ্গে দেশটির বিরোধীদলীয় নেতা সলো সাংদেংকে হত্যা করা হয়। এ ছাড়াও এপ্রিলে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে আরেক বিরোধী নেতাসহ আরও ১৮ জনকে তিন বছরের কারাদ- দেওয়া হয়। গাম্বিয়ায় কমপক্ষে ৬ হাজার মানুষ গুমের শিকার হয়েছে। অন্য অনেককে ‘ডাইনি নিধনের’ লক্ষ্যবস্তু এবং জাদুবিদ্যার জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়াও এইচআইভি এইডস রোগীরা জোরপূর্বক ভুয়া ও বিপজ্জনক চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়।
টিআরআরসি
গাম্বিয়া ও তার রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো জামমেহের দুঃশাসনের প্রায় ২৫০ ভুক্তভোগীর একটি তালিকা তৈরি করেছে। গাম্বিয়ার ট্রুথ, রিকনসিলিয়েশন অ্যান্ড রেপারেশনস কমিশন (টিআরআরসি) গত ডিসেম্বরে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যাতে সাংবিধানিক সংস্কার থেকে শুরু করে সব ধরনের সংস্কারের সুপারিশ রেখে জামমেহের বিচারের আহ্বান জানিয়েছে। এ প্রতিবেদনের অসংখ্য সুপারিশের মধ্যে কোনটি সরকার কীভাবে অনুসরণ করবে তার অপেক্ষায় রয়েছে গাম্বিয়াবাসী।
কিন্তু বর্তমানে অনেক গাম্বিয়াবাসীই পুনর্মিলনের এই প্রচেষ্টা, ক্ষতিপূরণ প্রদান ও চূড়ান্ত বিচারের বিষয়ে বারবার সাক্ষ্য ও উপস্থিতি দিতে গিয়ে ক্লান্ত। তাদের মধ্যে কেউ কেউ জামমেহের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে খারিজ করেছেন। তবে কুখ্যাত জাদুকরী হিসেবে ডাইনি নিধনের শিকার কিছু নারী এখনো তাদের সম্প্রদায়ে সামাজিক কলঙ্কের সম্মুখীন।
টিআরআরসি এ পর্যন্ত ১৮৭ দিন ধরে ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্যগ্রহণ করেছে। তারপরও জামমেহ দুঃশাসনের সব ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য নিতে সক্ষম হয়নি তারা। টিআরআরসির তৈরি করা প্রতিবেদনকে মানবাধিকার সংস্থাগুলো একটি যুগান্তককারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। তারপরও প্রতিবেদনটির প্রকাশ বিলম্ব হচ্ছে। কারণ জামমেহের দীর্ঘ শাসনের ফলে সৃষ্ট একশ্রেণির অনুসারীর উদ্বেগের কারণে বিষয়টি গুরুত্ব হারাচ্ছে বলে অভিযোগ গাম্বিয়ার মানবাধিকারকর্মীদের।
গৌরবে ফেরা
প্রায় আড়াই দশকের দুঃশাসনের মধ্য দিয়ে জালিয়াতি করা ও চাপিয়ে দেওয়া নির্বাচনের মাধ্যমে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতা ধরে রাখেন জামমেহ। কিন্তু ২০১৬ সালের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো একজোট হলে আদামা ব্যারো আকস্মিক এক জয় পেয়ে ক্ষমতায় বসেন। ২০১৭ সালে জামমেহ প্রতিবেশী দেশ গিনিতে পালিয়ে যান। সেখানে তিনি এখন নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। গত চার বছরে বেশ বদলেছে গাম্বিয়া। জামমেহ শাসনের সব ধরনের নৃশংসতা প্রথমবারের মতো জনসম্মুখে আনার জন্য ট্রুথ কমিশন গঠন জরুরি হয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে নতুন সরকার ট্রুথ কমিশন গঠন করে। এই কমিশনের শুনানির মাধ্যমে জামমেহের আমলের অনেক কুকীর্তি বেরিয়ে আসে। এ ঘটনাগুলোই সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যাশা মেমোরি হাউজ কর্তৃপক্ষের।
