বাজারের সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। বেড়েছে সংসার খরচও। অথচ আয় বাড়েনি এক পয়সাও। উল্টো দাম বাড়ার চক্রে ছোট ছোট উদ্যোগ বন্ধ হয়ে বেকার হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। খাবার কমিয়ে আয়-ব্যয় সমন্বয়ের চেষ্টা করছেন অনেকে। অনেকে আবার আক্ষরিক অর্থেই দু-এক বেলা না খেয়েই কাটিয়ে দিচ্ছেন। বাজারে সব পণ্যের দাম বাড়ায় গত কয়েক দিন ধরেই শিল্প নগরী খুলনার নিম্ন আয়ের মানুষ পড়েছেন চরম বিপাকে। কথা বলতে গেলেই তারা প্রকাশ করছেন ক্ষোভ আর হতাশা।
নগরীর নতুন বাজারের বাজার এলাকায় কথা হয় ক্রেতা শাহেদ শুভর সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রতিটি জিনিসের দামই বেড়েছে। মাসখানেক আগেও যে টাকায় এক সপ্তাহের বাজার হয়ে যেত তা কিনতে এখন দ্বিগুণ টাকা লাগছে। অথচ আমাদের আয় তো এক পয়সাও বাড়েনি। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের মতো মানুষের সামনে কোনো পথ খোলা থাকবে না। ভাতের জন্য ডাকাতি করতে হবে।
বয়রা বাজার এলাকার রাজমিস্ত্রি মনিরুল ইসলাম বলেন, ঠিকাদার প্রতিদিন ৬০০ টাকা দেন। আগে দুপুরের ৫০ টাকা খেলে পেট ভরে যেত। এখন ১০০ টাকায় আধাপেটা খাওয়া হয়। এরপর সারা দিন টুকটাক খরচ তো আছেই। দিন শেষে খরচ বাদে থাকে ৪০০ টাকা। ওই টাকা দিয়ে স্বামী-স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে আধাপেটা খেয়ে থাকতে হয়।
তিনি বলেন, করোনার সময় এনজিও থেকে কিছু লোন নিয়েছিলাম তাও শোধ দিতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে বড় ছেলেটাকে রাজমিস্ত্রির সহযোগী হিসেবে কাজে লাগাতে হয়েছে।
নগরীর সাত রাস্তার মোড়ে কাজের আশায় বসেছিলেন কয়রা থেকে আসা নির্মাণ শ্রমিক মো. ইসলাম। প্রতিবেদককে দেখে খুব আগ্রহ নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে কী কাজ করতে হবে তা জানতে চাইলেন। তবে কাজ করতে হবে না বলতেই চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে তিনি বলেন, প্রতিদিন ৩০০ টাকা করে কাজ করি। নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়ায় কাজ বন্ধ করে দিয়েছে মালিক। সারা দিন বসে আছি কেউ কাজে নিল না। সকাল থেকে দুটো বনরুটি খেয়েছি। এরপর ধরা গলায় দুই হাঁটুর মধ্যে মাথাগুঁজে বলেন, আমি তাও দুটো রুটি খেয়েছি কিন্তু বউ-বাচ্চারা না খেয়ে থাকবে।
নিত্যপণ্যের বাজারের এই লাগামহীন অবস্থার কারণে করুণ অবস্থা হোটেল-রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ও। নগরীর কয়েক হোটেল মালিক বলেন, তারা এখন হোটেলে গরু ও খাসির মাংস বিক্রি প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন। দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকে এখন আর এই মাংস খেতে চাচ্ছে না। ভোক্তারা খাবার অনেক কমিয়ে দিয়েছেন। ফলে তাদেরও আয় কমেছে। কমাতে হয়েছে লোকবলও। অনেক হোটেল বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
শুধু নগর এলাকায়ই নয়, গ্রামেও একই অবস্থা। ডুমুরিয়া উপজেলার এক চা দোকানি মফিজুল ইসলাম বলেন, আগে সকাল ১০টার মধ্যে ৪০০-৫০০ টাকা বেচাকেনা হতো। এখন ১০০-১৫০ টাকা বিক্রি হয়। জিনিসের দাম বাড়ায় ক্রেতা কমে গেছে। প্রতিদিনের কেনাবেচা করে বাজার করার টাকাও আয় হচ্ছে না।
তিনি জানান, স্থানীয় কোম্পানির ৪৫০ গ্রাম বিস্কুটের প্যাকেট ছিল ৫০ টাকা অথচ এখন ৩০০ গ্রাম বিস্কুটের প্যাকেট নিচ্ছে ৫৫-৬০ টাকা। ৩ টাকা বনরুটি এখন ৫ টাকা।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনা বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক বলেন, বাংলাদেশে সব জায়গায় এখন সিন্ডিকেট। সরকার ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। এই মুহূর্তে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে সরকারিভাবে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। সেই সঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ে রেশন চালু করা প্রয়োজন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান স্কুলের ডিন ও অর্থনীতি ডিসিপ্লিনের প্রফেসর ড. মো. নাসিফ আহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, যখন দ্রব্যমূল্যের গতি ঊর্ধ্ব হয় তখন সব চেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর। মধ্যবিত্তরা তাদের আয়ের ৩০/৪০ শতাংশ ব্যয় করে আর নিম্নআয়ের মানুষের আয়ের ৮০ শতাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের জন্য ব্যয় করে। অনেক সময় সঞ্চয় থেকে ভেঙে খরচ চালাতে হয়। কিশোর/কিশোরীদের একটি পকেট মানির ব্যাপার আছে। তারা এই খরচ জোগাতে অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠতে পারে। এ সমস্যা সমাধানে আমাদের কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়াতে হবে।
