কুষ্টিয়ায় ওয়ারিশ সেজে ২১ কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি দখল

আপডেট : ২৮ মে ২০২২, ০২:১৯ এএম

কুষ্টিয়ায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর বাসভবন ও পানি পরীক্ষাগার দখল করে টিনের ঘেরাও দিয়েছে প্রভাবশালী ভূমি দখলবাজ চক্র। প্রয়াত এক নিঃসন্তান নারীর ওয়ারিশ সেজে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে শহরের জিরো পয়েন্ট লাগোয়া রেনউইক মোড়ের ওই সরকারি অবকাঠামো দখল করে পাহারাও বসিয়েছে দখলবাজরা। দখল করা ৮৭ শতাংশ জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি টাকা। এ ছাড়া ২ কোটি টাকা ব্যয়ে সদ্যনির্মিত পানি পরীক্ষাগারসহ ওই জমিতে রয়েছে আরও কমপক্ষে ৩ কোটি টাকার সরকারি অবকাঠামো। আইনের ফাঁক গলিয়ে ভূমি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে সরকারি এই স্থাপনার দখল নিয়েছে দখলবাজ চক্র। যে চক্রের সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি ও আইনজীবী জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের কুষ্টিয়া কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী ইব্রাহিম মো. তৈমুর জানান, দুই ব্যক্তিকে এক নিঃসন্তান হিন্দু নারীর ওয়ারিশ সাজিয়ে মামলার পর আদালত থেকে রায় নিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর বাসভবন এবং সদ্যনির্মিত পানি পরীক্ষাগার অবরুদ্ধ করেছে জমি দখলবাজ চক্র।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৬২ সালে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার মজমপুর মৌজার রেনউইক মোড়ে এসএ দাগ নম্বর ৬৫৩ থেকে ৬৬০ পর্যন্ত এসএ রেকর্ডীয় ৮টি দাগের প্রায় সাড়ে ৩ একর জমি সরকার অধিগ্রহণ করে। অধিগ্রহণ করা ওই জমিতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর বাসভবন এবং প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে সদ্যনির্মিত পানি পরীক্ষাগার রয়েছে। কিন্তু গত এপ্রিলে হঠাৎই সরকারি ওই অবকাঠামো প্রকাশ্যে দখলে নিয়ে টিনের বেড়া দিয়ে ঘেরাও দেয় প্রভাবশালী জমি দখলবাজ চক্র। ৫০ বছর আগে মারা যাওয়া এক নিঃসন্তান হিন্দু নারীর ওয়ারিশ সেজে আদালত থেকে রায় নিয়ে এই জমির দখল নেওয়া হয়েছে। ওই নারীর কথিত ওয়ারিশান সুকুমার দাস ও অপূর্ব কুমার দাসকে সামনে রেখে স্থানীয় দখলবাজরা সরকারি সম্পত্তি অবরুদ্ধ করেছে।

যদিও ওই জমি সরকারি কাজে ব্যবহারের জন্য ১৯৬২ সালে অধিগ্রহণ করা বলে আদালতকে ইতিমধ্যে নিশ্চিত করেছে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের এলএ শাখা। কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সিরাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, উল্লিখিত তফসিলভুক্ত জমির চৌহদ্দির মধ্যে ব্যক্তিমালিকানাধীন কোনো ভূ-সম্পত্তি বা অবকাঠামো থাকার প্রশ্নই ওঠে না।

কুষ্টিয়ার দেওয়ানি আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (জিপি) আ স ম আখতারুজ্জামান মাসুম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রকাশ্য দিবালোকে জালিয়াত চক্র সন্ত্রাসী কায়দায় সরকারি অবকাঠামো ভেঙেচুরে টিনের বেড়া দিয়ে চারদিকে বাউন্ডারি করে অবরুদ্ধ করেছে। তাদের এই জালিয়াতির বিষয়টি আদালতের নজরে এনে রায় বাতিলের আবেদন করেছি। বিজ্ঞ আদালত আবেদন আমলে নিয়ে ওই জালিয়াত চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সরকারি সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মামলার বাদীর বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না তার কারণ দর্শাও নোটিস দিয়েছেন।’

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, বেদখল হওয়া সরকারি ওই জমির মালিক দাবি করা হয়েছে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার ৫ নম্বর মাছপাড়া ইউনিয়নের বরুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা সুধীর কুমার দাসের স্ত্রী নিঃসন্তান সুপ্রতিবালা দাসকে। এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য সনৎ কুমারের সহায়তায় সুপ্রতিবালা দাসের দেবর সুপ্রভাত দাসের ছেলে সুকুমার দাস ও অপূর্ব কুমার দাস ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ওই জমির বৈধ ওয়ারিশ দাবি করে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার দেওয়ানি আদালতে মামলা করেন। তবে মামলার এজাহারে ৫০ বছর আগে থেকে ওই জমিতে সরকারি ভবন থাকার কথা উল্লেখ করা হয়নি। সম্পত্তিটি ‘খ’ তফসিলভুক্ত (অর্পিত সম্পত্তি) হিসেবে দাবি করে সেখানে নিজেদের বাড়িঘর ও দখলস্বত্ব বহাল আছে বলে উল্লেখ করা হয়।

প্রকাশ্যে সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর, অবরুদ্ধ ও দখলের ঘটনার একজন প্রত্যক্ষদর্শী সংশ্লিষ্ট এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর নাঈমুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাত সাড়ে ৮টার দিকে কিছু লোকজন এসে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর বাসভবনের দেয়াল ভাঙচুর করে টিনের বেড়া দেয়। তাৎক্ষণাৎ আমি আমার লোকজন নিয়ে সেটা প্রতিরোধ করি। পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বিষয়টি অবহিত করি।’

সরকারি জমি দখলের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সুকুমার দাস ও অপূর্ব কুমার দাসের মোবাইল ফোনে কল করা হলে তারা কথা বলতে রাজি হননি। পরে তাদের পাংশার বরুরিয়া গ্রামে গিয়ে প্রতিবেশীদের কাছে খোঁজখবর নেওয়ার সময় এই প্রতিবেদকের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। এরপর অন্য এক ব্যক্তির মোবাইল ফোন থেকে এই প্রতিবেদকের মোবাইল ফোনে কল করেন অপূর্ব কুমার দাস। তিনি বলেন, জমি দখলে তারা জড়িত নন। এ বিষয়ে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর গ্রামের প্রয়াত রহিম প্রামাণিকের ছেলে মুন্নার সঙ্গে কথা বলতে বলেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জমি দখলে নেওয়ার সময় উপস্থিত লোকজনের নেতৃত্ব দেন কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ১ নম্বর হাটশ হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রাজু আহমেদ। তবে ইউপি সদস্য রাজু এবং মুন্নার দাবি, প্রকৃতপক্ষে ওই জমি দখলকাজের নেতৃত্ব দিচ্ছেন কুষ্টিয়া জেলা জাসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান।

ইউপি সদস্য রাজু আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মুন্না আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু। ওর সঙ্গে সেদিন (জমি দখলের দিন) ওখানে গিয়ে জানতে পারলাম জমি দখলের বিয়য়টি।’

আর মুন্না বলেন, ‘ওই জমির মালিক নিজেই লোকজন নিয়ে দেয়াল ভাঙচুর করে টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে রেখেছে। জমির মালিক আমাকে আত্মীয় (যদিও জমির মালিক দাবিদাররা ভিন্ন ধর্মের অনুসারী) হিসেবে ডেকেছিল। সে জন্য আমি সেখানে গিয়েছিলাম।’

সরকারি জমি দখলে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কুষ্টিয়া জেলা জাসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান বলেন, ‘ঘটনার দিন আমি ঢাকায় ছিলাম। হঠাৎ হরিপুরের রহিম প্রামাণিকের ছেলে আমাকে ফোন করে জানায়, একটা জমিসংক্রান্ত বিষয়ে নাঈমুল কমিশনার ঝামেলা করছে, আমার কাছে সাহায্য চায়। আমি নাঈমুল কমিশনারকে বলেছিলাম, আমি কুষ্টিয়াতে আসি তারপর নিজেরা বসে সব ঠিক করে দিব। এ ছাড়া মুন্না যে ওখানে সরকারি জমি দখল করতে গেছে, সে বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত