সাগরতল দিয়ে বিদ্যুতে আলোকিত সন্দ্বীপ

আপডেট : ২৮ মে ২০২২, ০২:৪২ এএম

পাঁচ বছর আগে সন্দ্বীপ পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডে স্বল্পপরিসরে, অল্প কয়েকজন কর্মী নিয়ে কাঠের আসবাবপত্রের কারখানা শুরু করেন মো. আলাউদ্দিন (৪৫)। কাঠ শুকানো থেকে শুরু করে আসবাব তৈরি সবই করতেন সনাতন পদ্ধতিতে। তবে বছর তিনেক আগে দ্বীপটিতে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ আসায় সবকিছু বদলে গেছে আলাউদ্দিনের। কাজের ধরনের পাশাপাশি বদলেছে তার ভাগ্যও। তার কারখানাটি এখন পুরো উপজেলারই মডেল হয়ে উঠেছে। পরিসর বাড়ায় কারখানায় এখন ৪৫ কর্মী।

২০১৮ সালের শেষের দিকে সাবমেরিন কেব্লের মাধ্যমে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে সীতাকুন্ড থেকে ১৫ কিলোমিটার পার হয়ে ৩৩ হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ যায় সন্দ্বীপে। এরপরই আসবাবপত্র তৈরির আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের ব্যবসা বড় করেছেন আলাউদ্দিন। তার মতো আরও অসংখ্য উদ্যোক্তা সন্দ্বীপের হাটবাজারগুলোতে লোহা, স্টিল, অ্যালুমিনিয়ামের দরজা-জানালা, যানবাহনের যন্ত্রাংশ তৈরির ওয়ার্কশপ, বেকারি, প্রিন্টিং প্রেস, স’মিলস, বরফকলসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি কলকারখানা গড়ে তুলেছেন। আগে যে কাজ করতে চট্টগ্রাম যেতে হতো তা এখন হচ্ছে দ্বীপেই। বিদ্যুতের ছোঁয়ায় জীবনযাত্রার মান বেড়েছে স্থানীয়দের। নানা ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় এসেছে আমূল বদল। উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে চলছে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগের কাজও। চালু হয়েছে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন। গতি পেয়েছে ব্যাংক, বীমা, অফিস-আদালতের কার্যক্রম ও সেবার মান।

আসবাবপত্রের ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন বলেন, ‘জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে কারখানায় আসবাবপত্র তৈরির আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারছি। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ছাড়া জেনারেটর দিয়ে এটা অসম্ভব। এছাড়াও আগের তুলনায় খরচও অনেক কমেছে।’

আল-আমিন অফসেট প্রিন্টিং প্রেসের স্বত্বাধিকারী জহির উদ্দিন বলেন, ‘বিদ্যুৎ আসার পর আমরা অত্যাধুনিক দুটি ব্যানার মেশিন কিনেছি। যেগুলোর সাহায্যে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ১০ ফিট প্রস্থ পর্যন্ত ব্যানার তৈরি করা যায়। ব্যানার তৈরির জন্য একটা সময় চট্টগ্রাম শহরে যেতে হতো।’

বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার পর সরকারি হাসপাতালগুলোতে তেমন পরিবর্তন না এলেও গড়ে উঠেছে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের সমন্বয়ে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক। পুরনা বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে বেড়েছে সেবা ও চিকিৎসার মান।

বিদ্যুৎ সুবিধা কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে প্রাণিসম্পদ, মৎস্য ও কৃষি ক্ষেত্রে। পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডে মুরগি পালনের জন্য একটি স্বয়ংক্রিয় খামার গড়ে তুলেছেন তরুণ উদ্যোক্তা ফেরদৌস আহমদ কৌশিক। তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকলে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব হতো না। বিদ্যুৎ আসার আগে ভুসি দিয়ে মুরগির বাচ্চাকে তাপ দিতাম। এখন হিটার জ্বালিয়ে তাপ দিচ্ছি, গ্যাস দূর করার জন্য স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ব্যবহার করছি। আমাদের খরচও অনেক কমেছে।’

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজম বলেন, ‘আগে ফ্রিজের অভাবে অতিপ্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন সংরক্ষণ করা যেত না। এখন এ সমস্যা দূর হয়েছে।’

সুফল পাচ্ছেন জেলেরাও। আগে ডিজেলচালিত মেশিন দিয়ে ২০০ গ্রাম সাইজের বরফচাক তৈরি করা যেত। এখন এক মণ ওজনের বরফ তৈরি করা যাচ্ছে। পর্যাপ্ত বরফ সরবরাহ করার কারণে জেলেরা মাছের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন। বিদ্যুৎ আছে বলেই নতুন জেগে ওঠা চরগুলো চাষের আওতায় আনার পরিকল্পনা চলছে। পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও। মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ১৫০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১০০টি বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ আছে। ২৯টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১১টি মাদ্রাসা ও ৬টি কলেজের অধিকাংশই বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়েছে। ফলে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব, ওয়াশ ব্লক ও ডিজিটাল হাজিরা মেশিনের কার্যক্রম সহজ হয়েছে। হচ্ছে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসও।

বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগ সন্দ্বীপের আবাসিক প্রকৌশলী ইব্রাহিম খলিল জানান, দুটি সাবস্টেশনের মাধ্যমে দুটি সাবমেরিন কেব্লের একটির সাহায্যে বিদ্যুৎ আসছে। একটি কেব্ল দিয়েই ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব। আরেকটি ব্যাকআপ হিসেবে রাখা আছে। বর্তমানে সন্দ্বীপে গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ২১ হাজার। প্রকল্প-১-এর আওতায় প্রায় ৪০০ কিলোমিটার বিভিন্ন ক্যাটাগরির লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্প-২-এর আওতায় ৩০০ কিলোমিটার লাইন নির্মাণকাজ চলমান আছে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতা বলেন, ‘বহু কাক্সিক্ষত জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ পেয়েছে সন্দ্বীপবাসী। এতে করে মানুষের জীবনযাত্রার মান বেড়েছে। বিদ্যুতের কারণে অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। ছোট ছোট শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। বড় বড় শিল্পকারখানা গড়ে উঠতে আরও সময় লাগবে। আমাদের অবকাঠামো, যাতায়াত ব্যবস্থা আরও উন্নত করতে হবে। এগুলোর উন্নয়ন হলে শিল্পকারখানাও গড়ে উঠবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত