ডলার ও মূল্যস্ফীতি ব্যাংক খাতের বড় চ্যালেঞ্জ : গভর্নর

আপডেট : ২৮ মে ২০২২, ১১:৩৩ পিএম

বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে মূল্যস্ফীতি ও ডলারের দাম বেড়ে যাওয়াকে দেশের ব্যাংক খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। এ দুই কারণে বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, মহামারী করোনার পর বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ব্যাংক খাত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ডলার সহায়তা দেওয়া হলেও সংকট মোকাবিলায় সরকারি- বেসরকারি সব ব্যাংককে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।  

গতকাল রাজধানীর অফিসার্স ক্লাবে আল-আরাফা ইসলামী ব্যাংকের বৃত্তি প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। আল আরাফা ব্যাংকের চেয়ারম্যান সেলিম রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরমান আর চৌধুরী।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রায় সব ধরনের পণ্যমূল্যের অস্বাভাবিক হারে দাম বাড়ায় বিশে^র অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, গত এপ্রিলে দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ, যা আগের মাস মার্চে ছিল ৬ দশমিক ২২ শতাংশ। গত ১৭ মাসের মধ্যে এখন মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। পণ্যমূল্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে আমদানি ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে শুরু করেছে।

চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে দেশে আমদানি ব্যয় হয়েছে ৬ হাজার ১৫২ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪৪ শতাংশ। এ সময়ে রপ্তানিতে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হলেও আমদানির তুলনায় রপ্তানি কম থাকায় প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে। একই সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহও কমেছে। এতে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স দিয়ে আমদানি ব্যয় সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকর পর্যাপ্ত ডলার সরবরাহ করতে না পারায় ডলারের দামও বাড়ছে। চলতি মাসেই ডলারের বিপরীতে টাকার মান তিন বার কমিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তারপরও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত দরের চেয়ে অনেক বেশি দরে ডলার কেনাবেচা হচ্ছে।  

মূল্যস্ফীতি ও ডলারের এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে গতকাল ফজলে কবির বলেন, আমদানির ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিধিনিষেধ দিয়েছি, যা মেনে চললে আমরা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারব। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে বিলাসী পণ্য আমদানি থেকে বিরত থাকবেন। এলসি খোলার ক্ষেত্রে আমরা কিছু মার্জিন দিয়েছি এগুলো আপনারা পরিপালন করবেন। আমরা সংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে সরাসরি ডলার সরবরাহ করছি। এটা অব্যাহত থাকবে। এছাড়া শিশুখাদ্য, সার, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, কৃষিসহ প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির সুযোগ করে দিয়েছি। যেসব পণ্য অতি প্রয়োজনীয় নয় সেগুলো আমরা নিরুৎসাহিত করছি। করোনার সময় আমরা যেভাবে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছি এখনো সেভাবেই মোকাবিলা করতে সক্ষম হব বলে আশা করছি। এখানে সরকারি-বেসরকারি সব ব্যাংককে সম্মিলিতভাবে সংকট মোকাবিলায় কাজ করতে হবে।

করোনায় ১৮৯ জন্য ব্যাংকারের মৃত্যু হয়েছে জানিয়ে ফজলে কবির বলেন, ২০২০ সালে আমাদের মহামারীর চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হয়েছিল। সে সময় ব্যাংকের কার্যক্রম সচল রাখতে হয়েছে। ব্যাংকগুলো সম্মুখ সারিতে ছিল। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়ে কিছু ক্ষতিও হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। 

কিছু ব্যাংক শিক্ষাবৃত্তি চালু করেছে জানিয়ে গভর্নর বলেন, করোনাকালে সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) আওতায় বরাদ্দকৃত টাকা স্বাস্থ্য খাতে বেশি ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে, তবে শিক্ষা খাতেও বাংকগুলো এগিয়ে এসেছে। আল-আরাফা ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যাংকটি এককালীন ৮ হাজার টাকা দিচ্ছে। এটাকে ১০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেন ফজলে কবির।

গভর্নর বলেন, দারিদ্র্য ও নানাবিধ প্রতিকূলতায় আমাদের অনেক মেধাবী অকালেই ঝরে যায়। আর্থিক প্রতিবন্ধকতার কারণে মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা যাতে অঙ্কুরেই ঝরে না পড়ে  সেজন্য আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের শিক্ষাবৃত্তি নিঃসন্দেহে একটি যথার্থ ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ।  

ব্যাংকের চেয়ারম্যান আলহাজ সেলিম রহমান বলেন, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক নিয়মিতভাবে বিভিন্ন সেবামূলক কর্মকান্ড পালন করে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় শিক্ষাবৃত্তি প্রদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়। ব্যাংকের পক্ষ থেকে তিনি ভবিষ্যতেও এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার আশ্বাস প্রদান করেন। ফরমান আর চৌধুরী বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, এ বৃত্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে এবং দেশ ও জাতির উন্নতিতে নিজেদের নিয়োজিত করবে।

আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক সামাজিক দায়বদ্ধতার আওতায় প্রতি বছর নতুন ২০০ মেধাবী শিক্ষার্থীকে স্নাতক পর্যায়ে চার বছরের জন্য এ বৃত্তি প্রদান করে। আর নতুন ও পুরনো মিলে প্রতি বছর ব্যাংকের বৃত্তি প্রদান কার্যক্রমের আওতায় মোট ৮০০ শিক্ষার্থীকে প্রায় ৪ কোটি টাকার বৃত্তি প্রদান করা হবে। বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা প্রত্যেকে মাসিক সাড়ে ৩ হাজার এবং এককালীন ৮ হাজার টাকা করে বৃত্তি পাবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত