ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহকদের তথ্য সংগ্রহ করে কৌশলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা সরিয়ে নিচ্ছে একাধিক চক্র। সম্প্রতি তিনটি বেসরকারি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভুক্তভোগী গ্রাহকরা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করে প্রতিকার না পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শরণাপন্ন হন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে প্রতারক চক্রের সঙ্গে ব্যাংকেরই অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশের তথ্য মিলেছে। একটি বেসরকারি ব্যাংকের একজন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
তদন্তের দায়িত্বে থাকা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংকেরই অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে গ্রাহকের সব তথ্য চলে যাচ্ছে প্রতারক চক্রের হাতে। সেই তথ্য নিয়ে চক্রগুলো প্রথমে গ্রাহকদের বিশ্বস্ততা অর্জন করছে। পরে টাকা হাতিয়ে নিতে নানা ফন্দি আঁটছে।
সম্প্রতি এসব ঘটনায় অভিযুক্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম। তাদের মধ্যে একটি বেসরকারি ব্যাংকের কার্ড ডিভিশনের এক কর্মকর্তাও রয়েছেন।
তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য, চক্রের সদস্যদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের সিমকার্ড, এনআইডি, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের রেজিস্ট্রেশন সবই ভুয়া থাকে। ফলে মূল অপরাধীদের খুঁজে পেতে বেগ পেতে হচ্ছে। এখন পর্যন্ত চক্রের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলেও হোতারা পলাতক।
এ ধরনের প্রতারণা থেকে রক্ষা পেতে কিছু সুপারিশ করেছে ডিবি। এর মধ্যে রয়েছেÑ গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট এবং কার্ডসংক্রান্ত গোপনীয় তথ্য যাতে ফাঁস না হয় সে বিষয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কোনোভাবেই ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) অন্যকে জানানো যাবে না। অনলাইন লেনদেনের ক্ষেত্রে নিরাপদ গেটওয়ে ব্যবহার করা। অপরিচিত ওয়েবসাইটে ক্রেডিট কার্ডের তথ্য না দেওয়া। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা ও যাচাই-বাছাই করা।
ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্রেডিট কার্ড থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া চক্রের বিরুদ্ধে আমাদের তদন্ত চলমান আছে। ইতিমধ্যে ব্যাংক কর্মকর্তাসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।’ তিনি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে।’
ভুক্তভোগীদের একজন মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা রিপন হোসেন। তার ক্রেডিট কার্ড থেকে ২৯ হাজার ৯০০ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্রটি। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ৭ এপ্রিল সকালে তার ক্রেডিট কার্ডটি যে ব্যাংকের তার কল সেন্টার থেকে এক ব্যক্তি ফোন করে তার কার্ডের তথ্য আপডেট করার কথা বলেন। এজন্য কিছু তথ্য চান। তিনি তখন ব্যস্ত আছেন জানিয়ে পরে ফোন দিতে বলেন। রাতে তিনি ফোন, মানিব্যাগ ও ক্রেডিট কার্ড বাসায় রেখে বাইরে যান। রাত ৯টা ৪ মিনিটের দিকে ফের ফোন করলে তার স্ত্রী ফোন ধরেন। ফোনের অন্য প্রান্ত থেকে ওই ব্যাংকের কল সেন্টারের কর্মী পরিচয়ে কার্ডের তথ্য চান। দ্রুত কিছু তথ্য না দিলে কার্ড অকার্যকর হয়ে যাবে বলে ভয় দেখান। তখন কার্ডের উল্টো পাশে থাকা একটি নম্বর বলতে বলেন। তার স্ত্রী সেটা বলার পর দ্রুত ৬ ডিজিটের একটি ওটিপি নম্বর পাঠিয়ে সেটি জানতে চান ওই কর্মী। তার স্ত্রী ওটিপি নম্বর বলার পরই তার ক্রেডিট কার্ড থেকে ৫ হাজার টাকা তোলার বার্তা পান। ফোন লাইনে থাকা অবস্থায় আরেকটি ওটিপি পাঠিয়ে জানতে চায়, এভাবে তিনবারে ২৯ হাজার ৯০০ টাকা নিয়েছে চক্রটি। তিনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করেন, কিন্তু কোনো প্রতিকার পাননি। পরে তিনি পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন।
একই ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড গ্রাহক ইমরান শরীফও এমন প্রতারণার শিকার হয়েছেন। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, “দেড় মাস আগে আমার ক্রেডিট কার্ডে অনলাইন ই-কমার্স ট্রানজেকশনটা চালু করার জন্য সংশ্লিষ্ট দুটি বিভাগে আমার বিস্তারিত তথ্য দিয়ে মেইল করেছিলাম। আমি সকালে মেইল করার পর বিকেলে ব্যাংক কর্মকর্তা পরিচয়ে একজন আমাকে ফোন করে বলেন, ‘স্যার আপনি ই-কমার্স ট্রানজেকশন চালুর জন্য একটি অনুরোধ করেছেন। এটা চালু করতে আপনার কিছু তথ্য লাগবে’। কার্ডের পেছনে থাকা তিনটি কোড তিনি জানতে চান। আমি কোড বলার পরই ক্রেডিট কার্ড থেকে ১০ হাজার টাকা তোলার বার্তা পাই।’
ইমরান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এ ঘটনার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ করেছিলাম। তারা বলেছিল সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেবে। তবে পরবর্তী সময়ে আমার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ করেনি। আমি সব তথ্য দিয়ে ব্যাংকে মেইল করেছি। ফলে যখন ফোন করে সেই তথ্যগুলোই আমাকে বলেছে তখন আমি কীভাবে অবিশ্বাস করব যে সে ব্যাংকের লোক নয়।’
এমন প্রতারণার শিকার আসমা আক্তার, আবু বক্কর ছিদ্দিক, হাসিনুর রহমান, মোস্তাক আহম্মেদসহ অন্তত ১০ জনের সঙ্গে কথা হয়েছে এ প্রতিবেদকের। তারা একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। গত ২৭ এপ্রিল রাজধানীর কদমতলী থানায় এবং ১৮ মে ডেমরা থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে পৃথক দুটি মামলা করেন ভুক্তভোগীরা। এ মামলায় অভিযান চালিয়ে এখন পর্যন্ত চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। তারা হলেন কাবুল হাসান রশিদ ও হাসান খান। তাদের মধ্যে কাবুল হাসান রশিদ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কার্ড ডিভিশনের অপারশেন ইউনিটের অ্যাসিস্ট্যান্ট রিলেশনশিপ অফিসার (এআরও)।
ডিবির তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, রশিদ ব্যাংকের গ্রাহকদের ক্রেডিট কার্ডের নাম ও নম্বর, মোবাইল নম্বর, ঠিকানা, তারিখ নিয়ে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কার্ড হ্যাকার হাসানের কাছে দিত। এরপরই ধাপে ধাপে ক্রেডিট কার্ডের টাকা হাতিয়ে নিত চক্রটি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, বিষয়টি তাদের জানা ছিল না। ব্যাংকের যে গ্রেপ্তার হয়েছে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের আর কেউ জড়িত থাকলে ডিবি নিশ্চয়ই তাদের খুঁজে বের করবে। তিনি বলেন, তারা গ্রাহকদের সবসময় সতর্ক করেন যাতে ওটিপি বা পিন নম্বর কাউকে না দেন। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে ব্যাংক থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট কার্ড গ্রাহক তামান্না আফরোজও একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়ে গত ২৫ জানুয়ারি রাজধানীর হাজারীবাগ থানায় মামলা করেন। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গত ৯ মে রাজধানীর মগবাজার এলাকা থেকে রায়হান হোসেন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি।
ক্রেডিট কার্ডের তথ্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ফাঁস হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে ফোনে ও খুদেবার্তা (এসএমএস) পাঠিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলেও তিনি সাড়া দেননি।
