চালকের ঘুমে প্রাণ গেল ১০ যাত্রীর

আপডেট : ৩০ মে ২০২২, ০১:৪২ এএম

ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের উজিরপুরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে একটি বাসের ১০ যাত্রী নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে আছে নারী ও শিশু। এ ঘটনায় আরও ২০ জনের মতো আহত হয়েছে। তাদের মধ্যে চিকিৎসাধীন কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। গতকাল রবিবার ভোর ৫টার দিকে উজিরপুর উপজেলার বামরাইলে যমুনা লাইন পরিবহনের বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারালে এ ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের ধারণা, চালক ঘুমিয়ে পড়েছিলেন বলেই এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে। আর বাসের আহত যাত্রীদের ভাষ্য, নির্ধারিত সময়ের প্রায় ২ ঘণ্টা পরে ছাড়া বাসটি শুরু থেকেই বেপরোয়াভাবে চালাচ্ছিলেন চালক। 

এদিকে একই দিন নাটোরের বড়াইগ্রাম ও টাঙ্গাইলের সখীপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন আরও দুই জন।

দেশ রূপান্তরের সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে বিস্তারিত-

বাসযাত্রী ও উজিরপুর থানা পুলিশের বরাতে বরিশাল প্রতিনিধি জানান, বাসটি ঢাকা থেকে ভান্ডারিয়ার দিকে যাচ্ছিল। গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে বাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ঘটনাস্থল থেকে ৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আহত ১৮ জনকে উদ্ধার করে পাঠানো হয় বরিশাল শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে নেওয়ার পর মারা যায় আরও একজন।            

উজিরপুর থানার ওসি আলী আর্শাদ জানান, নিহতদের মধ্যে ৮ জনের পরিচয় জানা গেছে। তারা হলেন ঝালকাঠি সদরের মনির হোসেন হাওলাদারের ছেলে আরাফাত হাওলাদার (৭), পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার কুদ্দুস আকনের ছেলে নজরুল ইসলাম আকন (৩৫), একই এলাকার রাকিব আকনের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম (২০), বরগুনা জেলার বেতাগী উপজেলার মোবারক আলী বেপারীর ছেলে হালিম মিয়া (৩১), ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা থানার সুতারকান্দা এলাকার মৃত আওলাদ আলীর ছেলে সেন্টু মোল্লা (৫০), বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার মৃত আবুল কাশেম হাওলাদারের ছেলে রমজান হাওলাদার (৩৮), উজিরপুর উপজেলার মনোরঞ্জন শীলের ছেলে মাধব শীল (৪৫) এবং বরগুনার ফুলঝুরি ইউনিয়নের তাজেম আলীর ছেলে রেজা চোকদার (২৩)।

এ বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশের ওসি শেখ বেলাল হোসেন জানান, দুর্ঘটনাকবলিত বাস থেকে ৮ জন, পাশের ডোবা থেকে ১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং শেবাচিম হাসপাতালে আহত ১ জনের মৃত্যু হয়। বরিশাল ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট লিডার মো. জাহাঙ্গীর বলেন, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের গৌরনদী ও উজিরপুরের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বাসটি কেটে যাত্রীদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।

বরিশাল শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় হাসপাতালে ১৮ জন ভর্তি হয়েছে। তাদের চিকিৎসা চলছে।

এদিকে বরিশালের পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন জানান, হতাহতের ঘটনায় উজিরপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটি গঠন : আহতদের দেখতে বরিশাল শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান বিভাগীয় কমিশনার মো. আমিন উল আহসান ও জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার। সে সময় দুর্ঘটনায় নিহতের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার আমিন উল আহসান। এ-সময় আহতদের চিকিৎসার সার্বিক সহায়তা করারও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

বরিশালের জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার জানান, দুর্ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিসের ধারণা ঘুমিয়ে ছিলেন বাসচালক : বরিশাল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল স্টেশনের সহকারী পরিচালক বেলাল উদ্দিন বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি বাসের চালক ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। এরপরই বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। এতে পুরো বাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। বাসটিতে ৪০-৪২ জন যাত্রী ছিলেন।

তবে গৌরনদী হাইওয়ে থানার ওসি শেখ বেল্লাল হোসেন বলেন, আমরা ধারণা করছি, বেপরোয়া গতিতে চালানোর কারণে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। তবুও তদন্ত সাপেক্ষে এর সঠিক কারণ জানা যাবে। তবে চালক বেঁচে আছেন না মারা গেছেন, সেটি নিশ্চিত নই। বাসটি জব্দ করা হয়েছে।

বোনের জানাজায় যেতে গিয়ে নিজেই লাশ : বোনের জানাজার নামাজ সকাল ১০টায়। তাই রাতেই বাসে ওঠেন রমজান হাওলাদার। সকালে বাড়ি পৌঁছে বোনের জানাজা শেষে শেষ বিদায় জানাবেন। কিন্তু ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় লাশ হলেন নিজেই। গতকাল বরিশালের উজিরপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১০ জনের মধ্যে ছিলেন রমজানও। গতকাল বিকেলে বোনের সঙ্গে তাকে শেষ বিদায় জানান পরিবারের সদস্যরা।

রমজান বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার দুধল ইউনিয়নের সুন্দরকাঠি গ্রামের বাসিন্দা। ঢাকার সাভারের জিরাবোতে একটি গার্মেন্টসে নিরাপত্তাকর্মীর কাজ করতেন তিনি।

রমজানের ভাই নাসির হাওলাদার জানান, বার্ধক্যের কারণে ৭০ বছর বয়সে শনিবার তাদের বোনের মৃত্যু হয়। রবিবার সকাল ১০টায় নিজ বাড়িতে তার জানাজার আয়োজন করা হয়। এ কারণেই বাড়ি ফিরছিলেন রমজান। কিন্তু বেপরোয়া বাস আমার ভাইকেও কেড়ে নিল।

আঁখি জানেন না ছেলের মৃত্যুর খবর : আঁখি বেগম (৩০) বাস দুর্ঘটনায় আহত হয়ে শুয়ে আছেন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বেডে। সঙ্গে তার সাড়ে ৩ বছরের মেয়ে মরিয়ম। সেও আহত হয়েছে এই দুর্ঘটনায়।

কিন্তু আঁখি জানেন না তার ৭ বছর বয়সী ছেলে আরাফাত আর এই পৃথিবীতে নেই। মরিয়মও জানে না তার ভাই বিদায় নিয়েছে চিরতরে। স্বজনরাও তাদের জানতে দেননি সে খবর। তারাও কান্না চেপে আঁখি আর মরিয়মকে বাঁচাতে ছুটোছুটি করছেন হাসপাতালময়।

আঁখি ঢাকার সাভারে একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। অনেক দিন পর মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে বাড়ি যাচ্ছিলেন। তিনি প্রবাসী মনির হাওলাদারের স্ত্রী। তার বাড়ি ঝালকাঠির দাড়াখালি গ্রামে।

আহত আঁখি জানান, ঢাকার গাবতলী থেকে যমুনা পরিবহন নামের বাসটিতে ওঠেন তিনি ও তার দুই সন্তান। বাসটি নবীনগর আসার পর যাত্রী নেয়। কিন্তু ওই সময় বাসে সমস্যা দেখা দেয়। পরে ধাক্কা দিয়ে বাস চালু করতে হয়। পরে বাসটি অনেক জোরে চালাতে থাকেন ড্রাইভার।

অনিক হারিয়েছে তার বাবাকে : এদিকে হাসপাতালের বেডে অচেতন হয়ে পড়ে আছে অনিক (১৬)। সে তার বাবা মাধব শীলের সঙ্গে ফরিদপুরের কদমবাড়ী এলাকায় পাগলের মেলা থেকে ফিরছিল। সঙ্গে তার এলাকার আরও কয়েকজন ছিল। কিন্তু অনিক বেঁচে থাকলেও তার বাবা মাধব শীল আর বেঁচে নেই। অনিকও জানে না তার বাবার মৃত্যুর খবর।

এদিকে টাঙ্গাইলের সখীপুরে বাসচাপায় আ. করিম (৫৫) নামের এক পথচারীর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রবিবার সখীপুর-সাগরদিঘী সড়কের কচুয়া পেট্রল পাম্প এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। আ. করিম উপজেলার কচুয়া গ্রামের মৃত একিন আলীর ছেলে।

গতকাল নাটোরের বড়াইগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ট্রাকচালক আরিফুল ইসলাম গাজী (৩২) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। নিহত আরিফুল ইসলাম গাজী উপজেলার রয়না মহল্লার মৃত মতিউর রহমান (আসলাম) গাজীর ছেলে। ১০ দিন আগে ময়মনসিংহে দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ট্রাকচালক আরিফুল ইসলাম গুরুতর আহত হন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত