ব্রহ্মপুত্রের বুকে পাকা ঘাট, রাস্তা নির্মাণ!

আপডেট : ৩০ মে ২০২২, ০১:৫৯ এএম

ময়মনসিংহ শহরের কাচারী ঘাট এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের বিশাল জায়গা জুড়ে পাকা ঘাট ও রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু করেছে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতিমা বিসর্জনের সুবিধার জন্য এ অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা। তবে নাগরিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতারা এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণের তীব্র বিরোধিতা করে প্রকল্পটি দ্রুত বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করতে যখন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ব্রহ্মপুত্র নদ খনন হচ্ছে তখন এভাবে পাকা স্থাপনা নির্মাণ নদটির জন্য যেমন মারাত্মক ক্ষতিকর, তেমনি দেশের প্রচলিত আইনেরও লঙ্ঘন।

এদিকে নদটি দেখভালের দায়িত্বে থাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, নদের ভেতরের জায়গায় সড়ক বা অন্য কোনো স্থাপনা নির্মাণের আইনত কোনো সুযোগ নেই। আর স্থাপনা নির্মাণের কাজ শুরুর আগে তাদের কোনো মতামতও নেওয়া হয়নি।

ব্রহ্মপুত্রের বুকে পাকা ঘাট ও রাস্তা নির্মাণ বন্ধের দাবিতে এবং নদ রক্ষায় নাগরিক সংগঠন ব্রহ্মপুত্র সুরক্ষা আন্দোলনের ব্যানারে গত বুধবার মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এর আগে গত ২৩ মে জনউদ্যোগ নামে আরেকটি নাগরিক সংগঠন একই দাবিতে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জনউদ্যোগের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম চুন্নু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০১৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি এক রিটের রায়ে দেশের সব নদ-নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। এভাবে নদের ভেতরে পাকা স্থাপনা নির্মাণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ কাজ এখনই বন্ধ করতে হবে এবং নির্মাণসামগ্রী সরিয়ে নিতে হবে। এটি না করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ব্রহ্মপুত্রের বুকে পাকা স্থাপনা নির্মাণের কাজ দ্রুত বন্ধের দাবি জানিয়ে ব্রহ্মপুত্র সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক আবুল কালাম আল আজাদ বলেন, ‘যে স্থানটিতে নির্মাণকাজ চলছে সেখান থেকে আগে নৌকা চলত। এখন সেখানে বালু দিয়ে ভরাট করে নির্মাণকাজ চলছে। ধর্মকে ব্যবহার করে নদ দখল হচ্ছে, স্থাপনা হচ্ছে। যেখান দিয়ে পানি প্রবাহ হতো তা ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ হচ্ছে। সিটি কর্র্তৃপক্ষের কাছে এ প্রকল্পটি দ্রুত বাতিল করার দাবি জানাচ্ছি।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর কাচারী ঘাট এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের শহররক্ষা বাঁধ থেকে আনুমানিক একশ-দেড়শ গজ নদীর ভেতরে ১৬ ফুট প্রশস্ত ও ১০ ফুট গভীর করে সড়ক নির্মাণ হচ্ছে। কংক্রিটের ঢালাই দিয়ে এই পাকা সড়ক নির্মাণ হবে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতিমা বিসর্জনের সুবিধার জন্য ১ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ওই জায়গা (পাকা ঘাট ও রাস্তা নির্মাণস্থল) দিয়েই প্রতিমা বিসর্জন হয়। কাদা মাটিতে সমস্যা হওয়ার কারণে সেখানে পাকা সøাব ও রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পাকা ঘাট করা হচ্ছে। দুটি রাস্তা নির্মাণ করা হবে, যেটি দিয়ে মানুষ স্থায়ীভাবে চলাচল করতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কাজ শুরুর আগে পাউবোকে জানানো হয়নি, কিন্তু কাজ শুরুর পর তারা দেখে গেলেও আপত্তি তোলেনি।’

তবে সিটি করপোরেশনের এই প্রকল্পের বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন ময়মনসিংহ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আখলাকুল জামিল। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নদীর ভেতরের জায়গায় এ ধরনের সড়ক বা স্থাপনা নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো মতামতও নেওয়া হয়নি। কীভাবে সেখানে নির্মাণকাজ হচ্ছে তা আমি বুঝতে পারছি না। এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড সিটি করপোরেশনের কাছে ব্যাখ্যা চাইবে।’

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষও (বিআইডব্লিউটিএ) নদের বুকে অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে অবগত নন। এ প্রসঙ্গে সংস্থাটির নির্বাহী প্রকৌশলী দিদার এ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নদটির খননকাজ চলমান। প্রশস্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে সেখানে অবকাঠামো নির্মাণের যে কাজ শুরু তা আমাদের জানানো হয়নি। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

নদের বুকে স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল হক বলেন, ‘এ ব্যাপারে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে সদরের ভূমি কর্মকর্তাকে (এসিল্যান্ড) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত