কেন ন্যাটোতে যোগ দিতে চাইছে ফিনল্যান্ড ও সুইডেন

আপডেট : ৩০ মে ২০২২, ১০:৫৪ পিএম

প্রতিবেশী দেশগুলো বিভিন্ন সময়ে ন্যাটোর সদস্য হলেও নিজেদের জোটটির সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে জড়ায়নি ফিনল্যান্ড ও সুইডেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে চলতি মাসে ন্যাটোর সদস্যপদের জন্য আবেদন করে দেশ দুটি। তাদের এই পদক্ষেপে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে মস্কো। ইউক্রেন যুদ্ধ দুর্বল করার পরিবর্তে ন্যাটোকে শক্তিশালীই করছে। লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া

ন্যাটোতে আবেদন

রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধ ইউরোপসহ পুরো বিশ্বের ভূরাজনীতি পরিবর্তন করেছে। যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট খাদ্য-জ্বালানিসহ অর্থনৈতিক সংকটে হিমশিম খাচ্ছে বিভিন্ন দেশ। বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলোর অবস্থা সঙ্গিন হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে যুদ্ধ চলাকালীনই আরও এক উদ্বেগজনক খবর পেল বিশ্ব। প্রায় তিন মাস ধরে তর্ক-বিতর্কের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশনের (ন্যাটো) সদস্য হতে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে ইউরোপের দেশ ফিনল্যান্ড ও সুইডেন। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্প্রসারণের জবাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শুরু হওয়া স্নায়ুযুদ্ধের সময় গঠন করা হয়েছিল ন্যাটো। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে ফিনল্যান্ড ও সুইডেন সামরিক জোটটির সদস্য হলে ইউরোপের নিরাপত্তা মানচিত্রে পরিবর্তন আসতে বাধ্য।

ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের ন্যাটোর সদস্যপদের আবেদন মঞ্জুর হলে পশ্চিম রাশিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় জোটটির তৎপরতা আরও বাড়বে। ফিনল্যান্ডের সঙ্গে এক হাজার তিনশো কিলোমিটারের সীমান্ত রয়েছে রাশিয়ার। পশ্চিম রাশিয়ার এক হাজার দুইশো কিলোমিটার সীমান্ত জুড়ে অবস্থান করছে নরওয়ে, লাটভিয়া, এস্তোনিয়া, পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়া। এসব দেশে ন্যাটো তার সামরিক কর্মকাণ্ড জারি রেখেছে। বাল্টিক সাগর দিয়ে উত্তর সাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরে প্রবেশ করে রাশিয়া। এই বাল্টিক সাগর ঘিরে রয়েছে জার্মানি, ডেনমার্ক, পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া, এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, ফিনল্যান্ড ও সুইডেন। ফিনল্যান্ড ও সুইডেন ছাড়া বাল্টিক সাগরের চারদিকে থাকা ওই দেশগুলো ন্যাটোর সদস্য। ফিনল্যান্ড ও সুইডেনও ন্যাটোর সদস্য হলে স্বভাবতই তা রাশিয়াকে আরও চাপে ফেলবে। তা ছাড়া বাল্টিক সাগরের মাঝামাঝিতে অবস্থিত সুইডেনের গটল্যান্ড দ্বীপ ওই অঞ্চলে ন্যাটোকে কৌশলগত সুবিধা এনে দেবে। ইউক্রেনে হামলার পেছনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যেসব যুক্তি দিয়েছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল, প্রতিবেশী দেশ ইউক্রেনের ন্যাটোর সদস্য হতে চাওয়া। ইউক্রেন সরকারের এই উদ্যোগের ফল ভুগতে হচ্ছে দেশটির সাধারণ জনগণকে। ফিনল্যান্ড ও সুইডেন কেন এখন ন্যাটোর অংশ হতে চাইছে, সদস্য হলে তাদের কী কী প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে, জোটটিতে তাদের যোগদান রাশিয়া সীমান্তে ভূরাজনীতিতে কেমন প্রভাব ফেলবে, এসব প্রশ্ন নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বিশ্ব রাজনীতি।

নিরপেক্ষতার ইতিহাস

ন্যাটোর সদস্য হতে চেয়ে ফিনল্যান্ড ও সুইডেন নিরাপত্তা বিষয়ে তাদের দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষতার লেবাস থেকে বেরিয়ে এসেছে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধের সময় এই দুই পরাশক্তির দ্বন্দ্ব থেকে দূরে থাকার নীতি নিয়েছিল ফিনল্যান্ড ও সুইডেন। শুধু তা-ই নয়, উভয় পরাশক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও বজায় রেখেছিল তারা। স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের সামরিক জোট (ট্রিটি অব ফ্রেন্ডশিপ, কো-অপারেশন অ্যান্ড মিউচুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্স) থেকে নিজেকে দূরে রাখে ফিনল্যান্ড। একই সঙ্গে দ্বিতীয় যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইউরোপকে পুনরুদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কর্মসূচি মার্শাল প্ল্যানেও নিজেকে যুক্ত করেনি দেশটি। দুই পরাশক্তির সংঘর্ষ থেকে দূরে থেকে দেশে গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদী শাসনকাঠামো প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করে ফিনল্যান্ড। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরও নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছিল ফিনল্যান্ড। ন্যাটোর সদস্য না হওয়ার সিদ্ধান্তে অটুট থাকে দেশটি এমনকি ১৯৯৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশ করলেও সামরিক জোটটি থেকে দূরে থাকে ফিনল্যান্ড।

অন্যদিকে ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে নিরপেক্ষতার পথে হাঁটা শুরু করে সুইডেন, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও দেখা যায়। অবশ্য যুদ্ধের সময় জার্মানির শাসক হিটলারকে সহায়তা করতে দেখা গিয়েছিল সুইডেনকে। সে সময় তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে আন্তর্জাতিক মহলে। সুইডেনের নিরপেক্ষতা প্রায়ই তার কল্যাণ রাষ্ট্রকাঠামোর বৈশিষ্ট্য ও জাতীয় পরিচয়ের স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে সুইডেনের নিরপেক্ষতা বা পক্ষপাতহীন অবস্থানের আনুষ্ঠানিক নীতিতে স্ববিরোধিতা পরিলক্ষিত হয়।

সুইডেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওলফ পালমের ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান ক্ষুব্ধ করেছিল যুক্তরাষ্ট্রকে। আবার একই সময়ে ওলফের শাসনামলেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে সুইডেন। নিরপেক্ষ থেকে নিজেকে শান্তিবাদী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করে দেশটি। সাধারণত অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণের পরামর্শ দিয়ে থাকে এসব শান্তিবাদী রাষ্ট্র। অন্য দেশকে নিরস্ত্র হওয়ার পরামর্শ দিলেও নিজের অস্ত্র শিল্প কখনো বন্ধ করেনি সুইডেন। নব্বই দশকে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে পুরোপুরি সরে যায় দেশটি। সে সময় বসনিয়া, আফগানিস্তান ও লিবিয়ায় অভিযান শুরু করে ন্যাটো। সামরিক জোটটির সদস্য না হয়েও ন্যাটোর ওই অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিল সুইডেন। ফিনল্যান্ডের মতো সুইডেনও ১৯৯৫ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেয়। আর ২০১০ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সর্বজনীন নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষানীতির অংশ হয় সুইডেন।

কেন ন্যাটোতে

ন্যাটোর সদস্য হওয়া নিয়ে প্রায় তিন দশক ধরে তর্ক-বিতর্ক চলছে সুইডেন ও ফিনল্যান্ডে। ২০১৪ সালে রাশিয়া ইউক্রেনের উপদ্বীপ ক্রিমিয়া দখল করলে সুইডেন ও ফিনল্যান্ড ন্যাটোর ‘খোলা দরজা’ নীতির (উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে নিরাপত্তায় অবদান রাখতে ইচ্ছুক ইউরোপের যেকোনো দেশকে ন্যাটোর স্বাগত জানানো) দিকে ঝুঁকতে থাকে। ন্যাটোতে যুক্ত হওয়া নিয়ে দুদেশে পক্ষে-বিপক্ষে মত রয়েছে। বিশেষ করে সুইডেনের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা চান না, তাদের দেশ ন্যাটোর সদস্য হোক। দীর্ঘদিন ধরে তারা এ নিয়ে কথা বলে আসছে। কেন এখন সুইডেন ন্যাটোর সদস্য হতে চাইছে, এ প্রশ্নের জবাবে দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী কার্ল বিল্ডট বলেন, ‘রাশিয়ার ইউক্রেনে হামলার দিন অর্থাৎ ২৪ ফেব্রুয়ারি সবকিছু পাল্টে গেছে। আগের অবস্থানে থাকা সম্ভব হচ্ছে না।’ ন্যাটোর সদস্য হওয়ার বিষয়ে ফিনল্যান্ডে জনমত আগের চেয়ে বেড়েছে। অন্যদিকে সুইডেনে চলতি বছরের শেষের দিকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সেখানে মতামত জরিপে দেখা গেছে, দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ন্যাটোর সদস্য হতে চায়। তাই দীর্ঘদিন বিরোধিতা করে এলেও জনগণের চাপে ন্যাটোর সদস্যপদের জন্য আবেদন করতে বাধ্য হয়েছেন দেশটির ক্ষমতাসীন সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা।  

ন্যাটোর সম্প্রসারণ ও নিরাপত্তা বিষয়ে ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান তদারকি অনেককে এমন একসময়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, যখন মহাদেশটিতে যুদ্ধ ছিল রোজকারের হুমকি। ওই সময় ইউরোপের পরিস্থিতি স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের চেয়েও ভয়াবহ ছিল। স্নায়ুযুদ্ধের সময় সরাসরি যুদ্ধ বিশেষ করে পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি কমাতে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন অন্তত নিয়মিত আলোচনায় বসত। কিন্তু ন্যাটো আরও সম্প্রসারিত হলে সব সময় যুদ্ধাতঙ্কের মধ্যে থাকতে হবে ইউরোপবাসীকে। বিশেষ করে ইউক্রেনে রাশিয়ার সর্বাত্মক হামলা তাদের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। অবশ্য ন্যাটোর সম্প্রসারণ ইউরোপীয়দের মাথাব্যথার কারণ, এমন বক্তব্য খারিজ করে দিয়েছেন সুইডেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কার্ল বিল্ডট। তিনি বলেন,‘ ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন শক্তিশালী হলে রাশিয়া সংযত হবে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যত দিন ক্ষমতায় আছেন, তিনি যে ইউক্রেনের পর ইউরোপের অন্য দেশে হামলা করবেন না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।’ 

রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া

রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন ইউক্রেন আক্রমণ করেছিলেন পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর সম্প্রসারণ কর্মকাণ্ড ঠেকাতে কিন্তু বাস্তবে হয়েছে তার উল্টো। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো ইউরোপের পূর্বাঞ্চলে তার কর্মকাণ্ড না গুটিয়ে বরং আরও বিস্তৃত করছে। সদস্যপদ মঞ্জুর হলে সুইডেন ও ফিনল্যান্ড হবে ন্যাটোর ৩১ ও ৩২তম সদস্য। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর চলতি বছরের মার্চে ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের ন্যাটোর সদস্যপদের জন্য আবেদনের সম্ভাবনা ক্ষিপ্ত করেছিল রাশিয়াকে। পুতিন সে সময় হুঁশিয়ার করে বলেছিল, দেশ দুটি ন্যাটোতে আবেদন করলে বাল্টিক সাগরের কাছে পারমাণবিক ও হাইপারসনিক অস্ত্র স্থাপন করে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে মে মাসে যখন ফিনল্যান্ড ও সুইডেন ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার আকাক্সক্ষা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করল, তখন পুতিনের বক্তব্য মার্চ মাসের মতো অতটা হুমকিমূলক ছিল না। তিনি বলেন, ‘ফিনল্যান্ড ও সুইডেন নিয়ে রাশিয়ার কোনো সমস্যা নেই এবং ন্যাটোর সম্প্রসারণকে আমরা সরাসরি হুমকি মনে করছি না। তবে নর্ডিক অঞ্চলে (উত্তর ইউরোপ ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চল) সামরিক অবকাঠামোর বিস্তার হলে আমরা চুপ করে বসে থাকব না।’

রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে ফিনল্যান্ডের বিষয়ে বলেছে, ‘ন্যাটোতে ফিনল্যান্ডের যোগদান রুশ-ফিনিশ সম্পর্ককে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। একই সঙ্গে এর মধ্য দিয়ে ইউরোপের উত্তরাঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়বে। জাতীয় নিরাপত্তা বিবেচনায় নিতে বাধ্য রাশিয়া। এ কারণে সীমান্ত অঞ্চলে উদীয়মান হুমকি মোকাবিলা করতে মিলিটারি-টেকনিক্যালসহ অন্যান্য প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকবে না রাশিয়া। ফিনল্যান্ডকে অবশ্যই এ ধরনের পদক্ষেপের দায়িত্ব ও পরিণতি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।’ রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, ‘ন্যাটোতে যুক্ত হতে চেয়ে রাশিয়ার সঙ্গে অতীতে সম্পাদিত চুক্তি লঙ্ঘন করেছে ফিনল্যান্ড। ন্যাটোতে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে নিজের দেশের নিরাপত্তা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা খুইয়ে ফিনল্যান্ড কেন নিজেকে রাশিয়ার মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে, তার বিচার এক দিন ইতিহাসই করবে।’

এদিকে ন্যাটোর সদস্যপদের জন্য আবেদনের বিষয়ে সুইডেন জানিয়েছে, তারা তাদের সীমানায় সামরিক জোটটিকে ঘাঁটি বা পারমাণবিক অস্ত্র স্থাপনের অনুমতি দেবে না। অন্যদিকে ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সানা মারিন বলেছেন, ন্যাটোর সদস্যপদের জন্য আবেদন করা হয়েছে, তবে দেশের ভেতরে জোটটি পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন বা সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করতে চাইলে তা বিরোধিতা করা হবে।

তুরস্কের আপত্তি

ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের ন্যাটোর সদস্য হওয়া নিয়ে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তুরস্ক। আঙ্কারা চায় না ইউরোপের দেশ দুটি ন্যাটোর সদস্য হোক। ১৯৫২ সাল থেকে ন্যাটোতে রয়েছে তুরস্ক। জোটের সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পর সবচেয়ে বড় সামরিক বাহিনী রয়েছে তুরস্কের। দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান জানান, ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের ন্যাটোর সদস্য হওয়া সমর্থন করেন না তিনি। ন্যাটো নেতাদের মধ্যে একমাত্র এরদোয়ানই প্রকাশ্যে ওই দুই নর্ডিক রাষ্ট্রের সামরিক জোটটিতে যোগদানের বিরোধিতা করেছেন। ফিনল্যান্ড ও সুইডেনকে ন্যাটোর সদস্য হতে হলে তুরস্কের অনুমোদন দরকার। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান মনে করেন, ফিনল্যান্ড ও সুইডেন ‘সন্ত্রাসীদের’ সমর্থন দেয়। এ কারণে তিনি দেশ দুটির বিষয়ে অনমনীয় অবস্থানে রয়েছেন। এরদোয়ানের সেই ‘সন্ত্রাসীরা’ হচ্ছেন কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি বা পিকেকের সদস্য। দীর্ঘদিন ধরে তুরস্ক, ইরাক, ইরান ও সিরিয়ায় বসবাসরত কুর্দিদের নিয়ে আলাদা কুর্দিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে পিকেকে। আর এ কারণে তুরস্ক সরকারের দমনমূলক আচরণের শিকার দেশটির লাখ লাখ কুর্দি নাগরিক। ফিনল্যান্ড ও সুইডেন পিকেকের নেতাদের নিরাপত্তা ও আশ্রয় দেয় বলে দেশ দুটিকে ন্যাটোতে দেখতে চাইছেন না এরদোয়ান। তিনি বলেন, ‘পিকেকে নিয়ে ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের সুস্পষ্ট ও খোলাসা কোনো বক্তব্য নেই। আমরা কীভাবে তাদের ওপর আস্থা রাখব?’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টিকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে অভিহিত করলেও মানবাধিকার বিবেচনায় নিয়ে সংগঠনটির সদস্যদের প্রত্যর্পণে বরাবরই অনীহা দেখিয়ে আসছে ফিনল্যান্ড ও সুইডেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান সুইডেনকে ‘সন্ত্রাসবাদের আঁতুড়ঘর’ বলতেও ছাড়েননি।

এরদোয়ানের ক্ষোভের আরেক কারণ তুরস্কের ভিন্নমতাবলম্বী পণ্ডিত ও ইসলামি নেতা ফেতহুল্লাহ গুলেনের অনুসারীদের আশ্রয় দিয়ে আসছে ফিনল্যান্ড ও সুইডেন। গুলেন ও তার অনুসারীরা তুরস্কের শিক্ষা ও রাজনৈতিক আন্দোলনের অংশ, যার সঙ্গে একসময় এরদোয়ান নিজেও যুক্ত ছিলেন। পরে ওই আন্দোলন অনেক শক্তিশালী হলে সেখান থেকে সরে যান এরদোয়ান। তুরস্কের প্রেসিডেন্টের অভিযোগ, ২০১৬ সালে গুলেনের অনুসারীরা তার সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছিল। গত কয়েক দশকে কুর্দিদের পাশাপাশি গুলেনের অনুসারীরাও সুইডেনে আশ্রয় পায়। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ৩৩ নাগরিক প্রত্যর্পণে সাফ মানা করে সুইডেন ও ফিনল্যান্ড সরকার। এ ছাড়া ২০১৯ সালে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে এরদোয়ানের সামরিক হস্তক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে সুইডেন, ফিনল্যান্ডসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত কয়েকটি দেশ তুরস্কের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, যা আরও ক্ষুব্ধ করে তুরস্কের প্রেসিডেন্টকে।

রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেছে তুরস্ক। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিকসহ অন্যান্য কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিলেও তুরস্ক কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে অস্বীকৃতি জানালেও ইউক্রেনে কিন্তু ড্রোন সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে তুরস্ক। এভাবেই যুদ্ধে লিপ্ত দুদেশের সঙ্গে সম্পর্কে এক ধরনের ভারসাম্য রাখছেন এরদোয়ান। তুরস্কের রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল মুভমেন্ট পার্টির নেতা দেভলেত বাহচেলি উদ্বেগ জানিয়ে বলেছেন, ‘দেরিতে হলেও ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের ন্যাটোর দরজায় কড়া নাড়া রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনকে রাগান্বিত করবে এটাই স্বাভাবিক। ফলে ইউক্রেনে হামলা আরও বাড়িয়ে দিতে পারেন তিনি। ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহতা কমাতে ও ইউরোপে যুদ্ধ ঠেকাতে ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের ন্যাটোর সদস্যপদের আবেদন মঞ্জুর না করে তাদের অপেক্ষা করিয়ে রাখা উচিত বলে মনে করি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত