মুমিন-মুসলমানের জীবনে হজ ও ওমরাহ পালন মানে অনেক বড় স্বপ্নপূরণ। এ স্বপ্নপূরণের জন্য কেউ বছরের পর বছর অপেক্ষা করেন। যারা সীমিত আয়ের মানুষ, তারা একটু একটু করে সঞ্চয় করেন। তবে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতির এই সময়ে শুধু নিজের ইচ্ছাপূরণের জন্য অনেকেই হেঁটে, সাইকেল কিংবা মোটরসাইকেল চালিয়ে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে হজ-ওমরাহ পালন করছেন।
সাত হাজার কিলোমিটার বাইক চালিয়ে ওমরাহ: ব্লগার আবরার হাসান। প্রায় ৮০টি দেশ ভ্রমণ করেছেন। এর মধ্যে ১২-১৩টি দেশ তিনি বাইক চালিয়ে গেছেন। তার স্বপ্ন ছিল, বাইক চালিয়ে সৌদি আরব গিয়ে ওমরাহ পালনের। অবশেষে ৫০ দিনে প্রায় সাত হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মদিনা হয়ে মক্কায় পৌঁছে ওমরাহ পালন করেন পাকিস্তানের ভ্রমণপ্রেমী এ তরুণ। দীর্ঘ যাত্রাপথে এ সময় তিনি পাঁচটি দেশ অতিক্রম করেছেন।
চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের নানকানা সাহিব এলাকা থেকে হাসানের ওমরাহ ভ্রমণ শুরু হয়। এরপর ২৭ মার্চ মদিনায় পৌঁছান। সেখান থেকে মক্কা গিয়ে ওমরাহ পালন করেন তিনি। জার্মানিভিত্তিক অটোমোটিভ কোম্পানির মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হাসান এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘আমার সারা জীবনের স্বপ্ন ছিল মোটরবাইকে করে সৌদি আরব যাব। অবশেষে এই বছর সেই স্বপ্নপূরণ হয়। অনেক অনুভূতি আছে, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আমার কাছে এই ভ্রমণের সবকিছুই অস্বাভাবিক ছিল। তাই ভ্রমণকালের প্রতি মুহূর্তকে আমি ভালোবাসি।’ ভ্রমণে বের হয়ে বিপুল পরিমাণ ভালোবাসা ও সমর্থন পেয়ে অভিভূত হওয়ার কথাও জানান তিনি।
তিনি জানান, এই ভ্রমণে স্মরণীয় মুহূর্তটি ছিল যখন আমি রমজান শুরুর কয়েক দিন আগে মদিনা নগরীতে পৌঁছাই এবং রমজানের প্রথম রোজা রাখি। সৌদি আরবে স্থানীয়দের উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়ে আপ্লুত তিনি। ওমরাহর ভ্রমণে মক্কা-মদিনা ছাড়াও সৌদি আরবের রিয়াদ, জেদ্দা, আবহা, আল বাহা, জাজান, আল উলাসহ বেশ কয়েকটি নগরী ভ্রমণ করেন হাসান।
৫৯ দিন সাইকেল চালিয়ে হজ পালন : ৫৯ দিনে ১৭ দেশ পেরিয়ে আট ব্রিটিশ য্বুক ২০১৯ সালে পবিত্র হজ পালন করেছেন। হজ পালনের এ সফরকে তারা ‘ট্যুর দ্য হজ’ নাম দিয়েছিলেন। লন্ডন থেকে যাত্রা শুরুর পর ৬০ দিনে সৌদি আরব পৌঁছানোর পরিকল্পনা থাকলেও ৫৯ দিনেই তারা পৌঁছে যান কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে। এ যাত্রায় তাদের ৪ হাজার মাইল অতিক্রম করতে হয়েছে। ১৫টি দেশ সাইকেল চালিয়ে পার হলেও যুদ্ধাবস্থার জন্য সিরিয়া ও ইরাক বিমানে পাড়ি দিয়ে মিসরে পৌঁছান তারা। সেখান থেকে আবার সাইকেলযোগে সৌদি আরবের উদ্দেশে রওনা দেন।
সৌদি আরব পৌঁছে প্রথমে মদিনায় নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রওজা জিয়ারত শেষে তারা হজ পালনের জন্য মক্কা গমন করেন। আট সদস্যের এই দলের সাতজন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ও একজন শ্রীলঙ্কান বংশোদ্ভূত। বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের বিবিধ সমস্যা নিয়ে যাত্রাপথে তারা বিভিন্ন স্থানে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা তৈরির কাজ করছেন। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও উগান্ডার দরিদ্র মুসলমানদের সাহায্য, মসজিদ ও শিক্ষাঙ্গন নির্মাণ এবং গভীর নলকূপ খননের জন্য বিভিন্ন রকমের তহবিলও সংগ্রহ করছেন।
আটজনের একজন হাসান আখতার বলেন, যাত্রাপথে বহুবিধ চ্যালেঞ্জ আমরা মোকাবিলা করেছি। একেক সময় একেক রকম ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪ হাজার ৮১০ মিটার উঁচু। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ আমরা সেটিও আরোহণ করে পাড়ি দিয়েছি। স্বভাবতই কষ্টের সঙ্গে আনন্দ-সুখের মিশেল থাকে।
৬৪ বছর বয়সে স্বপ্নপূরণ : চেষ্টা ও অদম্য ইচ্ছার অপর নাম সফলতা। এ জন্য বয়স কোনো বাঁধা নয়। পরিশ্রম করলে স্বপ্ন একদিন বাস্তবে রূপ নেবেই। স্বপ্ন-বোনা মানুষ সবসময় নতুন স্বপ্নের ছক আঁকেন। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে মিসরের এক ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ মোটরসাইকেলে ওমরাহ পালন এবং নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রওজা জিয়ারত করেছেন।
২০২১ সালের নভেম্বর মাসে মিসর থেকে বাইক চালিয়ে ওমরাহ পালন করে চমকে দেন ৬৪ বছর বয়সী হাজি ইসমাইল আবদুল লতিফ। এই মিসরীয় মোটরসাইকেলে ওমরাহ পালনের জন্য ৩ হাজার কিলোমিটার পথ ভ্রমণ করেছেন। অনেকেই তার এই যাত্রাকে দুঃসাহসী যাত্রা বলে অভিহিত করেছেন।
হাজি ইসমাইল এর আগে হজ পালন করেছিলেন। তারপরও তার ইচ্ছা ছিল মোটরসাইকেল চালিয়ে ওমরাহ পালনের। ইচ্ছাপূরণের জন্য তিনি কায়রো থেকে সফর শুরু করে প্রথমে মক্কা পৌঁছান। মক্কায় ওমরাহর আনুষ্ঠানিকতা শেষে মদিনা মোনাওয়ারা আসেন। তিনি সৌদি আরবে মোট ছয়দিন ছিলেন।
বাইকে স্ত্রীকে নিয়ে ওমরাহ পালন : ২০২১ সালের নভেম্বরে মিসরের তানতা এলাকা থেকে মোটরসাইকেল চালিয়ে ওমরাহ পালন করতে আসেন এক দম্পতি। এ জন্য তারা ৪৮ ঘণ্টায় ১২ শ’ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন। মোটরসাইকেলের পেছনে আরেকজনকে নিয়ে এতটি পথ চলা অবশ্যই কঠিন। তারপরও ওই দম্পতি কাজটি করেছেন। পবিত্র কাবা জিয়ারত ও তাওয়াফসহ ওমরাহর আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ভুলেছেন ভ্রমণক্লান্তি।
স্থানীয় গণমাধ্যমকে ওমর আবু দাউদ জানান, শৈশব থেকেই মোটরসাইকেল ভালোবাসতাম। ইউটিউবে বাইকারদের দেখে মনে হতো বাইকে চড়ে দূরে কোথাও যাই। পরে ভাবলাম, মক্কার চেয়ে ভালো গন্তব্য আর কী হতে পারে? তাই ভালো দেখে একটি বাইক কিনে স্ত্রীকে নিয়েই চলে এলাম বায়তুল্লাহ শরিফে। তবে তারা টানা সফর করেননি। সৌদি আরব ও মিসরের মধ্যকার সমুদ্রপথ তারা জাহাজে পাড়ি দিয়েছেন।
তিউনিসিয়া থেকে ৫৩ দিনে মক্কায় এক নারী : মানুষের দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও একনিষ্ঠ সাধনার কাছে প্রচলিত রীতি, প্রথা এবং আইন অনেক সময় টেকে না। এটি নতুন কোনো বিষয় নয়। না হলে যে মক্কায় ৪৫ বছরের কম বয়সী কোনো নারীর মাহরাম ছাড়া প্রবেশ নিষেধ, সেখানে একাকী যাওয়া এক নারীকে নিয়ে সবার আগ্রহ কেন? নিষেধের বেড়াজাল নয়, উল্টো অভিনন্দনের জোয়ারে ভাসছেন তিনি। কারণ এই নারী সাধারণ কোনো নারী নন। তিনি ৫৩ দিনে প্রায় ৫ হাজার কিলোমিটার পথ সাইকেল চালিয়ে মক্কা এসেছেন একা। উদ্দেশ্য ওমরাহ পালন।
সারা হাবা। আফ্রিকার উত্তরতম দেশ তিউনিসিয়ার নারী সাইক্লিস্ট। ওমরাহ পালনের জন্য তিউনিসিয়া থেকে মক্কায় পৌঁছাতে তার সময় লেগেছে ৫৩ দিন, দীর্ঘ এ পথ তিনি একাই পাড়ি দিয়েছেন। যদিও ইসলামের বিধানমতে, কোনো নারীর জন্য একাকী হজ ও ওমরাহর সফরে যাওয়া বৈধ নয়।
সারা হাবা তিউনিসিয়া থেকে সাইকেল চালিয়ে লিবিয়া ও মিসর হয়ে সুদানের মরুভূমি পাড়ি দিয়েছেন। আরব নিউজসহ সৌদি আরবের প্রায় মিডিয়ায় সারার এমন কৃতিত্ব নিয়ে রিপোর্ট করেছে। আরব নিউজকে সারা বলেন, ‘আমি আল্লাহর ঘরের (কাবা) উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার পর পথে কোথাও যাত্রাবিরতি দেইনি। আমার ইচ্ছাশক্তিই আমাকে এখানে টেনে এনেছে। সত্যি কথা কী, এত অল্প সময়ে আমি দীর্ঘ এ সফর শেষ করতে পারব তা ভাবতেও পারিনি। কিন্তু হয়ে গেছে আলহামদুলিল্লাহ। আমি ভীষণ খুশি।’ সারা প্রতিদিন টানা ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা সাইকেল চালিয়েছেন। যাত্রাপথে একবার তার সাইকেলটি নষ্ট হয়ে যায়। সেটি তিনি নিজেই মেরামত করেন। তার এ সফর অনলাইনে ব্যাপক ভাইরাল হয়। মক্কা পৌঁছার পর প্রচুর মানুষ তাকে দেখতে ভিড় জমায়।
ওমরাহ পালন শেষে তিনি আকাশ পথে তিউনিসিয়া ফিরে যান। আল আরাবিয়ার খবরে বলা হয়, সারার আগে কোনো নারী সাইকেল চালিয়ে মক্কায় ওমরাহ পালনের জন্য আসেননি।
চীন থেকে সাইকেল চালিয়ে হজে : ২০১৬ সালে হজ পালনের উদ্দেশ্যে সাইকেল চালিয়ে সৌদি আরব পৌঁছান চীনের জিংজিয়াংয়ের অধিবাসী মুহাম্মদ। এ জন্য তাকে ৮ হাজার ১৫০ কিলোমিটার ভ্রমণ করতে হয়। চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও হজ পালনের জন্য সাইকেল চালিয়ে মুহাম্মদ চীন থেকে রওনা দিয়ে পাকিস্তান,
আফগানিস্তান, ইরান ও ইরাক হয়ে সৌদি আরব পৌঁছান। মুহাম্মদ বলেন, হজ করার ইচ্ছা ছিল ছোটবেলা থেকেই। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রওজা জিয়ারত ও রওজায় পৌঁছে রাসুলকে সালাম করার শখ থাকলেও আর্থিক সংগতি নেই। সে জন্য বাইসাইকেলে হজ করার সিদ্ধান্ত নিই। অবশেষে আল্লাহর অশেষ রহমতে সফল হয়েছি। এ জন্য তার দরবারে অসংখ্য শোকরিয়া জানাই।
আরও কিছু ঘটনা : ২০১৭ সালে ইন্দোনেশিয়ান এক যুবক হজ পালন করতে ৯ হাজার কিলোমিটারের বেশি পথ হেঁটে মক্কায় পৌঁছান। এর আগে ২০১৪ সালে মালয়েশিয়া থেকে কিছু যুবক সাইকেল চালিয়ে হজ পালন করতে সৌদি আরব যান। ২০১২ সালে ৪৭ বছর বয়সী বসনিয়ান মুসলিম সেনাদ হাদজিক হজ পালনের জন্য পায়ে হেঁটে পবিত্র মক্কায় পৌঁছান। ২০১৬ সালে রাশিয়ান বুলাত নাসিব আবদুল্লাহ (২৪) সাইকেল চালিয়ে হজ পালনের জন্য মক্কায় পৌঁছান। এ সময় তাকে ছয় হাজার ছয় শ’ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়েছে।
চলতি বছর (২০২২) মে মাসের শুরুতে
আফগানিস্তানের নাগরিক নুর আহমাদ সাইকেল চালিয়ে হজ পালনের জন্য সৌদি আরব রওনা হয়েছেন বলে পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম জিও নিউজের প্রতিবেদনে জানানো হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, নুর আহমাদের আগ্রহ দেখে আফগান সরকারের তরফ থেকে তাকে উড়োজাহাজের টিকিটের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। তিনি বলেন, ‘আমি আমার মতো করে সফরের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি আল্লাহর বিধি-বিধান পালন করছি।’ যাত্রাপথে তিনি ইরাক-ইরান হয়ে সৌদি আরব পৌঁছবেন।
