রাজধানী ঢাকার রামপুরা থানা এলাকার হাজিপাড়ার লামিয়া আদনান গার্মেন্টসের অপারেটর পারভিন। সব মিলিয়ে বেতন পান ১১৫০০ টাকা। তার স্বামী সাইদুর রহমান গাজীপুরের একটি তৈরি পোশাক কারখানায় ১৭০০০ টাকা বেতনে সুপারভাইজার পদে কর্মরত। দুজনের সম্মিলিত মাসিক আয় ২৮৫০০ টাকা। দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকায় এই আয়ে শ্রমজীবী পরিবারটির আর চলছে না। গত দুই বছরে তাদের বেতন বেড়েছে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। দুই বছর আগেও সংসার চালাতে এখনকার মতো নাভিশ্বাস অবস্থা হয়নি এই দম্পতির। পরিস্থিতি এতটা খারাপ হয়েছে যে অধিকাংশ দিন পারভিন তার দুই সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিয়ে নিজে কম খাওয়া শুরু করেছেন। এরমধ্যে যখন আবার বেতন আটকে যায় তখন আরও শোচনীয় অবস্থা তৈরি হয়।
যে শ্রমিকদের তৈরি করা পোশাক ইউরোপ আমেরিকার ঝাঁ চকচকে শোরুমে বিক্রি হয় নিজেদের বানানো সেই পোশাক তাদের কোনোদিন পরার সুযোগ হয় না। পারভিন ও তার পরিবার সস্তায় বছরে একবারই রমজানের ঈদে পোশাক কেনেন। কিন্তু এবার হাত বেশি টানাটানি হওয়ায় মেয়ের জন্য দুহাজার টাকা খরচ করে সালোয়ার-কামিজ ও স্যান্ডেল কিনেছেন। ছেলেকে এক হাজার টাকা খরচ করে শার্ট ও প্যান্ট কিনে দিয়েছেন। স্বামী সাইদুরও নিজের জন্য পোশাক কেনেননি। পারভিন ও সাইদুরের এই অভাবের গল্পটি দেশের প্রায় ৪৫ লাখ গার্মেন্ট শ্রমিকের গল্প।
দেশের যেসব এলাকায় গার্মেন্টস রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ এবং চট্টগ্রামে। এসব জেলায় ৩২শর বেশি কারখানায় কর্মরত রয়েছেন ৪৫ লাখের বেশি শ্রমিক।
খাদ্যসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় পারভিন-সাইদুরের মতো পরিবারগুলো ভয়াবহ অনটনের মধ্যে পড়েছে। অথচ এই গার্মেন্টস শ্রমিকের শ্রমের ওপর ভর করে তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাতে পরিণত হয়েছে। বছরে তৈরি পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয় আসে ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, আর এর ওপর ভর করে বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় অংশই টিকে আছে।
কিন্তু যারা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে সেই মানুষরা ভালো নেই। কয়েক বছরে বেতন সামান্য বাড়লেও দ্রব্যমূল্যর লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি দেশের ৪৫ লাখ গার্মেন্ট শ্রমিককে নিদারুণ সংকটে ফেলে দিয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) গত রবিবার রপ্তানি আয়ের হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, সদ্য শেষ হওয়া ২০২১ সালে পোশাক রপ্তানি থেকে ৩ হাজার ৫৮১ কোটি ১৮ লাখ (৩৫.৮১ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছেন রপ্তানিকারকরা। ২০২০ সালে এই আয়ের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭৪৭ কোটি ৭ লাখ (২৭.৪৭ বিলিয়ন) ডলার। এই হিসাবেই ২০২১ সালে আগের বছরের চেয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে ৩০ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেশি অর্থ দেশে এসেছে।
২৮৫০০ টাকায় শ্রমিক পরিবার চলছে না : পারভিনের গ্রামের বাড়ি বাগেরহাট। বাবা-মা কেউ জীবিত নেই। আর শ্বশুরবাড়ি বরগুনার বামনা এলাকায়। লামিয়া আদনান গার্মেন্টের অপারটের পারভিন দেশ রূপান্তরকে জানান, তার বেতন ৯২০০ টাকা, ওভারটাইম করে গড়ে মাসে ১১ হাজার ৫০০ টাকা বেতন পান। আর স্বামী সাইদুরের বেতন ১৭ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে তাদের দুজনের আয় ২৮ হাজার ৫০০ টাকা। এই টাকায় তাদের সংসার চলছে না। দুই বছর আগে এই একই বেতনে সংসার চালাতে তাদের এত কষ্ট হতো না। এর মধ্যে স্বামী তার কর্মস্থল গাজীপুরে থাকেন, মাঝেমধ্যে আসেন। ফলে সেখানে তার একটা ব্যয় হয়। সাইদুর তার ঢাকায় থাকা পরিবার চালাতে মাসে ১২ হাজার টাকা দেন, বাকি ৫ হাজার টাকায় গাজীপুরে তিনি চলেন।
পারভিনের হাতে মাস খরচের জন্য থাকে নিজের ১১ হাজার ৫০০ ও স্বামীর ১২ হাজার মিলিয়ে মোট ২৩ হাজার ৫০০ টাকা। তিনি দেশ রূপান্তরকে তাদের মাসিক খরচের হিসাব দেন। সেই হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, খিলগাঁও মাটির মসজিদ এলাকায় এক কক্ষের একটি বাসায় দুই সন্তান নিয়ে থাকেন, সেখানকার ঘরভাড়া ৬ হাজার ৫০০ টাকা। পারভিনের বাবা-মা নেই, কিন্তু সাইদুরের বরগুনার বামনায় গ্রামের বাড়িতে মায়ের জন্য প্রতি মাসে পাঠাতে হয় ৩ হাজার টাকা।
পারভিনের দুই ছেলে-মেয়ে। এর মধ্যে মেয়েটি সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। ক্লাসে শিক্ষকরা ঠিকমতো পড়ান না, সে কারণে মেয়েকে আলাদা করে কোচিংয়ে ভর্তি করিয়েছেন। মেয়ের পড়াশুনার পেছনে মাসে ব্যয় হয় ৩ হাজার টাকা। শ্রমজীবী এই দম্পতির একটি ছেলে আছে, সে খিলগাঁও মডেল কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্সে পড়ছে। বছরে ফরম ফিলাপসহ ছেলেটির মাসে শিক্ষাব্যয় ১ হাজার টাকা, পেঁয়াজ, রসুন, তেল, লবণ, সাবান, ডিমসহ মাসে মুদি দোকানে খরচ ৫ হাজার টাকা।
পারভিন বছরে দুই থেকে তিনবারের বেশি গরুর মাংস কেনেন না। কারণ গরুর মাংসের দাম বেশি। তিনি মাসে দুই থেকে তিনবার পোলট্রি মুরগি কেনেন। মাসের বেশিরভাগ দিন পারভিন বাজারে সব থেকে কমদামি তেলাপিয়া ও পাঙাশ মাছ কেনেন। এর সঙ্গে বেছে বেছে সব থেকে কমদামি সবজি কেনেন তিনি। মাছ ও সবজি বাদে পারভিনের মাসে সাড়ে ৩ হাজার টাকা খরচ। এছাড়া ডিশ বিল ৩০০ টাকা এবং চিকিৎসা ব্যয় ১৫০০ টাকাসহ বাদবাকি সব খরচ ২৩ হাজার ৫০০ টাকায় মেটাতে পারছেন না পারভিন।
পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় যখন স্বামী সাইদুরের বেতন অনিয়মিত হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এ মাসে আজ (গত ২৭ মে) এখনো বেতন হয়নি। মুদি দোকানে অনেক টাকা বাকি পড়ে গেছে। ঘরভাড়া দিতে পারিনি। এরকম মাঝেমধ্যে হয়, গার্মেন্টস মালিকরা বেতন দেয় না। তখন বেশি খারাপ হয় অবস্থা।’
উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েকে দুধ খেতে দেন কিনা জানতে চাইলে পারভিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুধ কেনার সামর্থ্য আমাদের নেই। বছরে দুই তিনবারের বেশি গরুর মাংস কিনতে পারি না। গরুর মাংসের দাম এখন ৭০০ টাকা, এই টাকায় আমার প্রায় সাতদিনের কাঁচাবাজার হয়ে যাবে।’
রেমিট্যান্স-যোদ্ধা পারভিন কখনো সমুদ্র দেখেননি : যে শ্রমিকদের হাড়ভাঙা খাটুনির ওপর মালিকের প্রাসাদ নির্মাণ হয়, বছর বছর নতুন গাড়ি হয়, মন খারাপের দিনে হাওয়াই দ্বীপ বা মন ভালোর দিনে সুইজারল্যান্ড যায় সেই শ্রমিক সুইজারল্যান্ড-হাওয়াই দ্বীপ দূরে থাক দেশের ভেতর রাঙ্গামাটি, কক্সবাজার কখনো দেখেননি। এমনকি অনেকের ঢাকার শিশু পার্কটির ভেতরও ঢুঁ মারার সুযোগ হয়নি।
কখনো কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে গেছেন বা রাঙ্গামাটি? এমন প্রশ্নে বিস্ময়ের ঘোর কাটে না পারভিনের। তিনি প্রথমে বিড়বিড় করে কিছু বলেন, অস্পষ্ট শোনা যায় না। পরে বেশ স্বাভাবিক কণ্ঠেই বলেন, ‘কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি টিভিতে দেখেছি। ওখানে যাওয়ার মতো টাকা আমাদের নেই। কোনোদিন শিশু পার্কেই যেতে পারিনি।’
এই শ্রমজীবী মা অবশ্য সন্তানের বেলায় বেশ উদার। তিনি বলেন, ‘অনেকেই ছেলে-মেয়েরা কাজ করার মতো হলেই গার্মেন্টসে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু আমি চাই আমার সন্তানরা লেখাপড়া করুক। সে কারণে ওদের কষ্ট করে পড়াচ্ছি। ওরা যখন বড় হবে তখন ওদের ভাগ্য ওরা ঠিকই গড়ে নিতে পারবে।’
দাম কেবলি বাড়ে!
চালের ভরা মৌসুমেও দেশের বাজারে চলছে অস্থিরতা। গত এক মাসে কয়েক দফায় বেড়েছে সব ধরনের চালের দাম। একইসঙ্গে বেড়েছে আটা-ময়দাসহ সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম। এতে বিপাকে পড়েছেন স্বল্প আয়ের মানুষ। তারা বাজার করতে গিয়ে আয়ের সঙ্গে ব্যয় মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
গত মঙ্গলবার রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা বাজারে প্রকারভেদে প্রতি কেজি মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৫২ থেকে ৫৫ টাকায়। সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭২ টাকায়। নাজিরশাইল বিক্রি হচ্ছে ৭৮ থেকে ৮০ টাকায়। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যমতে গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে গড়ে ৭ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বৌবাজারের মুদি ব্যবসায়ী শাহাদাত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বোরো মৌসুমে সব সময় দেখেছি চালের দাম কমে যায়। কিন্তু এবার উল্টো ঘটনা ঘটেছে। এবার বোরো মৌসুমে চালের দাম বাড়ছে। এমন কোনো মুদি পণ্য নেই যে দাম বাড়েনি। ক্রেতারা এসে আমাদের সঙ্গে ঝামেলা করেন। আমরা পণ্যের দাম বাড়াই না। জিনিসপত্রের দাম এমনভাবে বেড়েছে যে আমাদেরও ক্রেতাদের মুখের দিকে তাকাতে খারাপ লাগে। কিছু করার নেই। আমরা যেভাবে পাইকারি মোকামে কিনি, সেভাবে বিক্রি করতে হয়।’
এদিকে কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আগের মতোই চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে ডিম-মাছ-মাংসসহ সব ধরনের সবজি। প্রতি ডজন ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা। যা এ মাসের শুরুর দিকে ১০০-১০৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এছাড়া প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকা। প্রতি কেজি সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা।
একই ভাবে বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে গরুর মাংস। ঈদের আগে বৃদ্ধি পাওয়া গরুর মাংসর দাম এখন ৭০০ টাকা রাখা হচ্ছে। কারওয়ান বাজারের মাংস বিক্রেতা আল আমিন বলেন, ‘দেশের বাজারে সব পণ্যের দাম বাড়তি। গরুর খাবারের দামও বেড়েছে। সেই সঙ্গে পরিবহন খরচ। আমাদের বেশি দামে গরু কিনতে হয়। তাই বাড়তি দাম রাখা হচ্ছে। গরুর দাম কমলে আমরাও কম দামে বিক্রি করতে পারব। তবে কোরবানির আগে গরুর দাম কমার সম্ভাবনা নেই।’
