ইতালিকে উড়িয়ে আত্মবিশ্বাস বাড়ল মেসিদের

আপডেট : ০৩ জুন ২০২২, ০১:১৯ এএম

মেসি মাস্টারক্লাসে ইউরো চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপ-সেরার লড়াইটি যেভাবে আর্জেন্টিনা জিতেছে, তাতে কাতার বিশ্বকাপে বড় কিছুর স্বপ্ন দেখতেই পারেন আর্জেন্টাইনরা। ওয়েম্বলিতে রবিবার ফিনালিসিমায় মেসি শুধু গোলটাই পাননি, কিন্তু হতবিহ্বল ইতালিয়ানদের বিপক্ষে জিততে আর যা করেছেন, তা মোহাবিষ্ট করেছে ওয়েম্বলির রেকর্ড ৮৭ হাজার দর্শক আর সারা বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবল অনুরাগীকে। স্কোরশিটে লাউতারো মার্তিনেজ, অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া, পাওলো দিবালার নাম। যার মধ্যে দুটি গোলের অ্যাসিস্ট ওই মেসির। কোপার পর আরেকটি বড় শিরোপা জয়ের পর আর্জেন্টাইন অধিনায়ক বলেছেন, এই দল যেকোনো কিছুর জন্যই প্রস্তুত। সব দলের বিপক্ষে সবকিছু জয়ের জন্য লড়াই করতে পারবে তারা!

টানা ৩২ ম্যাচ অপরাজিত। এই অপরাজিত থাকার দৌড়ের মাঝে আর্জেন্টিনা জিতেছে দুটি ট্রফি। গেল বছর কোপা আমেরিকার পর এবার জিতল ফিনালিসিমা শিরোপা। জাতীয় দলের হয়ে মেসির এটি দ্বিতীয় শিরোপা। যদিও এক ম্যাচেই নির্ধারিত হয়েছে এ শিরোপার। তবু মিশেল প্লাতিনি (ফ্রান্স ১৯৮৫), ডিয়েগো ম্যারাডোনার (আর্জেন্টিনা ১৯৯৩) পর এই ট্রফি উঁচিয়ে ধরার মর্যাদাটা তো কম নয়।

ইতালির বিপক্ষে ম্যাচটি নিয়ে সন্তুষ্ট আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। বলেছেন, ‘ফাইনাল ম্যাচটি আমাদের জন্য দারুণ কেটেছে। এখানে আর্জেন্টিনার সমর্থকে ভরা ছিল। আমরা জানতাম, চ্যাম্পিয়ন হলে দারুণ এক পরিবেশ তৈরি হবে।’ দলের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা ভালো থেকে আরও ভালো হচ্ছি। আরও উন্নতি করতে পারি। আজ আমরা আরও একবার দেখিয়েছি এই দলটি সবকিছুর জন্যই প্রস্তুত।’

মেসিকে ঘিরে ধরেছেন বিদায়ী ম্যাচ খেলতে নামা জিওর্জিও কিয়েলিনিসহ চার ইতালিয়ান। মেসিকে আটকাতে তার জার্সিও টেনে ধরেছেন কিয়েলিনি। ম্যাচজুড়ে এমন অনেক ছবিই রচিত হয়েছে, যার বেশির ভাগেরই শেষে বিজয়ী মেসি। ইতালির জমাট রক্ষণের কড়া পাহারা ভেদ করে বারবারই বেরিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। ১৫ থেকে ২৫ মিনিটের মধ্যে তিন তিনবার ইতালির রক্ষণ ভেদ করে বেরিয়ে গেছেন। কিন্তু গোল পাননি বা অন্য কাউকে দিয়ে গোল করাতে পারেননি। অবশেষে ২৭ মিনিটে মেসি সফল হন। সতীর্থের পাস ধরে বাঁদিক দিয়ে ডি-বক্সে ঢুকে পড়েন। পুরোটা সময় মেসির সঙ্গে লেগে ছিলেন ডিফেন্ডার জিওভান্নি ডি লরেন্সো। কিন্তু বল পায়ে একটু ঘুরে গোলমুখে বল বাড়ান মেসি, টোকায় বাকি কাজ সারেন মার্তিনেজ। বিরতির ঠিক আগে এমি মার্তিনেজের লম্বা শট মাঠের মাঝ লাইন বরাবর ধরে মার্তিনেজ দৌড়ে গিয়ে বল দেন ডি মারিয়াকে। ব্রাজিলের বিপক্ষে কোপা ফাইনাল জয়ের গোলদাতা বোকা বানান দোন্নারুমাকে। দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই একের পর এক আক্রমণে ইতালিকে রীতিমতো বিপর্যস্ত করে ফেলে আর্জেন্টিনা। মেসি দেখা দিয়েছেন মেসির রূপে। তবে এই ম্যাচে আলাদা করে নজর কেড়েছেন অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া। ইতালির রক্ষণভাগে রীতিমতো আতঙ্ক ছড়িয়েছেন তিনি। ৪৯ থেকে ৬১ এই ১২ মিনিটে তিনটি গোলের সুযোগ তৈরি করেছে আর্জেন্টিনা। তিনটিরই শেষ ডি মারিয়ার মাধ্যমে। ৪৯ ও ৫৯ মিনিটে ডি মারিয়ার বাঁ পায়ের দুর্দান্ত দুটি শট দারুণ দক্ষতায় বাঁচিয়েছেন ইতালির গোলকিপার দোন্নারুমা। ৬১ মিনিটে ডি মারিয়ার অসাধারণ বাঁকানো শটও গোলে ঢুকতে পারেনি দোন্নারুমার কারণেই। তিনটি সুযোগের দুটিই তৈরি হয়েছিল মেসির অসাধারণ ড্রিবলিং থেকে। ম্যাচের ইনজুরি সময়ে তার আরেক অ্যাসিস্টে গোল করেন বদলি নামা দিবালা। মাঝমাঠ থেকে বল পায়ে দারুণ গতিতে আক্রমণে উঠলেও ডি-বক্সের বাইরে বলের নিয়ন্ত্রণ হারান মেসি। ইতালিও বল ক্লিয়ার করতে পারেনি, আবার মেসির পায়ে বল এলে খানিক সামনে দিবালাকে দেন। সেখান থেকে প্লেসিং শটে গোল করেন জুভেন্তাস ছাড়া ফরোয়ার্ড।

মেসিকে ম্যাচসেরা বেছে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে উয়েফার টেকনিক্যাল অবজারভার যুক্তি দেখেয়েছেন, ‘শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছে। লাউতারো মার্তিনেজের গোলে সহায়তা এবং সতীর্থদের জন্য আরও সুযোগ তৈরি করতে সে দারুণ দক্ষতা দেখিয়েছে। তার গোল না করতে পারা ছিল দুর্ভাগ্যজনক। ওয়েম্বলি দর্শকদের সামনে সে মাস্টারক্লাস পারফরম্যান্স করেছে, যা ছিল দারুণ উপভোগ্য।’

টানা ৩২ ম্যাচে অপরাজিত আর্জেন্টিনা তা মেসির কাছে অসাধারণ এক ব্যাপার, ‘জয়ের ধারায় থাকাটা খুব ভালো। এটা ইতিবাচক বিষয়। আমাদের এভাবেই এগিয়ে যেতে হবে। এ ধারাটা ধরে রাখতে হবে। উন্নতি করে যেতে হবে। এটাই চাই।’ প্রথম গোলদাতা মার্তিনেজ বলেন ‘এটা অমূল্য। যেভাবে সবকিছু এগোচ্ছে, যেভাবে খেলছি এবং দলটা যেভাবে গুছিয়ে উঠেছে তাতে আমরা খুবই খুশি। তবে বিশ্বকাপের আগে এখনো বেশ কয়েক মাস সময় বাকি আছে। আমরা জানি, কিছু কিছু জায়গায় আমাদের আরও ঠিকঠাক করতে হবে।’ ডি মারিয়ার গোলেই ২৮ বছরের শিরোপা খরা কাটিয়ে কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতেছিল আর্জেন্টিনা। কোপা জয়ের পর থেকে দলের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে বলে মনে করেন ডি মারিয়া। ‘আমরা কোপা আমেরিকা জয়ের পর থেকে সবকিছু বদলে গেছে। আমার ওপর থেকে ভার নেমে গেছে এবং আমরা খেলাটা উপভোগ করছি। একসঙ্গে দারুণ সময় কাটাচ্ছি এবং সবকিছু বেশ সহজ মনে হচ্ছে। সব মিলিয়ে আমরা দারুণ রোমাঞ্চিত। তবে আমাদের পা অবশ্য মাটিতেই রাখতে হবে।’

যারা ম্যাচটি দেখেছেন, তারা বলবেন, এই স্কোরলাইনও আসলে ম্যাচের আসল চিত্রটা বোঝাতে পারছে না। কোপা আমেরিকার পর লিওনেল মেসির হাতে আরেকটি ট্রফি মাস ছয়েক পরের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে নিশ্চিতভাবেই বড় কিছুর স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত