আসছে ২৫ জুন খুলতে যাচ্ছে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতু। নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে, ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়তায় সফল হয়েছে দেশের মানুষের স্বপ্ন। সেতুটি উদ্বোধনের প্রাক্কালে দেশের বাইরে থেকেও এ অর্জনের বাহবা পাচ্ছে বাংলাদেশ, প্রশংসিত হচ্ছেন শেখ হাসিনা। খোদ পাকিস্তানের বিশ্লেষকরা সাধুবাদ জানাচ্ছেন, খবর প্রকাশ করছে দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলোও। পাকিস্তানের আন্তর্জাতিকবিষয়ক বিশ্লেষক ড. মালিকা-ই-আবিদা খাত্তাকও ভূয়সী প্রশংসা করেছেন শেখ হাসিনার। গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি দেশটির সংবাদমাধ্যম ‘ডেইলি টাইমস’ পত্রিকায় এ অর্জনের কৃতিত্ব শেখ হাসিনাকে দিয়ে লিখেছেন ‘বাংলাদেশের পদ্মা সেতুর গল্প; সেতুর চেয়ে বড় কিছু?’ শিরোনামের এক নিবন্ধ। তাতে তিনি লিখেছেন, পদ্মা সেতু তৈরির মাধ্যমে শেখ হাসিনা বিশে^ যেমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তেমনি আত্মবিশ্বাস ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন।
ড. মালিকা-ই-আবিদা খাত্তাক লিখেছেন, বাংলাদেশের বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা সেতু একটি স্বপ্নের প্রকল্প। চলতি মাসের ২৫ জুন উদ্বোধন হতে যাচ্ছে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল ১০টায় দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সেতুটি উদ্বোধন করবেন। পূর্বদিকে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নদীর অপর পাড়ে একটি বিশাল জনসভায় ভাষণ দেবেন, যা ২০১৮ সালের পর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তার প্রথম জনসাধারণের সামনে উপস্থিতি।
ড. খাত্তাক লিখেছেন, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার যাত্রীরা দেশের বাংলাবাজার-শিমুলিয়া রুটে ফেরি দিয়ে পদ্মা পার হন। দীর্ঘ যানজটে ভোগান্তিতে পড়তে হয় যাত্রী ও চালকদের। চালু হলে এটি হবে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ সেতু এবং সড়ক চলাচলের জন্য প্রথম নির্দিষ্ট নদী পারাপার। দ্বি-স্তরের ইস্পাত ট্রাস সেতুটির ওপরের স্তরে একটি চার লেনের মহাসড়ক এবং নিচের স্তরে একটি একক-ট্র্যাক রেলপথ থাকবে। দক্ষিণাঞ্চলের লাখো মানুষের স্বপ্নের পদ্মা সেতু এ মাসে উদ্বোধন হলে মানুষের দুর্ভোগের অবসান হবে। মুন্সীগঞ্জের মাওয়া পয়েন্ট এবং শরীয়তপুরের জাজিরা পয়েন্টের সঙ্গে সংযোগকারী বাংলাদেশের একটি স্বপ্নের প্রকল্প পদ্মা বহুমুখী সেতু, যা যাত্রী ও মালবাহী যানবাহনের জন্য যাত্রা সহজ করবে এবং ধীরে ধীরে দেশের জিডিপি ১.৩-২ শতাংশ বাড়িয়ে দেবে।
পাকিস্তানি এই বিশ্লেষকের মতে, বাংলাদেশের উন্নয়নের মূর্তিমান প্রতীক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুর মতো স্থাপনা তৈরি করে বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আত্মবিশ্বাস ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। বিশাল প্রতিবন্ধকতার পথে তাকে হাঁটতে হয়েছে কিন্তু তিনি তার গন্তব্যে ঠিকই পৌঁছান। সেতু নির্মাণের সময় যে ষড়যন্ত্র ছড়িয়ে পড়েছিল তিনি তা দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করে সত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগে প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করে এবং অন্য দাতারা তা অনুসরণ করে। বিশ্বব্যাংক একটি মিথ্যা দুর্নীতির অভিযোগ এনে এক ব্যক্তির যোগসাজশে বোর্ডসভা না করে সেতু নির্মাণে অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়, যা পরে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়। পদ্মা সেতুতে ঘুষ কেলেঙ্কারির কোনো প্রমাণ পায়নি কানাডার আদালত।
ড. খাত্তাব আরও বলেন, ‘করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হলেও সেতুটির নির্মাণকাজ পুরোদমে চলছিল। শেখ হাসিনার অদম্য ইচ্ছাশক্তির কারণে সেতুর কাজ এক দিনের জন্যও বন্ধ হয়নি। করোনা মোকাবিলায় পদ্মা সেতুর কাজ এগিয়েছে। সবাই যখন দেখল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সেতুর কাজ এগিয়ে যাচ্ছে, তখন কিছু অসাধু ও ষড়যন্ত্রকারী গুজব ছড়াতে থাকে। গুজব ছড়ানো হয়েছিল যে সেতু তৈরি করতে মানুষের মাথা লাগবে। সরকারও দক্ষতার সঙ্গে তা মোকাবিলা করেছে। শেখ হাসিনার অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে শুধু পদ্মা সেতুই নয়, মেট্রোরেল ও দেশের বৃহত্তম টানেলের কাজও প্রায় শেষের দিকে। সেগুলো এ বছর জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে অনেক মেগা প্রকল্পের কাজ চলছে।’
তিনি লিখেছেন, পদ্মা সেতু শুধু একটি সেতু নয়; এটি দেশের একটি বড় সম্পদ। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত একটি বহুমুখী সড়ক ও রেলসেতু। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল উত্তর-পূর্ব অংশের সঙ্গে যুক্ত হবে। ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১৮.১০ মিটার চওড়া সেতুর নির্মাণকাজ ৭ ডিসেম্বর, ২০১৪ তারিখে শুরু হয়। আজ পদ্মা সেতু দৃশ্যমান। গর্বের সেতু আজ দাঁড়িয়ে আছে। নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে সারা বিশ্বে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর একটি সাহসী সিদ্ধান্ত তাকে একজন আত্মবিশ্বাসী, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি, ক্রমাগত জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং বিভিন্ন সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের উন্নতি আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এই সেতুর জন্য প্রধানমন্ত্রী যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের সাফল্য সেই ত্যাগকে যৌক্তিক প্রমাণ করেছে।
প্রাথমিকভাবে নির্মাণ খরচ কম ছিল। কিন্তু পরে এটি কয়েক পয়েন্ট বৃদ্ধি করে ৩.৮৬৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়ায়। নির্মাণ সময় এবং নির্মাণ খরচ উভয় বৃদ্ধি, যদিও নির্মাণব্যয় নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতামত রয়েছে। তবে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো সেতুটি সম্পূর্ণ হয়েছে এবং জুন মাসে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। সেতুটি রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং সামাজিক ঘটনার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। সেতুটি নির্মাণ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ছিল। সেতুটি চালু হলে দেশের অর্থনীতি চাঙা হবে। দেশের অর্থনীতির কাঠামো বদলে যাবে।
কৃষির ব্যাপক উন্নয়ন হবে। সেতুটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে রাজধানীতে কৃষিপণ্য পরিবহনে একটি যুগান্তকারী অধ্যায় তৈরি করবে। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ভালো দাম পাবেন। পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক শিল্পায়ন ঘটবে।
পাকিস্তানি এই বিশ্লেষক মনে করেন পদ্মা সেতু হয়ে উঠতে পারে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের একটি অংশ। তার মতে, যোগাযোগ ও পরিবহন ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটবে। সেতুটির মাধ্যমে পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন হবে। সেতুটির দেশের মুন্সীগঞ্জ ও শরীয়তপুর সেকশনে একটি ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে, যা খুবই নজরকাড়া ও চিত্তাকর্ষক।
সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা রাখবে এ সেতু। এ সেতুর চারপাশে গড়ে তোলা হবে রিসোর্ট, হোটেল ও রেস্তোরাঁ। যেখানে বাঙালি খাবার পরিবেশন করা হবে, যা বিদেশিদের কাছে বাঙালি সংস্কৃতিকে আরও পরিচিত করে তুলবে। পদ্মা সেতু দেশের জিডিপি বাড়াবে এবং মাথাপিছু আয়ও বাড়াবে। এ সেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রেল যোগাযোগ আরও মজবুত করবে। মানুষ ঢাকা থেকে স্বল্প সময়ে স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করতে পারবে।
সেতুকে ঘিরে গড়ে উঠবে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান বহু গুণ বেড়ে যাবে।
পদ্মা সেতুর নাম উচ্চারণ করলে শেখ হাসিনার নাম উচ্চারণ করতে হবে। শেখ হাসিনার নাম এবং পদ্মা সেতু একে অপরের পরিপূরক। তাদের আলাদা করার কোনো সুযোগ নেই। পদ্মা সেতুর নাম শেখ হাসিনার নামে না হলেও প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম জানবে শেখ হাসিনার কারণেই এ সেতু তৈরি সম্ভব হয়েছে।
শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু নির্মাণের বড় চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে জয়ী হয়েছেন। বাংলাদেশ এরই মধ্যে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে। পদ্মা সেতু দেশকে দ্রুত নিয়ে যাবে। বাংলাদেশকে উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে যেতে এ সেতু অনন্য ভূমিকা রাখবে।
বহুল প্রতীক্ষিত পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল, যা আগামী ২৫ জুন যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার মাধ্যমে প্রমাণিত হবে। বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে এবং জাতির আস্থাকেও ত্বরান্বিত করেছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে এবং জাতির আস্থাকেও ত্বরান্বিত করেছে।
