আজ শনিবার থেকে দেশব্যাপী করোনা টিকার তৃতীয় বা বুস্টার ডোজ সপ্তাহ শুরু হচ্ছে। ১০ জুন পর্যন্ত এ কর্মসূচি চলবে। এ সময় করোনা টিকার দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার চার মাস পূর্ণ হয়েছে এমন টিকাগ্রহীতাদের বুস্টার ডোজ দেওয়া হবে। এ সাত দিনে দেড় কোটি মানুষকে বুস্টার ডোজ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সকাল ৯টা থেকে টিকা দেওয়া শুরু হবে এবং কেন্দ্রে যতক্ষণ টিকাগ্রহীতা থাকবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত টিকা দেওয়া হবে। দেশের যেকোনো টিকাদান কেন্দ্রে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার কাগজ নিয়ে গেলেই বুস্টার ডোজ দেওয়া হবে। অগ্রাধিকার পাবেন বয়স্ক, নারী, অন্তঃসত্ত্বা ও প্রতিবন্ধীরা। দেওয়া হবে ফাইজার, মডার্না ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকা।
এ ব্যাপারে কভিড-১৯ টিকাবিষয়ক বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাতৃ, নবজাতক ও শিশু স্বাস্থ্য কর্মসূচির পরিচালক ডা. মো. শামসুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কর্মসূচির সব পরিকল্পনা ঠিক আছে। কোনো পরিবর্তন হয়নি। দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার চার মাস পূর্ণ হয়েছে, এমন লোকজন যাতে সহজেই বুস্টার ডোজ নিতে পারেন, সেজন্য সবকিছু সহজ করা হয়েছে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সাত দিনের এ কর্মসূচিতে ইউনিয়ন পর্যায়ে দুদিন বুস্টার ডোজ দেওয়া হবে। ইউনিয়নে টিকা দেওয়া হবে কমিউনিটি ক্লিনিকে এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় সরকারি হাসপাতাল ও আগের নির্ধারিত কেন্দ্রগুলোতে। অন্যদিকে যেখানে ফাইজার টিকা দেওয়ার ব্যবস্থাপনা আছে এমন উপজেলা ও জেলাগুলোতে বুস্টার ডোজ দেওয়া হবে সাত দিন। উপজেলার হেলথ কমপ্লেক্স ও জেলার সরকারি হাসপাতালে গেলেই টিকা পাবে মানুষ।
অধিদপ্তরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সারা দেশে ১৬ হাজার ১৮১ টিকা কেন্দ্রে বুস্টার ডোজ টিকা দেওয়া হবে। এর মধ্যে ৬২৩টি স্থায়ী কেন্দ্র ও ১৫ হাজার ৫৫৮টি অস্থায়ী কেন্দ্র। অস্থায়ী কেন্দ্রে টিকা দেওয়ার তারিখ স্থানীয় পর্যায়ে প্রচার-প্রচারণা ও মাইকিং করে জানিয়ে দেওয়া হবে। ৪৫ হাজার ৫৩৫ জন টিকাদানকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবী টিকাদান কাজে নিয়োজিত থাকবেন।
উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায়ে বুস্টার ডোজ হিসেবে মডার্না বা অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকা দেওয়া হবে। সিটি করপোরেশনের আওতাধীন যেসব টিকা কেন্দ্রে ফাইজার টিকা দেওয়া হয়, সেসব কেন্দ্রে বুস্টার হিসেবে ফাইজার ও যেসব কেন্দ্রে ফাইজার দেওয়া হয় না, সেসব কেন্দ্রে মডার্না বা অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকা দেওয়া হবে।
বুস্টার ডোজের চ্যালেঞ্জ : বুস্টার ডোজের ব্যাপারে করোনা টিকা ব্যবস্থাপনার টাস্কফোর্স কমিটির সভাপতি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘বুস্টার ডোজের কয়েকটা চ্যালেঞ্জ আছে। যাদের দ্বিতীয় ডোজের চার মাস হয়েছে, তাদের দিতে হবে। বুস্টার ডোজ মাত্র তিনটি ভ্যাকসিন দিয়ে দিতে পারছি। তার মধ্যে ফাইজার সংগ্রহে সবচেয়ে বেশি আছে। ফাইজার আবার কমিউনিটি লেভেল পর্যন্ত নেওয়া যায় না। এ টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রেও কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। সবকিছু মিলে অনেক বড় টার্গেট করিনি। আমরা যেটা চিন্তা করছি কমিউনিটি লেভেলে সপ্তাহে দুদিন দেওয়া হবে। সপ্তাহের প্রথম দুদিন প্রচার-প্রচারণা করবে, যাতে স্থানীয়ভাবে জানতে পারে ও তৃতীয় দিন টিকা দেবে। আবার চতুর্থ ও পঞ্চম দিন প্রচার-প্রচারণা করবে ও ষষ্ঠ দিনে টিকা দেবে।’
বুস্টার ডোজের পাশাপাশি করোনার টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার স্বাভাবিক কার্যক্রম চলমান থাকবে বলেও জানান এ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘করোনা প্রতিরোধে টিকা একটি কার্যকর সমাধান। করোনার টিকার পূর্ণ সুফল পেতে হলে অবশ্যই তৃতীয় বা বুস্টার ডোজ নিতে হবে।’
ডা. ফ্লোরা জানান, যে যেখানেই প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ টিকা পেয়ে থাকুক না কেন, তার কাছে যদি দ্বিতীয় ডোজ পূর্ণ হওয়ার চার মাসের কাগজ থাকে, সেটা নিয়ে যেকোনো কেন্দ্রে গেলেই বুস্টার ডোজ পাবেন। কেন্দ্রে যাওয়ার সময় সুরক্ষা অ্যাপ থেকে দ্বিতীয় ডোজের প্রিন্টেড কপি নিয়ে যেতে হবে। আর যারা সুরক্ষা অ্যাপের মাধ্যমে নেননি, ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে নিয়েছেন এবং চার মাস পূর্ণ হয়েছে, তাদের সে কাগজটা নিয়ে যেতে হবে। যেকোনো কেন্দ্রে গেলেই টিকা পাবেন।
ঢাকায় ৪১ কেন্দ্র : ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৭টি কেন্দ্রে ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৪টি কেন্দ্রে করোনা টিকার বুস্টার ডোজ দেওয়া হবে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কেন্দ্রগুলো হলোÑ শ্যামলীর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, মিরপুরে ঢাকা ডেন্টাল কলেজ, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ), ঢাকা শিশু হাসপাতাল, মহাখালীর কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল, ঢাকা কুর্মিটোলা ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, উত্তরায় বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল, জাতীয় বাতজ¦র ও হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শেখ রাসেল গাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মোহাম্মদপুর ফারটিলিটি সেন্টার, জাতীয় নাক কান গলা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ সংসদ সচিবালয় ক্লিনিক, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি ইনস্টিটিউট, মেডিকেল স্কোয়াড্রন (বিএএফ শাহীন), বিএনএস হাজী মহসিন, মিরপুরের লালকুঠি হাসপাতাল, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান, মেডিকেল স্কোয়াড্রন (বিএএফ বঙ্গবন্ধু), র্যাব ফোর্সেস হাসপাতাল।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কেন্দ্রগুলো হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ফুলবাড়িয়ায় সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল, মাতুয়াইলে শিশু মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, মুগদা ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতাল, আজিমপুর মা ও শিশু হাসপাতাল, ঢাকা মহানগর জেনারেল হাসপাতাল, কামরাঙ্গীরচর ৩১ শয্যা হাসপাতাল, বাংলাদেশ সচিবালয় ক্লিনিক, লালবাগে ঢাকা মহানগর শিশু হাসপাতাল, পিলখানা বিজিবি হাসপাতাল।
বেশি মজুদ ফাইজার : স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, গত শুক্রবার পর্যন্ত দেশে সবচেয়ে বেশি মজুদ ছিল ফাইজার টিকা ১ কোটি ৩৯ লাখ ৯৪ হাজার ১৭৫ ডোজ। এরপর মডার্না ২৫ লাখ ৬ হাজার ৮৪২ ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা ১৯ লাখ ১১ হাজার ৬৭২ ডোজ মজুদ আছে।
বুস্টার পেয়েছেন ১৩% : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত শুক্রবার পর্যন্ত দেশে বুস্টার ডোজ দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৫৫ লাখ ৬১ হাজার ৩৩৩ জনকে, যা দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন এমন জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ। এছাড়া প্রথম ডোজ নিয়েছেন ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৮৬ হাজার ২৩৪ জন, যা মোট জনসংখ্যার ৭৬ শতাংশ এবং লক্ষ্যমাত্রা ৭০ শতাংশ ছাড়িয়ে ১০৮ শতাংশ হয়েছে। দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন ১১ কোটি ৭৭ লাখ ৫৬ হাজার ৬১৪ জন, যা মোট জনসংখ্যার ৬৯ শতাংশ ও লক্ষ্যমাত্রার জনসংখ্যার ৯৯ শতাংশ।
