মুম্বাইয়ে হালের বৈষম্য আর বিদ্রোহের অতীত

আপডেট : ০৫ জুন ২০২২, ১০:৩৭ পিএম

এই যে না বলে কয়ে পুরো এক সপ্তাহ ডুব দিলাম তা নিয়ে দয়া করে কেউ গোস্সা করবেন না। কখনো কখনো এ রকমভাবে হারিয়ে যেতে বেশ লাগে। এ আমার দীর্ঘদিনের অভ্যেস। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে আমি অন্য এক ভারতের খোঁজ করি। এই এখন যেমন আরব সাগরের তীরে মেরিন ভ্রাইভে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমচি মুম্বাই দেখছি। এ শহর কখনো ঘুমায় না। এখন অনেক রাত। থিকথিক করছে লোক।

বাচ্চারা মায়ের হাত ছাড়িয়ে দৌড়াচ্ছে। প্রেমিকা নিশ্চিন্তে প্রেমিকের বুকে মুখ গুঁজে সোহাগ খাচ্ছে। দুই বয়স্ক দম্পতি বোধহয় স্মৃতিচারণ করছেন ফেলে আসা অতীতের। ফেরিওয়ালা নিচু গলায় হরেক মাল ফেরি করছে। পাওভাজি, আইসক্রিম, বেলুন, পানিপুরি সবমিলিয়ে এক হট্টমলার আসর। প্রায় মাটি ফুঁড়ে আলাদিনের আশ্চর্য দীপের মতো এক মালিশওয়ালা এসে হাজির। নাম ইমাম আলী মোল্লা। আগ্রার ছেলে। দশ বছর ধরে বিচে বিচে ঘুরে এ কাজ করে সংসার চালাচ্ছে। সংসার বলতে মা-বাবা-বউ আর দুই ছেলেমেয়ে। মেয়ে ছোট। ছেলে স্কুলে পড়ছে। মেয়েকেও পড়াবে।

নিশ্চয়ই সবাই মুম্বাইয়ের বাসিন্দা নয়। পোশাক, ভাষা, চলন দেখলেই বোঝা যায় কে কোন প্রদেশের লোক। পাঞ্জাবি, গুজরাটি, তামিল, কেরলিয়ান, তেলেগু, ওড়িশি, অসমিয়া, মণিপুরী, বাঙালি সবাইকেই আপনি খুঁজে পাবেন মহামানবের এই সাগরতীরে। কারুর কোথাও কোনো তাড়া নেই। মনে হয়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে একটু বদলে বলে উঠি, ‘এই রাত যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলো তো!’

মুম্বাই বড় জীবন্ত শহর। প্রথম দর্শনে ভালো নাও লাগতে পারে। জ্যামে এই শহর ঢাকার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে। অদ্ভুত রকমের বৈষম্য এ শহরে বড় বেশি চোখে পড়ে। ফ্লাইওভার দিয়ে যেতে যেতে বিপুল বড়, পেল্লাই সব স্কাইস্ক্রাপার। আর তাকে ঘিরে ঘিঞ্জি বসতি। এশিয়ার সবচেয়ে বড় ধারাবি বস্তিতে আমি অনেকবার গেছি। ওখানে গেলেই আমার বন্ধু তরুণ অ্যাক্টিভিস্ট নীতিন মোরের কথা খুব মনে পড়ে। এস এ ডাঙ্গের পরে নীতিন মুম্বাই শহর সিপিআইয়ের সব থেকে কম বয়সী সেক্রেটারি হয়েছিল। নাসরিন নামে এক সুন্দরী বউ আর ফুটফুটে বাচ্চা নিয়ে চমৎকার সংসার। মুম্বাই গেলেই একবার না একবার ধারাবি গিয়ে আড্ডা না হলে আমাদের চলত না। গত বছর এক অ্যাক্সিডেন্টে নীতিন চলে যাওয়ার পর আর কখনো ধারাবি যাইনি।

সমুদ্রের ধার দিয়ে যেতে যেতে পেডর রোড আসতেই বিশাল উঁচু বাড়ি দেখিয়ে ক্যাব ড্রাইভার গর্ব করে আঙুল উঁচিয়ে জানিয়ে দিল, এই হচ্ছে আম্বানির প্রাসাদ। আধুনিক রাজার প্রাসাদে রাজা সাহেব ঢোকেন, বের হন গাড়ি নিয়ে নয়, ছাদের হেলিপ্যাডে হেলিকপ্টার তাকে নামিয়ে দেয়। মুম্বাইয়ের জ্যাম যাতে সাহেবের বিপত্তি না ঘটায় তাই এ ব্যবস্থা।

উত্তর প্রদেশের ক্যাব ড্রাইভারের তা নিয়ে গর্ব কম নয়। জৌনপুরীর যুবক কুড়ি বছর ধরে মুম্বাইয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন। এ শহর সম্পর্কে তার দরদ কম নয়। কসমোপলিটন এ শহর ভিন রাজ্যের লোককে সাদরে জায়গা দিয়েছে। মাঝেমধ্যে দাঙ্গা-ফ্যাসাদ হয় বটে, তবে তা সাময়িক। ওই যে বললাম মুম্বাই বড় বেশি জীবন্ত শহর। প্রথম দর্শনে ভালো না বাসলেও ধীরে ধীরে এ শহরের প্রেমে আপনি পড়বেনই।

প্রত্যেক শহরের নিজস্ব চরিত্র থাকে। মুম্বাই এরও আছে। এক তো এ শহরকে মায়ের মমতায় বেড় দিয়ে ঘিরে রেখেছে আরব উপসাগর। একসময়কার জেলে বসতি থেকেই এককালের সামান্য জনপদ থেকে বিরাট মহানগরীর জন্মবৃত্তান্ত হতেই পারে এক চলচ্চিত্রের বিষয়।

শনিবার, রবিবারের রাত পুরো মুম্বাই যেন রাস্তায় নেমে এসেছে। হোটেলে, পাবে, ছোট্ট রেস্তোরাঁ কোথাও তিলমাত্র পা রাখার জো নেই। তবুও আপনি যদি ফুডি বা ভোজনরসিক হন, তাহলে একবার কষ্ট করে কোলাবা ঘুরে আসুন। পুরনো পুরনো ছোটখাটো অজস্র শতবর্ষ পেরোনো খাবারের ঠেক। বড়ে মিঁঞা। লিওপল্ড, গোকুল, ক্যাফে মন্ডেগার এ রকম কত রেস্তোরাঁ। লিওপল্ড আরও বিখ্যাত হয়ে গেল কাসভের নেতৃত্বে টেররিস্ট অ্যাটাকের পরে। দুই হাজার আট সালের ওই হামলা এখনো চিহ্ন রেখে গেছে রেস্তোরাঁর গায়ে। বড়ে মিঁঞা তৈরি হয় ১৯৪৬ সালে। যতবারই সেখানে যাই বাইরের বোর্ডে জ্বলজ্বলে সালটা চোখে পড়ে। একটা প্রশ্ন মনে আসে, দেশভাগের আশঙ্কা তখনো কি মুসলিম মনে সেভাবে আসেনি! তারা কি ভেবেছিলেন যে মিছিল-মিটিং যতই হোক, বাস্তবে পাকিস্তান কখনো হবে না!!

মালাবার হিলসে মহম্মদ আলি জিন্নাহর বাড়ি দেখতে যাই। অদ্ভুত এক নৈঃশব্দ্য ওই পাড়ায় ঢুকলে অনুভব করি। দুধারে পার্সি স্থাপত্য। সমৃদ্ধ মহল্লা। অভিজাত মুসলিমদের অধিকাংশই কেন জানি না জিন্নাহ প্রশ্ন এড়িয়ে যান। বাড়ি কোথায় তা জিজ্ঞেস করলেও সবাই কেমন জানি না জানি না করে পাস কাটান। জিন্নাহর প্রাসাদোপম বাড়ির সামনে পুলিশের বিপুল নজরদারি। ভুতুড়ে বাড়ি এখন শত্রু সম্পত্তি। মাঝেমধ্যে সংঘ পরিবারের কেউ কেউ দাবি তোলেন ওই ‘দুশমনের’ বাসা ভাঙতে হবে।

জিন্নাহর মেয়ে দিনা কখনো পাকিস্তান যেতে চাননি। যানওনি। বিয়ে করেছিলেন ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পপ্রতিষ্ঠান বোম্বে ডাইংয়ের মালিককে। বাবার ওপর তীব্র অভিমান ছিল মেয়ের। তবুও শেষ বয়স পর্যন্ত মুম্বাইয়ে বাবার এই একমাত্র স্মৃতিটুকু ফেরত চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কোনো সরকারই শত্রু সম্পত্তি ফেরত দেননি। কাছেই এক বেঞ্চ। এক বুড়ো মুসলমান দেখিয়ে দিয়ে বললেন, আব্বার কাছে শুনতেন, গভীর রাতে মাঝেমধ্যে জিন্নাহ সাহেব এখানে এসে বসতেন। সামান্য দূরের সমুদ্র গর্জন কানে তালা লাগিয়ে দেয়। বেঞ্চ এখনো আছে। সমুদ্র আগের মতোই বয়ে চলেছে। শুধু দেশভাগের খলনায়ক বলে জিন্নাহর স্মৃতি এখন থেকেও নেই।

গভীর রাতে সমুদ্রতীর থেকে ফিরছি। বান্দ্রা, কুরলা, দাদর, চেম্বুর হয়ে অত্যাধুনিক ওয়ার্ডালা। বিশাল ঝাঁ চকচকে বহুতলের ১৬ তলায় আমাদের অস্থায়ী ডেরা। একদা এসব এলাকায় ছিল টেক্সটাইল মিলস।

মুম্বাই এক দিন ছিল বাম রাজনীতির গড়। এখানে এক দিন নৌ-বিদ্রোহ কাঁপিয়ে দিয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত। সেসব এখন আর আলোচনায় আসে না। চেষ্টা চরিত্তির করেও আপনি খুঁজে পাবেন না মহাবিদ্রোহের কোনো দলিল দস্তাবেজ। শুধু লোয়ার পারেল ও অন্যান্য রাস্তায় একা একা হাঁটতে হাঁটতে মনে হবে এক দিন এসব রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ নেমে এসেছিলেন নৌ-বিদ্রোহীদের সমর্থনে। যতই অস্বীকার করার চেষ্টা হোক না কেন, মনে পড়বে সাধারণ নাবিকরাই আমাদের শিখিয়েছিলেন, শোষণের বিরুদ্ধে কখনো আপস করতে নেই। লড়াই চলতেই থাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। শুধু তার পরিপ্রেক্ষিত আর আঙ্গিক পাল্টে যায়।

লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত