চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি এলাকায় বিএম কনটেইনার ডিপোতে গত শনিবার রাত ৯টার দিকে আগুন লাগে। সেখানে সংরক্ষিত হাইড্রোজেন পার অক্সাইড কনটেইনার বিস্ফোরণ হয়। গতকাল রবিবার বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত কেন্দ্র থেকে তাপপ্রবাহের সরাসরি ব্যাপ্তি ছিল চট্টগ্রামের উত্তর-পূর্ব দিকে আড়াই বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত। তখন বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২২ কিমি। বিকেল সাড়ে ৫টার পর বাতাসের গতিবেগ কমে ১৮ কিমিতে নেমে আসে। সেই সঙ্গে গতি কিছুটা পরিবর্তন করে তাপপ্রবাহ বিপজ্জনকভাবে ডান দিকে, অর্থাৎ চট্টগ্রামের দিকে সরে যাচ্ছিল। তবে তাপপ্রবাহের পরোক্ষ প্রভাব ১০ বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আর্থ জুমের স্যাটেলাইট ইমেজ বা ছবি বিশ্লেষণ করে দেশ রূপান্তরকে তাপপ্রবাহের গতিপথের সর্বশেষ তথ্য জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওগ্রাফি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের শিক্ষক ও গবেষক ড. নন্দন মুখার্জি।
এই গবেষক সর্বশেষ গতকাল রবিবার বিকেল সাড়ে ৫টায় যুক্তরাজ্যের ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে টেলিফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সকালে যখন বিশ্লেষণ করা শুরু করলাম, তখন গতিপথ যেদিকে ছিল, সেটা এখন (বিকেল সাড়ে ৫টা) তা থেকে ডান দিকে সরে যাচ্ছে। ডান দিকে সরে যাওয়া বিপজ্জনক। কারণ সে ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম শহরের দিকে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।’
সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়িতে বিএম কনটেইনার ডিপোতে আগুনের তাপপ্রবাহের গতিবিধি প্রসঙ্গে এই গবেষক বলেন, ‘আমরা দেখছি, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে বাতাসের গতিবেগ আসছে, অর্থাৎ এটা উত্তর-পূর্ব দিকে যাচ্ছে। ম্যাপ দেখলে দেখবেন, ওখানে লেখা আছে এসএসডব্লিউ, অর্থাৎ দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে এসে এটা উত্তর-পূর্ব দিকে যাচ্ছে; অর্থাৎ এর মধ্যে আছে কুমিরা, বারবকুণ্ড, মাধবকুণ্ড, সীতাকুণ্ড-এই অংশটা বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে আছে। আগুন কিন্তু ছড়াচ্ছে না, ছড়াচ্ছে তাপপ্রবাহ। মাধবকুণ্ড ও সীতাকুণ্ড এটা ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া বা প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা। সুতরাং এখানে এই পরিমাণ তাপপ্রবাহ হলে পরিবেশের ভয়ানক ক্ষতি হবে। এটাই ভয়ের কারণ।’
এই গবেষক বলেন, ‘কেন্দ্র থেকে আড়াই বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত তাপপ্রবাহের সরাসরি ব্যাপ্তি দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু পরোক্ষভাবে এটার প্রভাব ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকার মানুষ উপলব্ধি করবে।’
এ ধরনের রাসায়নিক দ্রব্যের বিস্ফোরণে পরিবেশে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে জানতে চাইলে ড. নন্দন মুখার্জি বলেন, ‘এটা একটা কেমিক্যাল ফায়ার। এটার দুর্গন্ধ এবং ধোঁয়া দুটো জিনিসই খারাপ। এটা যদি বন পোড়া গন্ধ হতো, তাহলে কার্বন মনোক্সাইড থাকত। সেটাও ক্ষতিকর। কিন্তু এখানে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড পুড়ে হচ্ছে। এই কেমিক্যালের ধোঁয়া বেশ বিষাক্ত ও দুর্গন্ধযুক্ত। এলাকার লোকজন বলছে, তারা দুর্গন্ধ পাচ্ছে। নাক-মুখ ঢেকে চলাচল করছে।’
তবে মানুষের ওপর এর স্বাস্থ্যগত প্রভাব কী হবে, সেটা এখনই বিচার করার মতো পরিস্থিতি আসেনি বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘আমরা সেটা এখনো বলতে পারছি না। কারণ গতিবিধি কোন দিকে যাচ্ছে, সেটার ওপর নির্ভর করবে এর প্রভাব।’
ড. নন্দন মুখার্জি বলেন, ‘পরিবেশের বড় ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতিরিক্ত উত্তাপে ও কেমিক্যাল দূষণে গাছপালার পাতা পড়ে যাবে, গাছ মারা যাবে। এটা যদি শুকনো সময়ে হতো বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি ও জ্যেষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি সময়ে হতো, তখন আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকত। এখন যেহেতু বৃষ্টি হচ্ছে, সেই আশঙ্কাটা আমরা খুব বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি না। প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হওয়ায় তাপপ্রবাহ ভীষণ রকম ক্ষতি করবে।’
অবশ্য পরিবেশে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের দুর্গন্ধ ও কেমিক্যাল দূষণসম্পন্ন তাপপ্রবাহের নেতিবাচক প্রভাব কত দিন স্থায়িত্ব হতে পারে, সেটা নির্ভর করছে কত দ্রুত আগুন নেভাতে পারে। যত দ্রুত আগুন নেভাবে, তত তাড়াতাড়ি নেতিবাচক প্রভাব কমে যাবে। বলেন এই গবেষক।
তাপপ্রবাহের গতিবিধির শেষ পর্যবেক্ষণ করে ড. নন্দন মুখার্জি বলেন, একটা ভালো খবর হচ্ছে, জুম ম্যাপের ডেপথ দেখে বোঝা যাচ্ছে, সকালে তাপপ্রবাহের যে মাত্রা ছিল, সেটা এখন (বিকেল সাড়ে ৫টায়) কমছে। বাতাসের গতিবেগও ঘণ্টায় ২২ কিমি থেকে কমে ১৮ কিমিতে নেমে এসেছে।
অবশ্য কিছুটা আশার কথা শুনিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. অলক পাল। তিনি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তবে আশার কথা, যেখানে বিস্ফোরণ হয়েছে, সেটা উপকূল এলাকা। সেখানে প্রচুর পরিমাণ সমুদ্র বায়ু আসা-যাওয়া করে। সন্দ্বীপ মোহনার জায়গা। পাশেই পাহাড়। সে কারণে প্রভাবটা দীর্ঘমেয়াদি না-ও থাকতে পারে।’
এই বিশেষজ্ঞ শিক্ষক বলেন, ‘সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি এলাকায় বিএম কনটেইনার ডিপোতে আগুনের ঘটনার মধ্য দিয়ে দেখা যাচ্ছে, আমাদের কিছু ফ্যাক্টর খুবই অরক্ষিত আছে। এগুলোর দিকে নজর দিতে হবে; বিশেষ করে রাসায়নিক দ্রব্য স্থানান্তর, সংরক্ষণ এগুলো আমাদের আরও বেশি দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে।’
সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণের শব্দ এতটাই প্রকট ছিল যে সেই শব্দ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হলের শিক্ষার্থীরাও শুনতে পেয়েছেন বলে জানান ড. অলক পাল। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও যেখানে আগুনের ঘটনা ঘটেছে সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ির দূরত্ব ৭-১০ কিলোমিটার। আমাদের ছাত্রছাত্রীরা যারা গত শনিবার রাতে হলে ছিল, তারা বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছে। শব্দের কম্পন অনুভব করেছে। কিন্তু তাপ খুব বেশি হলে ২-৩ কিমি এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
পরিবেশে কেমিক্যাল বিস্ফোরণের প্রভাব প্রসঙ্গে ড. অলক পাল বলেন, ‘হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড সংরক্ষিত ছিল, সেটা যখনই আগুনের সংস্পর্শে এলো, ধোঁয়া এলো, প্রচুর পরিমাণ গ্যাস ছড়িয়ে পড়ল, সেটার নেতিবাচক প্রভাব তো স্থানীয় পরিবেশে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রভাবটা কী রকম হতে পারে, সেটা এখনই বলা যাচ্ছে। জলজ প্রাণী ও মাছ, অথবা গাছপালাতে একটা প্রভাব থাকতে পারে। এ ধরনের রাসায়নিক দ্রব্যের বিস্ফোরণে অনেক ধরনের প্রভাব আছে; বিশেষ করে আশপাশে যে জনবসতি আছে, সেখানে বাচ্চাদের স্বাস্থ্য, নারী ও বয়স্ক মানুষের স্বাস্থ্যগত প্রভাব আসতে পারে।’
