ডেফিসিট ও সারপ্লাস : অসনাতন আলোচনা

আপডেট : ০৬ জুন ২০২২, ১০:২৯ পিএম

বাজেট মাসে যে সব উদ্ধৃতি শুনে মনটা আনচান করে ওঠে, এমন দু-একটা না শোনালেই নয় : ১. আপনার স্ত্রীকে বাজেট শিক্ষা দিতে হলে তার বাজার খরচের ৩৩ শতাংশ আগেই রেখে দিন। (যদি স্ত্রী না থাকে তা হলে পি কে হালদার মডেল অনুসরণ করুণ, তিন বান্ধবীকে হাজার কোটি টাকা জোগাড় করে দিন, তারাই আপনার অবশিষ্ট বান্ধবীদের বাজেট শিখিয়ে দেবে।)

২. জে পল গেটি বলেছেন, আপনি যদি ব্যাংক থেকে এক হাজার টাকা ঋণ নিয়ে থাকেন, এটা আপনার সমস্যা, যদি একশ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে থাকেন এটা ব্যাংকের সমস্যা। পল গেটি যা বলেননি তা হচ্ছে, যদি এক হাজার কোটি টাকা নিয়ে থাকেন এটা জাতির সমস্যা (আপনিও বেঁচে গেলেন, ব্যাংকও বেঁচে গেল! পল গেটি অবশ্য টাকা কিংবা রুপি বলেননি, বলেছেন ডলার। হাজার কোটি টাকা হাপিস করে দিয়ে যারা জাতিকে সমস্যা উপহার দিয়েছেন তারা তো বলতেই পারেন, এ তো ‘পিনাট’, এ নিয়ে মাতামাতি করার কী আছে?)

৩. অস্কার ওয়াইল্ড বলেছেন, কেবল হতাশাবাদীদের (পেসিমিস্ট) কাছ থেকে ঋণ নিন, তারা এ টাকা ফেরত পাওয়ার প্রত্যাশা করেন না। (কিন্তু তারা কারা? বাংলাদেশের বেলায় ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ড এবং জ্যেষ্ঠ ব্যাবস্থাপকরা। তাদের মধ্যে যারা কম হতাশাবাদী ঋণটা নিজেরাই নিয়ে নেন আর ভাবেন দুদিনের দুনিয়া টাকাপয়সা রেখে আর কী হবে!)।

৪. জ্যাকি ম্যাসন লিখেছেন, টাকাটাই পৃথিবীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, আসল জিনিস হচ্ছে ভালোবাসা আর সৌভাগ্যবশত আমি টাকাকেই ভালোবাসি। (সর্বনাশ করেছে এই ভালোবাসা, পি কে হালদারের ভালোবাসা সংখ্যাগত আর গুণগত দিক দিয়ে যত বেড়েছে ব্যাংকের ভল্ট তত খালি হয়েছে।)

৫. হলিউড হার্টথ্রব মে ওয়েস্ট বলেছেন, শুধু দারিদ্র্য আর দাঁতব্যথা ছাড়া ভালোবাসা সবকিছু জয় করতে পারে। (দাঁতের ব্যথার কাছে যে অ্যানুয়াল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম আর পঞ্চশালা পরিকল্পনা অর্থহীন এটা বুঝেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন দাঁতের ব্যথায় ভুগছেন একজন দার্শনিক।)

মোল্লাজির সারপ্লাস মডেল

বাজেট মাসে টাকাপয়সা নিয়ে একদম চিন্তা করবেন না। হাতে দশ টাকা আছে তো বেশ, এতেই হয়ে যাবে, টাকা বেঁচেও যাবে, শুধু মোল্লা নাসিরউদ্দিন বা নাসিরউদ্দিন হোজ্জার মডেলটি অনুসরণ করুন। বহুদিন বেকার থাকার পর মোল্লা নাসিরউদ্দিন খেয়া নৌকার মাঝির কাজটি পেয়ে গেলেন। কিন্তু নৌকা চালানোর কায়দাকানুন তখনো তার পুরো রপ্ত হয়নি।

দশজন অন্ধ লোকের একটি দল খেয়াঘাটে এসে পৌঁছে। মোল্লার সঙ্গে দর-কষাকষির পর ঠিক হলো ওপারে পৌঁছে দিলে জনপ্রতি এক টাকা করে মোট দশ টাকা তাকে দেওয়া হবে। এক পয়সা কমও নয়। মোল্লাজি দরিয়ায় নৌকা ভাসিয়ে দিলেন। বইঠায় পারদর্শী না হওয়ায় নৌকা দুলতে থাকে। মাঝ নদীতে দুলুনি বেড়ে যায়। অন্ধ যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। স্রোতের তোড়ে নৌকা যখন বেসামাল একজন যাত্রী টুপ করে পানিতে পড়ে গেল। কী হলো? কী হলো? অন্য যাত্রীরা জিজ্ঞেস করল। মোল্লাজি দেঁতো হাসি হেসে বললেন, সব ঠিক আছে। আমরা তীরের কাছাকাছি এসে গেছি। সহিসালামতে আপনাদের ওপারে পৌঁছে দিতে পারলে আমাকে ৯ টাকা দিলেই চলবে। আপনাদের একটি টাকা বাঁচিয়ে দিলাম।

চ্যান্সেলর অব এক্সচেকার মডেল

স্কটিশের কিপ্টেমি দুনিয়াশুদ্ধ সবাই জানে। এ নিয়ে গল্পের এবং সত্যি কাহিনীর শেষ নেই। স্থানীয় রাজনীতিতে বেশ নাম কামাই করা এক স্কটিশ যুবক লন্ডনে এসে প্রথমেই গেল সোহার একটি পতিতালয়ে। লন্ডনে কেউ তাকে চেনে না, পেছনে ফেউ লাগার সম্ভাবনা নেই।

নাম-ঠিকানা ধরে একটি সুন্দরী যৌনকর্মীকে খুঁজে নিল। তাকেই চাই। লিজ মানে এলিজাবেথ তার নাম। লিজের সঙ্গে গোটা রাতটাই কাটাতে চায় আর্থার। খানিকটা দর-কষাকষিও করল। রাতের খাবার এবং কড়া পানীয় আনানোর জন্য লিজকে পঞ্চাশ পাউন্ড দিল, গল্প-গুজবে ভালোই কাটল রাতটা। বিদায় নেওয়ার সময় নির্ধারিত একশ পাউন্ড দিল। পঞ্চাশ পাউন্ড টিপসও দিল, যা স্কটিশ চরিত্রের সঙ্গে সম্পূর্ণ বেমানান। লিজ নিজেও স্কটিশ। এমন একটা উদার স্কটিশ যুবকের দেখা পাওয়া ভাগ্যের কথা। লিজ তার ঠিকানা চাইল। যুবক তার এডিনবরার ঠিকানা লিখে দিলে লিজ বলল, তার বাবাও একই রাস্তায় থাকে। যুবক বলল, সে লন্ডনে আসছে জেনে লিজের বাবাই মেয়েকে দেওয়ার জন্য আড়াইশ পাউন্ড দিয়েছে। আমার আসা-যাওয়ার খরচ বাবদ পঞ্চাশ, খাবার ও পানীয়ের পঞ্চাশ, টিপস পঞ্চাশ, মোট দেড়শ আর একশ পাউন্ড তোমার চার্জ। মোট আড়াইশ পাউন্ড। হিসাব মিলেছে তো?

লিজ তখন থ হয়ে আছে। যুবক আবার বলল, হিসাব মিলছে?

শোনা যায় এই যুবক এককালে ব্রিটেনের চ্যান্সেলর অব এক্সচেকার (দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর অর্থমন্ত্রী আর কি!) হয়েছিলেন। (খুবই প্র্যাকটিক্যাল অ্যাপ্রোচ! তিনি টাকা পাবেন কোথায়? এখান থেকে ওখান থেকে টেনেটুনে সময়টা পার করাই সাফল্য।)

বাজেট অধিবেশনে ঘুমের রেওয়াজ

নিন্দুকেরা ওত পেতেই ছিলেন এবারের বাজেটটা আষাঢ় মাসে পেশ হলেই গলা ফাটিয়ে বলতেন এটা আষাঢ়ে বাজেট! ভাগ্যিস বাজেটটা জ্যৈষ্ঠ মাসেই পেশ হচ্ছে, এখন আষাঢ়ে বলার কোনো উপায় নেই। বাজেট সুখপাঠ্য কোনো রোমাঞ্চকর ফিকশন কিংবা থ্রিলার নয়। আমার ধারণা বাজেট পড়ে, কিংবা মন্ত্রীদের একঘেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে পাঠ করা বাজেট শুনে আমার মতো আনন্দ না পাওয়া পাঠক ও শ্রোতার সংখ্যাই বেশি, এমনকি সে সময় ক্লান্ত মন্ত্রী ও এমপিদের কেউ কেউ জবর একটা ঘুম দিয়েও থাকেন, এটা দোষের কিছু নয়, হাউজ অব কমন্স ও লর্ডস-এও ঘুমের প্রতিযোগিতা চলে।

বাজেটের মুখস্থ সমালোচনা

বাজেটে যেমন সৃজনশীলতার ঘাটতি থাকে (এটি কি উপন্যাস বা মহাকাব্য নাকি?) সমালোচনাতে তাই। পঞ্চাশ বছর ধরে বাজেটের অমনোযোগী পাঠক ও শ্রোতা হয়েও বাজেটের যেসব সমালোচনা শুনেছি তার একটি সারসংক্ষেপ তুলে ধরছি :

এ বাজেট গরিব মারার বাজেট/এ বাজেট বৈষম্য বাড়ানোর বাজেট/এ বাজেটে রাষ্ট্রীয় মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক/এ বাজেটে মধ্যবিত্ত উপেক্ষিত/এ বাজেট রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত/এ বাজেট সামরিক ও বেসামরিক আমলা তোষণের বাজেট/এ বাজেট দেউলিয়া অর্থনীতির সাক্ষী/এ বাজেটে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নেই/এ বাজেট অর্থনীতি ধ্বংসের বাজেট/এ বাজেট ভারসাম্যহীন বাজেট/এ বাজেটে সাধারণ ভোটার প্রতারিত/এ বাজেট উচ্চাভিলাষী, ইউটোপিয়ান/এ বাজেট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হবে/এ বাজেটে কৃষি খাত সবচেয়ে অবহেলিত (কৃষির জায়গায় স্বাস্থ্যসহ যেকোনো খাতের নাম বসিয়ে দেওয়া যায়)/এ বাজেট উৎপাদনবিমুখ বাজেট/এ বাজেট স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা কায়েমের বাজেট/এ বাজেটে ঘাটতি মোকাবিলার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই/এ বাজেট মানি লন্ডারিং উৎসাহিত করার বাজেট।

এ ধরনের অন্তত পঞ্চাশটি পয়েন্টের কথা বাজেটের একটি পৃষ্ঠাও না পড়ে বলে দিতে পারেন এবং নিশ্চিত থাকতে পারেন কেউ আপনার বক্তব্য চ্যালেঞ্জ করবে না।

পুনরুদ্ধারের বছর

পৃথিবীজুড়েই ২০২২ সাল চিহ্নিত পুনরুদ্ধারের বছর বা দি ইয়ার অব রিকভারি হিসেবে। এক এক দেশের খাদে পড়া অর্থনীতি এক একভাবে বাউন্স করে ওপরে উঠে আসবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি যতটা খাদে পড়বে বলে মনে হয়েছিল, তা হয়নি, বৈশ্বিক স্থবিরতার মধ্যেও বাংলাদেশের অবস্থা বৈশ্বিক গড় অবস্থার চেয়ে ভালো ছিল। করোনার আঘাতটি শতবর্ষের বৃহত্তম, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন একদিকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা যেমন প্রকাশিত হয়েছে, তেমনি অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে টিকা আবিষ্কার আগামী দিনের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার একটি বিস্ময়কর দিকও উন্মোচিত করেছে।

পৃথিবীতে শনাক্তকৃত কভিড রোগী এ পর্যন্ত ৫৩ কোটি ২০ লাখের বেশি। মৃতের সংখ্যা ৫৩ লাখ ছাড়িয়ে। সর্বোচ্চ মৃত্যুর তিনটি দেশ হলো যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও ব্রাজিল। ভারতের গায়ে গায়ে লাগা দেশ হয়েও আমারই নেইমসেক একজন মন্ত্রীর ভাষায় সম্পর্কটা স্বামী-স্ত্রীর মতো (তিনি নিজেকে স্বামীর ভূমিকায় কল্পনা করেছেন না স্ত্রীর ভূমিকায় তা অবশ্য স্পষ্ট করে বলেননি।) হওয়ার পরও বাংলাদেশের কভিড-সাড়া অন্তত ভারতের চেয়ে যে ভালো সে কথা অনস্বীকার্য। কভিডের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট যখন থিতিয়ে আসছে বলে পৃথিবী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে, তখনই অধিকতর সংক্রামক অমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট দ্রুততার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল। বিশেষজ্ঞরা আশ্বস্ত করেছিলেন, অমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট ডেল্টার মতো সংক্রামক নয়, এর ধরনটা ‘মাইল্ড’। এটাও বাংলাদেশ সামলে উঠেছে। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা শ্রীলঙ্কা সিনড্রৌমের ভয় না দেখালেও ইঙ্গিত তো দিয়েছেন। আপনি বলেই দিতে পারেন, আরে ধ্যাত, কোথায় আগরতলা আর কোথায়...।

বাজেটের টাকা বারোভূতে খায়

একসময় অর্থবাজারের ডিপ্রেশন কেটে যাবে। ডিপ্রেশন যদি চলতেই থাকে অসুবিধে নেই, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, তালেবানি সম্প্রসারণবাদ এবং রাজাকার-আলবদর সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে একটা সারগর্ভ বক্তৃতা দিয়ে কস্ট-কাটিং-এর দোহাই দিয়ে নিজেকে লকডাউনে রাখুন। বছর দু-এক আগে বাজেট মৌসুমে দেশ রূপান্তরেই একজন প্রয়াত অর্থমন্ত্রীকে স্মরণ করেছিলাম, তাই আবার তুলে ধরছি, কারণ এবারের বাজেটে ভূতের জন্য কোনো বরাদ্দের আভাস এখন পর্যন্ত নেই।

বাংলাদেশ সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী প্রয়াত সাইফুর রহমান বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, বাজেটের টাকা বারোভূতে খায়। বারোভূতের আভিধানিক মানে নানা বা বহু অবাঞ্ছিত ব্যক্তি। আর ভূত বিশেষজ্ঞদের মতে বারোভূত মানে এক ডজন ভূত। ভূত গবেষকরা অর্থমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়েছেন, কারণ তিনি বাংলাদেশে ভূতের অস্তিত্ব স্বীকার করেছেন এবং অন্তত বারোটি ভূত বাজেটের টাকার ভাগ পায় এ-কথা নিজে মেনে নিয়েছেন। বাজেট একটি ধারাবাহিকতা এবং দেশে ভূতের সংখ্যা বারোর কম বা বেশি যাই হোক, এবারও যেহেতু কম-বেশি কিছু ভূতের পেটে যাবে (না খেলে ভূত বাঁচবে কেমন করে?)। ভূতের জন্য বাজেটে কত বরাদ্দ রাখা হবে অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করেও তা বের করা দুঃসাধ্য হয়ে উঠবে।  বিশেষজ্ঞরা বলেন, ছারপোকা, মশা কিংবা জোঁকের জন্য যেমন শরীরে রক্তের আলাদা কোনো বরাদ্দ থাকে না, ভূতের বেলায়ও তাই। বাজেটে ভূতের খাবার কিংবা ভূতের আবাস কিংবা ভূত লালন-পালন নামের কোনো খাত-উপখাত থাকে না। ভূতেরা ঠিকই তাদের হিস্যা আদায় করে নিতে জানে। সাবেক অর্থমন্ত্রী যে বারোভূতের কথা বলেছেন তারা রোমাঞ্চকর উপন্যাস কিংবা থ্রিলার পড়ে না, বাজেটই তাদের প্রিয়পাঠ্য।

লেখক : সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত