‘ইনি কে?’
‘উনি সম্মানিত এমপি।’
‘এমপি কী?’
‘এমপি মানে... আরে বুঝতে পারছো না... বিরাট ব্যাপার।’
খুব বিরাট ব্যাপার বলে অবশ্য মনে হলো না। সাদামাটা চেহারার একজন মানুষ। মধ্যবয়সী মধ্যবিত্ত ধরনের মানুষের মুখ যেমন হয় আর কি। তখনকার সময় গোঁফ রাখা ছিল যুবকদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকতা, প্রচলিত ধরনের পুরু গোঁফের সঙ্গে একটা টাকও আছে। সাধারণ পাজামা-পাঞ্জাবি আর বাটার স্যান্ডেল মিলিয়ে বিশেষত্ব নেই বিশেষ। কিন্তু লোকটাকে সবাই খুব মর্যাদা দিচ্ছে। পাশে পুলিশের পোশাক পরা একজন, আর তখন এমপিকে না চেনা বয়সে পুলিশই আমাদের কাছে সবচেয়ে ক্ষমতাধর-ভীতিকর এবং গুরুতর মানুষ। এর চেয়েও এই সাধারণ মানুষটাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়াটাকে খুব বেমানান লাগছিল বলেই প্রশ্নটা করা। সেটা এরশাদ সরকারের আমল। তখন কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে এমপিরা এ রকমই ছিলেন। সাদামাটা। সহজলভ্য। আমি একজন এমপিকে সে সময় সাইকেলের পেছনের ক্যারিয়ারে চড়তে দেখেছি। আরেকজনকে এক দিন দেখলাম, রাস্তার মুড়ি-চানাচুর কিনে খাচ্ছেন। তাতে লবণ বা মরিচ কিছু একটা কম দেওয়ায় আবার চেয়ে নিলেন।
এবার আরেকটা কাহিনী। এটা মাত্র কয়েক বছর আগের। মানে তুমুল গণতন্ত্রের যুগের। একটা জেলা শহরে কাজে গিয়েছি। দুপুর বেলা রাস্তায় রিকশার জ্যাম। আর রিকশা ড্রাইভাররা অকথ্য কথাবার্তা বলছে। শুনে মানুষটাকে জানতে কৌতূহল হলো। জানা গেল, ইনি এলাকার মাননীয় সংসদ সদস্য। মাসে-দুই মাসে একবার আসেন। এসে এ রকম জ্যাম লাগিয়ে গালমন্দ খেয়ে যান। নেমে হেঁটে একটু এগিয়ে দেখি বাচ্চাদের লম্বা লাইন। বোঝা গেল, মহোদয়কে স্বাগত জানাতে এদের দাঁড় করানো হয়েছে। বাচ্চারা গালাগাল করতে পারে না, তবু কচি মুখগুলোর বেদনার মধ্যে যে ক্ষোভের ছবি সেটা আমাদের এমপি-মন্ত্রীরা কোনো দিনও বুঝবেন না।
সাংবাদিক হিসেবে গেছি বলে রাতের বেলা তার বাসায় আমন্ত্রণ। গিয়ে মনে হলো, ভুল করে রামগোপাল ভার্মার আন্ডারওয়ার্ল্ড ছবির সেটে এসে পড়লাম নাকি! বাসা তো নয় যেন বিলাসী প্রাসাদ। আর গেট থেকে শুরু করে সব জায়গায় প্রহরী বা ঘনিষ্ঠ লোক হিসেবে যাদের দেখা যাচ্ছে এদের কারও চেহারাতেই স্বাভাবিকতা নেই। তিনি অবশ্য কথাবার্তায় খুব আন্তরিকতা দেখালেন। এই এক ব্যাপার। যত বড় অপকর্মকারী, তাদের কাছে সাংবাদিকদের তত বেশি তোয়াজ। আশপাশ থেকে অবশ্য আওয়াজ ভেসে আসছে, ‘ধমুককে খেয়ে দে..., তমুককে ধরে আন...।’
বেরিয়ে আধো অন্ধকার রাস্তায় একটাই কথা মনে হলো। আমাদের এমপিরা কী ছিলেন আর কী হলেন! আগে থাকতেন মানুষের মনে। এখন থাকেন মানুষের যন্ত্রণায়। ছিলেন বিপদের ভরসা। এখন বিপদ ঘটানোর বিভীষিকা। হঠাৎ করে এই তুলনামূলক স্মৃতিতে যাচ্ছি কেন? দেশ রূপান্তরে একটা খবর বেরিয়েছে, তাদের ৯০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। একেকজন ৩০ লাখ টাকা করে পাবেন এবং সেটা এ মাসের মধ্যেই খরচ করতে হবে। কারণ, আরও মজার। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা এবং করোনা প্রতিরোধ। ঠিক পড়েছেন, করোনা প্রতিরোধ।
এখন করোনা মোটামুটি সর্দি-কাশির স্তরে নেমে এসেছে, ১৬ কোটির মধ্যে ৪০-৫০ জন রোগী হয়তো দিনে, তখন করোনা ঠেকানোর প্রশ্ন যে কোত্থেকে আসে! ও, হ্যাঁ, যদি করোনা রোগী খুঁজে বের করার কাজ হয় তাহলে ঠিক আছে! হারিকেন-টারিকেন জ্বালিয়ে দেখতে হবে। এর জ্বালানি-কেরোসিনের খরচ আছে! আর ভরা করোনার সময় যাদের বেশির ভাগ কোয়ারেন্টাইন পালন করেছেন অক্ষরে অক্ষরে, এই শেষ সময়কালে বিদায়ী গান শোনানোর এমন আয়োজন কেন? আমাদের পত্রিকারই কিছুদিন আগের খবর, পৌরসভাতেও উপদেষ্টা হয়ে ঢুকতে চান তারা। আসলে সবই চান। শুধু মূল যে কাজ, আইনপ্রণয়ন, সেখানে খুঁজে পাওয়া যায় না।
সংসদীয় কমিটির ১২৮টি সভার মধ্যে মাত্র দুটোতে সব সদস্য উপস্থিত ছিলেন। সংসদে উপস্থিতির ক্ষেত্রেও লজ্জাকর পরিসংখ্যান। এই কয়েক বছরে ৫-৭ দিন মাত্র গেছেন এমন এমপিও আছেন। সিংহভাগই কাজে নেই। আছেন শুধু অকাজে। কেন এই পতন ইতিহাসে গিয়ে একটু বোঝার চেষ্টা করি। এরশাদ পতনের পর ১৯৯১ সালে প্রথম নির্বাচন। আওয়ামী লীগ আন্দোলনে এগিয়ে ছিল, সাংগঠনিক শক্তিতেও এগিয়ে, ফলে ক্ষমতায় যাওয়া ছিল এক রকমের স্বাভাবিক বিশ্বাস। আওয়ামী লীগের নেতার অভাব ছিল না, মনোনয়ন নেওয়ার ছিল লম্বা লাইন। ওদিকে বিএনপিতে অনেক জায়গায় লোকই নেই। সেই শূন্যতা পূরণে তারা নামি ব্যবসায়ী-ক্ষমতাওয়ালা মানুষদের এক রকম ভাড়া করল। লড়াইয়ে প্রথম পক্ষের জেতার কথা কিন্তু আওয়ামী লীগের অতি বিশ্বাস, কিছু অবিশ্বাস্য অপপ্রচার, ছাত্রদলজনিত তারুণ্যের শক্তি মিলিয়ে বিএনপি জিতে গেল। আর আওয়ামী লীগের বিশ্বাসটা টলে গেল। তাদেরও মনে হলো, নির্বাচন জেতাতে ত্যাগী নেতা নয়, দরকার টাকাওয়ালা ব্যবসায়ীর।
একটু খেয়াল করলে দেখবেন, ঢাকা শহরে ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোজাফফর হোসেন পল্টু, মোস্তফা জামাল মহিউদ্দিন, ড. কামাল, সাজেদা চৌধুরী, সাহারা খাতুনরা, সঙ্গে দুটো আসনে শেখ হাসিনা। ১৯৯৬ সালের প্রার্থী হচ্ছেন, এইচবিএম ইকবাল, সাবের হোসেন চৌধুরী ও কামাল মজুমদাররা। মানে আওয়ামী লীগও যাকে দিয়ে সম্ভব জেতার লাইনে। বিএনপি আগে থেকেই সেই লাইনে, আওয়ামী লীগও যোগ দেওয়ায় পরের ২০-২২ বছর এই লাইনেই এগিয়েছে গাড়ি। আর তাতে নীতিহীন ব্যবসায়ী, দাপুটে, মারদাঙ্গারা দিনকে দিন আশকারা পেয়ে পেয়ে আজকের এই এমপিরা সবখানে। এর মধ্যেও কিছু ভালো মানুষ জিতেছেন। কিন্তু দিন গিয়েছে আর এরা সংখ্যায় কমেছেন। যোগ্য প্রার্থী আন্দোলন-ওয়ান ইলেভেনের সংস্কার চেষ্টা কিছুতেই কিছু হয়নি। সংসদীয় গণতন্ত্রের এটা একটা অসুবিধার দিক যে সরকারে যেতে হলে বেশি আসন জিততে হবে। কাজেই যে জিততে পারে তারই কদর।
এক বড় নেতা ঘরোয়া আলোচনায় দুঃখ করে বলছিলেন, ‘আমরা কি সাধে এদের মনোনয়ন দিই। কিন্তু উপায় নেই। ভালো মানুষরা জেতে না। জেতার জন্য টাকা লাগে, শক্তি লাগে। কাজেই এদেরও লাগে।’ ও, হ্যাঁ, মাঝখান দিয়ে আরেকটা উপদ্রব তৈরি হয়েছিল। উত্তরাধিকার। নেতা মারা গেছেন, তার ছেলে বা স্ত্রী তাকে দাও। কান্নাকাটি করে আর বাবার স্মৃতির জোরে জিতে যাবে। জিতে যায়ও। আর এই ফর্মুলায় সত্যিকারের রাজনীতিকরা পেছন থেকে পেছনে যাচ্ছেন। সামনে তারা যারা ‘যা পাই তা-ই হাত পেতে নেই’ স্কুলের একান্ত বাধ্য ছাত্র।
যত শুনবেন তত লজ্জা লাগবে। তার চেয়ে বরং একটা রসিকতা শুনি। ছেলে কী হবে জানার খুব কৌতূহল বাবার। এক জ্যোতিষ বলল, ছেলের ঘরে একটা ধর্মগ্রন্থ রাখবেন, পাশে পিস্তল, তার পাশে টাকা, তার পাশে মদের বোতল। যদি সে ধর্মগ্রন্থ হাতে নেয় তাহলে সৎপথে চলবে। যদি পিস্তল নেয় তাহলে হবে মাস্তান। টাকা নিলে হবে ব্যবসায়ী আর মদের বোতল নিলে দুশ্চরিত্র। বাবা কথামতো সেসব জিনিস রেখে খুব কৌতূহলে দেখতে থাকলেন ছেলে কী করে? ছেলে ঘরে ঢুকে ধর্মগ্রন্থটা বুকে নিয়ে এক ঢোক মদ খেয়ে পিস্তলটা পকেটে ঢুকিয়ে টাকা গুনতে শুরু করল। বাবা বুঝতে না পেরে গেলেন জ্যোতিষীর কাছে। জ্যোতিষী বললেন, ‘এর মানে হলো আপনার ছেলে হবে রাজনীতিবিদ। নেতা। সব করবে।’
আমাদের এখনকার কোনো কোনো এমপির সঙ্গে মিল পাওয়া যায় না! সব করেন। সবকিছু গিলে ফেলেন। আরেকটা গল্প। এক পকেটমার নেতার পকেটে হাত দিয়েছে। নেতা ধরে ফেলে চিৎকার করলেন, ‘তোমার লজ্জা করে না একজন নেতার পকেটে হাত দিতে।’ পকেটমার আরও জোরে চিৎকার করে বলে, ‘আর আপনার লজ্জা করে না এতবড় একজন নেতা হয়ে খালি পকেটে ঘুরে বেড়াতে। একটাও পয়সা নেই। একেবারে ফকির-ফাকড়া নেতা।’ আমাদের এখন এ রকম সাধারণ-দরিদ্র নেতাই দরকার। নিঃস্ব নেতারাই বোধহয় দূর করতে পারবেন আমাদের রাজনীতির নিঃস্বতা।
লেখক সাংবাদিক ও লেখক
