হাতিরঝিলে গণমাধ্যমকর্মীকে গলা কেটে হত্যা

আপডেট : ০৯ জুন ২০২২, ০২:২০ এএম

রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকা থেকে মো. আবদুল বারী (২৭) নামে এক গণমাধ্যমকর্মীর লাশ উদ্ধার হয়েছে। গতকাল বুধবার সকাল ৭টার দিকে পুলিশ কনকর্ড প্লাজার উল্টো দিকে লেকের পাশ থেকে তার ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। নিহত আবদুল বারী বেসরকারি টেলিভিশন স্টেশন ডিবিসি নিউজের জ্যেষ্ঠ প্রযোজক (প্রডিউসার) ছিলেন। গলা কেটে ও এলোপাতাড়ি ছুরির আঘাতে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এই গণমাধ্যমকর্মীকে হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ জানাতে না পারলেও প্রাথমিকভাবে পূর্বশত্রুতার জের, আর্থিক লেনদেন ও ছিনতাইসহ বেশ কয়েকটি বিষয় সামনে রেখে তদন্ত করছে গুলশান থানা পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে বারীকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ।

আবদুল বারীর লাশ উদ্ধারের খবর পেয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থার (সিআইডি) ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করে। এছাড়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলের আশপাশ থেকে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছে।

গুলশান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শেখ শাহানুর রহমান জানান, নিহত বারীর গলা ও পেটে ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। মরদেহের পাশে তার মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ, জুতা ও একটি রক্তমাখা ছুরি পড়ে ছিল। রাজধানীর মহাখালী ওয়্যারলেস গেইট এলাকায় ডিবিসি নিউজের কার্যালয়ের কাছে একটি মেসে থাকতেন আবদুল বারী।

এই পুলিশ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হত্যাকারীদের চিহ্নিত করতে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে বারীকে কারা হত্যা করে থাকতে পারে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি। আমরা তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলছি। সবাই গ্রামের বাড়িতে থাকেন। কারও সঙ্গে তার বিরোধ আছে কি না সহকর্মীরাও তা বলতে পারছেন না। তারপরও আমরা বিভিন্ন ক্লু নিয়ে কাজ করছি। আশা করছি অল্প সময়ের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে।’

ডিবিসি নিউজের প্রধান প্রতিবেদক রাজিব ঘোষ জানান, ঘটনার দিন মঙ্গলবার সাপ্তাহিক ছুটি ছিল আবদুল বারীর। গতকাল সকালে তারা পুলিশের কাছ থেকে বারীকে হত্যার কথা জানতে পারেন। ডিবিসি নিউজ কর্র্তৃপক্ষ জানায়, গতকাল সকালে কয়েকজন পথশিশু লেকের পাড়ে বারীর লাশ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশ সদস্যদের জানায়। পরে পুলিশ সেখান থেকে বারীর লাশ উদ্ধার করে।

বারী হত্যার বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, প্রথমে তাকে (বারী) ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। পরে তিনি বাঁচার জন্য পানিতে নেমে পড়েন, কারণ তার জামা-কাপড় ভেজা ছিল। পরে বারী আবার লেকপাড়ে উঠে এলে তাকে মাটিতে শুইয়ে গলা কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।’

আর গুলশান থানার ওসি আবুল হাসান বলেন, ‘আবদুল বারীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সুরতহালে সে রকম আলামতই আমরা পেয়েছি। ধারণা করা হচ্ছে লাশ উদ্ধারের ৭-৮ ঘণ্টা আগে তাকে হত্যা করা হয়েছে। পূর্বশত্রুতার জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া এটা ছিনতাইয়ের ঘটনাও হতে পারে। এ ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তবে এই হত্যার তদন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।’ ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ ইতিমধ্যে সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও জানান ওসি।

বারী হত্যার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ছুরিকাঘাতের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডে একাধিক ব্যক্তি অংশ নেয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পুলিশ প্লাজা কনকর্ড শপিংমলের উল্টো দিকে লেকের যেখান থেকে বারীর লাশ উদ্ধার করা হয় গতকাল দুপুরে সেখানে যান এই প্রতিবেদক। সেখানে বিকেলে ভিড় থাকলেও রাত হলে লোকজনের চলাচল কম থাকে বলে হকার ও পথশিশুরা জানায়। লেকের পাড়ে গুলশান যাওয়ার সড়ক রয়েছে। যেখান থেকে বারীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে তার পাশে লেকে কিছু কচুরিপানা রয়েছে। সেখানে বারী একা গিয়েছিলেন না তাকে জোর করে বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তা তদন্ত করে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

সবুজ নামে এক হকার জানান, বারীকে যেখানে খুন করা হয়েছে সেখানে বিকেলে ও সন্ধ্যায় লোকজন হাঁটাহাঁটি করে। অনেকে লেকের ওই পাড়ে শরীরচর্চা করেন। কিন্তু রাতে লোকজনের তেমন আনাগোনা থাকে না। সকালে কয়েকটি পথশিশু লাশ পড়ে থাকতে দেখে আশপাশের লোকজনকে বলে। পরে পথচারীরা গুলশান থানায় কল করে বিষয়টি জানান।

লেকের পাড়ের বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘সকালে শুনেছি এখান থেকে একটি লাশ উদ্ধার হয়েছে। জায়গাটির পাশে পথশিশুরা খেলা করে। এছাড়া স্থানীয় হকাররা সেখানে বসে বিশ্রাম নেয়। খুনিরা গভীর রাতে খুনের ঘটনাটি ঘটিয়েছে বলে ধারণা করছি।’

ডিবিসির কয়েকজন সংবাদকর্মী দেশ রূপান্তরকে বলেন, বারী অত্যন্ত সজ্জন মানুষ ছিলেন। সবার সঙ্গে হাসিখুশি থাকতেন। প্রয়োজন ছাড়া তেমন কারও সঙ্গে কথা বলতেন না। তার সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল না। গত সোমবার বিকেলে তিনি সর্বশেষ অফিস করেছেন। তার এমন মৃত্যুতে সহকর্মীরা চরম মর্মাহত। তারা আরও জানান, তারা বিষয়টি নিয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।

এদিকে শোকের মাতম চলছে নিহত বারীর গ্রামের বাড়িতে। নিহত আবদুল বারীর গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার শিয়ালকোল ইউনিয়নের চন্ডিদাসগাঁতী গ্রামে। বাবা মুদি দোকানি আবদুল্লাহ শেখ এবং মা আলেয়া খাতুন পুলিশকে জানান, তাদের ছেলের কোনো শত্রু ছিল না। তার বিয়ের কথাবার্তা চলছিল। দুই সপ্তাহ আগেও তারা ছেলের বিয়ের জন্য পাত্রী দেখতে গিয়েছিলেন। তাকে কী উদ্দেশ্যে ও কারা হত্যা করেছে তার কিছুই অনুমান করতে পারছেন না।

তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে বারী ছিলেন সবার ছোট। বড় ভাই আবদুল আলীম বাবার সঙ্গে মুদিখানার ব্যবসা করেন। তিনিই বারীর লাশ নিতে ঢাকায় এসেছিলেন।

পুলিশের গুলশান বিভাগের ডিসি মো. আসাদুজ্জামান খান রিপন বলেন, ‘আবদুল বারী হত্যায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে।’

বিষয়টি আলাদাভাবে তদন্ত করছে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) গুলশান বিভাগ। এ বিষয়ে ডিবির উপ-কমিশনার (ডিসি) মশিউর রহমান বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে কারও সঙ্গে দ্বন্দ্ব বা মনোমালিন্যের জের ধরে এ ঘটনা ঘটতে পারে। পুলিশের বেশ কয়েকটি ইউনিট সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। যে বা যারাই এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকুক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত