পুলিশের মামলায় নেই মালিকপক্ষের কেউ

আপডেট : ০৯ জুন ২০২২, ০২:২৩ এএম

ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বিএম কনটেইনার ডিপোর অনেক কিছুই এখনো ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। চার দিন পর আগুন নিভলেও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত বিবরণ ও হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বহু হিসাবই মেলানো যাচ্ছে না। চার দিন পর পুলিশ একটি মামলা করলেও তাতে আসামি করা হয়নি ডিপোর মালিকপক্ষের কাউকে।

এদিকে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ডিপোতে কর্ম পরিবেশ ফিরে আসতে আরও সময় লেগে যাবে। এ অবস্থায় ডিপোতে রাখা রপ্তানি পণ্যের কনটেইনারগুলোর শিপমেন্ট বা জাহাজীকরণের বিষয়টিও অনিশ্চিত হয়ে গেছে।

ভয়াবহ ওই ঘটনার চার দিন পর গত মঙ্গলবার রাতে সীতাকু- থানার এসআই আশরাফ সিদ্দিক বাদী হয়ে সুনির্দিষ্টভাবে ডিপোর ৮ জনসহ অজ্ঞাতসংখ্যক লোকজনকে আসামি করে একটি মামলা করেছেন। কিন্তু এ মামলায় মালিকপক্ষের কাউকে আসামি করা হয়নি।

মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে সীতাকুন্ড সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আশরাফুল করিম দেশ রূপান্তরকে জানান, ডিপোর অগ্নিকাণ্ড ও হতাহতের ঘটনায় কর্র্তৃপক্ষের অবহেলাকে দায়ী করে ডিপোর দায়িত্বশীল ৮ জনের নামে ৩০৪/৩৩৭ ও ৩৩৮ ধারায় মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে অনেককে। প্রাথমিকভাবে মালিকপক্ষের কাউকে আসামি করা হয়নি। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি জানান, মামলায় আসামি করা হয়েছে বিএম কনটেইনার ডিপোর জিএম নাজমুল খান, ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার নুরুল আকতার, অ্যাডমিন খালেদুর রহমান, সহকারী অ্যাডমিন আব্বাস উল্লাহ, এক্সিকিউটিভ নাসির উদ্দিন ও সহকারী ব্যবস্থাপক আব্দুল আজিজ, কনটেইনার ফ্রেইট ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম ও কনটেইনার ফ্রেইট স্টেশন নজরুল ইসলামকে।

এদিকে ডিপো থেকে গতকালও আগুনে পোড়া একটি লাশ এবং দেহবিচ্ছিন্ন একটি মাথার খুলি উদ্ধার করা হয়েছে। আগুনে পোড়া লাশটি ডিপোর একজন ক্রেন অপারেটর মাসুদ রানার বলে শনাক্ত করা হয়েছে। নিহতের স্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, তার স্বামী বাঁচতে চেয়েছিল। মোবাইল ফোনে আগুনের খবর তাকে জানিয়েছিল এবং ওই সময় বাড়ি ফিরে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু ডিপো কর্মকর্তারা তাকে ছুটি দেননি।

 সেখানে আরও অনেক অগ্নিদগ্ধ কঙ্কাল বা লাশ রয়েছে বলে ফায়ার ব্রিগেডসহ অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ডিপোর বাইরে নিখোঁজ স্বজনদের লাশের সন্ধানে অনেককেই ছবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে দিনমান দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত ওই ডিপোতে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।

গতকাল ঢাকা থেকে আসা একটি বিস্ফোরক নিয়ন্ত্রণ টিম দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ধ্বংসযজ্ঞের নানা আলামত সংগ্রহ করে। একই দিন চট্টগ্রাম সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহ নেওয়াজের নেতৃত্বে পাঁচ-ছয়জনের একটি পৃথক তদন্ত দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি তদন্ত দলও ডিপো এলাকা পরিদর্শন করে এবং এ ব্যাপারে খোঁজখবর নেয়। সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর বক্তব্য জানার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে ডিপোতে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিধ্বস্ত কনটেইনার হ্যান্ডেলিং সরঞ্জামাদি অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে। গতকাল সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ক্রেন, লরি ও ট্রাকযোগে কনটেইনার ও সরঞ্জামাদি অপসারণের কাজ করতে সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়। তবে কতসংখ্যক খালি বা পণ্যবোঝাই আমদানি ও রপ্তানি কনটেইনার অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে গেছে কিংবা অক্ষত রয়েছে, সেটি সুনির্দিষ্ট করে সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষই তথ্য-পরিসংখ্যান দিতে পারছে না।

তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বিজিএমইএ জানে না, ওই ডিপোতে তাদের কতসংখ্যক রপ্তানি কনটেইনার ধ্বংস বা অক্ষত আছে। এ রকম পরিস্থিতিতে তদন্ত টিমগুলো গতকাল থেকে তাদের তদন্ত কার্যক্রম জোরদার করেছে।

গত শনিবার রাতের বিস্ফোরণে ডিপোর পাশর্^বর্তী এলাকার অন্তত ৩০০ ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে কাঁচা ঘরবাড়ির সংখ্যাই বেশি। গতকাল ৮ নম্বর সোনাইছড়ি ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জাহেদ সুলতান চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে জানান, বিএম ডিপোর বিস্ফোরণের ধাক্কায় অনেক কাঁচাঘর ধসে গেছে এবং অসংখ্য বাড়িঘরের দরজা-জানালা, ফ্রিজ, টিভি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরের সংখ্যা কমপক্ষে ৩০০ হবে বলে তিনি জানান।

এদিকে, সীতাকুণ্ডে কনটেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণের ঘটনার চার দিন পার হলেও এখনো অনেকে নিখোঁজ। আবার ১৮টি মরদেহের এখনো শনাক্তই হয়নি। এরূপ এক স্বজনের খোঁজে গত রবি থেকে বুধবার পর্যন্ত চমেক হাসপাতালে ভিড় করছেন অনেকেই।

জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, সীতাকুণ্ডে বিস্ফোরণের ঘটনায় সর্বশেষ গতকাল চিকিৎসাধীন একজনের মৃত্যু ও দুই দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যা ৭টার দিকে একজনের মাথার খুলি এবং এক ব্যক্তির পায়ের অংশবিশেষ উদ্ধার করা হয়। পরে সেগুলো দুটি আলাদা প্যাকেটে ভরে চমেক হাসপাতালে পাঠায় ফায়ার সার্ভিস। সীতাকুণ্ড সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আশরাফুল করিম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, এ নিয়ে নিহতের সংখ্যা ৪৬ জন হলো। এর মধ্যে ২৬ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকিদের শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য স্বজনদের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। রিপোর্ট পেলে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত