জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ, দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা আর নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন যে গ্যাস সঞ্চালনের তথাকথিত সিস্টেম লস আর অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করা হলে ঘাটতি মোকাবিলার নামে দেশে দফায় দফায় গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতো না। গত রবিবার আবারও গ্যাসের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। চলতি মাস থেকে বাসাবাড়ি, শিল্প ও কৃষি খাতে গ্যাসের এই বর্ধিত দাম কার্যকর হবে। সব খাত মিলিয়ে গ্যাসের দাম গড়ে ২২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। গ্যাসের দাম বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ভোক্তাদের উদ্বেগ আর আলোচনা-সমালোচনার রেশ কাটতে না কাটতেই সামনে এলো তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের বড় ধরনের আরেকটি দুর্নীতির খবর। বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরের ‘২০ কোটি টাকা ঘুষে বিচ্ছিন্ন গ্যাস সংযোগ সচল’ শিরোনামের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে তিতাসের ঘুষ লেনদেন ও সংযোগ জালিয়াতি ধরা পড়েছে। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, বিল বকেয়া থাকায় গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল রাজধানীর কুড়িল ও ভাটারা এলাকার ১ হাজার ২৪৭ জন গ্রাহকের। এসব গ্রাহকের প্রত্যেকের কাছেই বড় অঙ্কের বিল ও জরিমানা পাওনা ছিল তিতাস গ্যাস কর্র্তৃপক্ষের। কিন্তু বকেয়া বিল ও জরিমানা পরিশোধ না করেই তিতাসের জালিয়াতির মাধ্যমে এই গ্রাহকরা পুনঃসংযোগ পেয়েছেন। এতে লেনদেন হয়েছে ২০ কোটি টাকা। দুদক জানিয়েছে, তিতাসের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে এ অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছেন তারা। সম্প্রতি এ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দিয়েছে দুদক। দুদক বলছে, এমন অনিয়মে তিতাস গ্যাস কোম্পানি বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারিয়েছে।
তিতাসের এই দুর্নীতিবাজ চক্রটি কতটা বেপরোয়া তাও উঠে এসেছে দুদকের তদন্ত প্রতিবেদনে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রায় সাড়ে ১২শ গ্রাহকের তথ্য জালিয়াতির মাধ্যমে তিতাসের সার্ভারে এন্ট্রি করা হয়েছিল এক রাতেই। যে নাটকীয় কায়দায় তা করা হয়েছে সেটি চলচ্চিত্রের কাহিনীকেই হার মানায়। এ বিষয়ে ভাটারা থানায় করা মামলার এজাহারে বলা হয়, তিতাসের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সামী এন্টারপ্রাইজের মালিক রাকিব অজ্ঞাতনামা ৮-১০ জনকে নিয়ে তিতাস কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। যাদের মধ্যে চার-পাঁচজন ডেটা এন্ট্রিতে পারদর্শী ছিলেন। তিতাস কর্মকর্তাদের সহায়তায় কুড়িল কার্যালয়ের কম্পিউটার রুমে বেআইনিভাবে প্রবেশ করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা ওইসব গ্রাহকের তথ্য সংযুক্ত করা হয়। এ ঘটনায় তিতাসের এক উপমহাব্যবস্থাপক ও এক ব্যবস্থাপককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। স্মরণ করা যেতে পারে, কয়েক বছর আগে দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তিতাসে গ্যাস-সংযোগে নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা হয় না। এ ছাড়া অবৈধ সংযোগ দেওয়া, মিটার টেম্পারিং করা, কম গ্যাস সরবরাহ করেও সিস্টেম লস দেখানো এবং বাণিজ্যিক গ্রাহককে শিল্প শ্রেণির গ্রাহক হিসেবে সংযোগ দেওয়ার মতো ২২টি বিষয়কে তিতাসে দুর্নীতির ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছিল দুদক। এসব দুর্নীতি রোধে ১২ দফা সুপারিশও করেছিল সংস্থাটি। প্রশ্ন হলো, দুদকের এসব সুপারিশ কেন আমলে নেওয়া হলো না? এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটির বিরুদ্ধে এত এত অভিযোগ সত্ত্বেও শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না দেখেই তিতাসের দুর্নীতি-অনিয়মেরও লাগাম টানা যায় না।
বিইআরসি চলতি মাসে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কারণ হিসেবেও গ্যাস খাতে ঘাটতির কথাই জানিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, এই খাতে এবার ১১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ঘাটতি হবে। এই টাকার মধ্যে সরকার ৬৮০০ কোটি টাকা ভর্তুকি হিসেবে বাজেটে বরাদ্দ রাখবে। অন্যদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল ও কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ থেকে সমন্বয় করা হবে ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। কিন্তু এটা ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই যে, অন্যান্য দেশে মাত্র ২ শতাংশ সিস্টেম লস থাকলেও পেট্রোবাংলা ৮ শতাংশ সিস্টেম লস দেখিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিতাসে ৬ শতাংশ সিস্টেম লস হয় মূলত অবৈধ সংযোগের কারণে। অথচ গ্যাসের বিপুল সংখ্যক অবৈধ সংযোগ বন্ধের কোনো উদ্যোগ নেই। প্রিপেইড মিটার সরবরাহের উদ্যোগও মুখ থুবড়ে পড়েছে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে ট্রান্সমিশন কোম্পানিগুলোর কোনো আগ্রহ নেই। আবার দেশে প্রচুর গ্যাস মজুদ থাকা সত্ত্বেও গ্যাস উত্তোলনে না গিয়ে বিদেশ থেকে বেশি দামে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। এতে জ্বালানি খাত পরনির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এবং ভোক্তাকে বেশি দাম দিতে হচ্ছে। কিন্তু তিতাস সিস্টেম লস কমানো, অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করা, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পথে না হেঁটে বরাবরের মতো এবারও জনগণের পকেট কাটার সহজ পথে হাঁটার রাস্তাই বেছে নিয়েছে।
