দেশের শিল্প-কারখানার জন্য ও বিদেশে কাজ করতে আগ্রহীদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার। এজন্য এবারের প্রস্তাবিত বাজেট বরাদ্দে কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রামভিত্তিক অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া করোনাকালীন বড়, মাঝারি ও ক্ষুদ্রশিল্পে যে প্রণোদনা দিয়েছিল সরকার আগামী অর্থবছরেও সেই প্রণোদনা অব্যাহত রাখা হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আ হ ম মুস্তফা কামাল আগামী অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় এসব কথা জানিয়েছেন।
দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে চলতি অর্থবছরের তুলনায় আসন্ন অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব আছে বাজেটে। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবারের বাজেটে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে ‘ব্লেন্ডেড শিক্ষাবিষয়ক মহাপরিকল্পনা’ প্রণয়নবিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।
দেশের ১০০টি উপজেলায় একটি করে টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ (টিএসসি) স্থাপন প্রকল্পের আওতায় ৬,৮০০টি নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এতে কারিগরি শিক্ষকদের চাকরির সংস্থান হবে। এ ছাড়া মাদ্রাসাশিক্ষার বিষয়েও সরকার বড় ধরনের গুরুত্ব দিয়েছে এবারের বাজেটে। কারিগরি ও মাদ্রাসাশিক্ষার উন্নতির জন্য এবারের বাজেটে সাড়ে ৫০০ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এতে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে বড় আকারে মানবসম্পদের উন্নয়ন হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
দেশীয় অর্থনীতির নিরিখে মানবসম্পদ উন্নয়নের পাশাপাশি বিদেশ গমনে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের দক্ষতা অর্জনের ওপর এবার জোর দেওয়া হয়েছে। বিদেশে দক্ষ পেশাজীবীদের পাঠানোর জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করা হবে। অভিবাসীদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে এবং বৈদেশিক শ্রমবাজারে উচ্চ বেতনে পুনঃঅভিবাসন সহজতর করতে ‘রিকগনিশন অব প্রায়র লার্নিং’ কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। দেশের ৪৩টি টিটিসিতে বৈদেশিক ভাষা প্রশিক্ষণ কোর্স দেওয়া হচ্ছে। নতুন অর্থবছরে (২০২২-২৩) ৮ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি বিদেশে কাজ করতে যাবে এমন লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৫ লাখ ২০ হাজার জনকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বাজেট বক্তৃতায় আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, করোনা মোকাবিলা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে নেওয়া উদ্যোগগুলো সরকার আগামী অর্থবছরেও অব্যাহত রাখবে। তবে সংকটের প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অগ্রাধিকারও কিছুটা পরিবর্তন হবে। তিনি বলেন, ‘অতিমারীর তৃতীয় বছরে এসে আমাদের অগ্রাধিকার হবে আয়বর্ধন ও কর্মসৃজনের ধারা অব্যাহত রেখে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে টেকসই করা। আগামী অর্থবছরই হবে অতিমারীর প্রভাব কাটিয়ে ওঠার জন্য আমাদের শেষ বছর।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার দরিদ্রবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশ্বাসী। কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি, শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি তথা দক্ষতার উন্নয়ন ও প্রকৃত মজুরির কাক্সিক্ষত বিকাশ নিশ্চিত করা হবে। কর্মসৃজনকে গতিশীল করতে সরকার খাতভিত্তিক সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এগুলো হলো শ্রমনিবিড় ও রপ্তানিমুখী উৎপাদনভিত্তিক প্রবৃদ্ধিতে প্রণোদনা প্রদান, কৃষির বহুমুখীকরণ, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি কুটির শিল্প (সিএমএসএমই) খাতকে গতিশীল করা, খাতবহির্ভূত সেবাসহ আধুনিক সেবা খাতকে শক্তিশালী ও বিস্তৃত করা, আইসিটি খাতের উদ্যোগগুলোকে উৎসাহিত করা এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থানকে সম্প্রসারিত করা ইত্যাদি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হওয়ায় দেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ২০ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমানে সাড়ে ছয় লাখ ফ্রিল্যান্সার আউটসোর্সিং পেশায় যুক্ত আছেন। সরকার ২০২৫ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান ৩০ লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া দেশের সব অংশে কর্মসংস্থানের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে সরকার ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক জোন স্থাপন করছে, যেখানে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
কর্মসংস্থান সম্পর্কে মুস্তফা কামাল আরও বলেন, মৎস্য ও পশুপালন খাতে ভূমিহীন, দরিদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের আয়বর্ধনমূলক কাজে সম্পৃক্ত করে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। সর্বোপরি, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ৮৭ হাজার ২৩০টি গ্রামভিত্তিক উন্নয়নের যে রূপরেখা প্রণয়ন করা হচ্ছে।
দেশের বিনিয়োগ অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে ৯৭টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২৮টি বাস্তবায়নাধীন। বিভিন্ন সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১৯৬টি প্রতিষ্ঠানকে জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যাদের প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ ছাড়া বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
