স্মৃতিতে পূজা

আপডেট : ১০ জুন ২০২২, ১১:০৫ পিএম

সেই ২০১২ সালের শুরু। ঢাকায় বাসা হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে সিট পাচ্ছিল না। মেয়েটা এত লক্ষ্মী ছিল যে আমিই বললাম, পূজা তুই আমার সঙ্গে থাক, আমার বেডে। সেই থেকে আমরা বেডমেট হয়ে গেলাম! ও আমাকে ‘বেডু’ বলে ডাকত। আমার ডিপার্টমেন্টের বাইরে ও-ই প্রথম ফ্রেন্ড। ওর সঙ্গেই সারাক্ষণ ওর ডিপার্টমেন্টের সবার সঙ্গে ঘুরতাম। এক বেডে থাকার সময় মাঝে মাঝে বলতাম, তুই মোটা আর আমি পাতলু। আমাদের এই ছোট্ট বেডটাতে কত সুন্দর অ্যাডজাস্ট হয়ে গেছে! ঝড়ের রাতগুলোতে আমি ভয়ে ওকে জড়িয়ে ধরতাম। যখন মেঘ ডাকত ও আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলত, ভয় পাইস না লাজুক আমি আছি। ও মারা যাওয়ার পর আমার এত ভয় করল যে, কেউ ওর চেহারাটাই আমাকে দেখতে দিল না আমি সহ্য করতে পারব না বলে। ওর রক্তমাখা সাদা কাপড়টা দেখে আমিও ওর মুখটা দেখার সাহস পেলাম না। অথচ ওর মুখের হাসিটা দেখে সব সময় বলতাম তুই একটা খরগোশ!

তন্ময়ের সঙ্গে প্রেমের প্রথম দিনগুলোতে পূজা সারাক্ষণ আমার কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করত, বলত লাজুক আমার কি রাজি হওয়া উচিত? আমি বলতাম, দেখ পূজা, ঘ্যান ঘ্যান করিস না। আমাকে বলত, ‘জানিস পোকা (তন্ময়কে পোকা ডাকত) এইটা বলছে, পোকা ওইটা বলছে... এখন তোর কি মনে হয় ও আমাকে ভালোবাসে? ও তো ঢাকা মেডিকেলে পড়ে, কয়দিন পরে আমাকে কি আর পাত্তা দেবে?’ পূজা যখন ল্যাব থেকে ফিরে ঘুমিয়ে যেত, তন্ময়ের ফোন ধরতে পারত না। তন্ময় টেনশনে আমাকে নক দিয়ে জিজ্ঞাসা করত, পূজা ফিরছে কি না? পূজা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের ইসলামনগরে বাসা নেওয়ার পরে অফিস থেকে ফিরে এক দিন তন্ময়কে জানায়নি। তন্ময় অস্থির হয়ে আমাকে নক দিয়েছে পূজার খোঁজ জানতে। পূজা যে বাসায় থাকে সেই বাসার কারও ফোন নম্বর ম্যানেজ করে দিতে বলল। এখন তন্ময়ের কোনো অস্থিরতাই পূজার খোঁজ এনে দিতে পারতেছে না! মাত্র ছয় বছর বয়সে ক্যানসারে মাকে হারিয়ে ফেলা মেয়েটা জীবনে এত স্ট্রাগল করে মাত্র সুখের দেখা পেয়েছিল। ডিপার্টমেন্টের ফার্স্ট গার্ল ছিল। সব সময় বলত খুব দ্রুত ভালো একটা জব পেতে হবে। জবটা হয়েও গেল। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানী হয়ে গেল পূজা। দুই বছর আগে কত সংগ্রামের পরে দুই ফ্যামিলিকে রাজি করে তারা বিয়েও করল। কি যে সুন্দর লাগতেছিল সেদিন ওকে! দেবীর মতো লাগছিল আমার বেডুকে।

পূজা আর তন্ময়ের বিয়ের দিনে মালাবদলের সময় পূজা যে একটা নতুন বউ, চুপচাপ থাকবে লজ্জা পাবে এ রকম কিছুই ছিল না ওর মধ্যে। এত হাসি আর এত খুশি আমি কখনো কারও বিয়েতে দেখিনি। ননস্টপ কথা বলে যাচ্ছিল মেয়েটা। যখন ঘটির ওপরে একজনের হাতের ওপরে আরেকজনের হাত রাখা ছিল তখনো পূজার কি হাসি! সেদিন দেখে এত শান্তি লাগছিল যে অবশেষে ৭ বছরের প্রেমের পূর্ণতা পাচ্ছে। দুজন দুই জায়গায় জব করত। এজন্য পূজা সারাক্ষণ বলত ইস! কবে যে আমি তন্ময়ের সঙ্গে থাকতে পারব! এরপর দুজনের এক জায়গায় পোস্টিং নিয়ে ৬টা মাসও একসঙ্গে থাকতে পারল না। তন্ময়ের পোস্টিং এখানে আনার পর আমাকে বলল ফাইনালি আমার সুখের দিন শুরু হলো লাজুক। হায় রে সুখ!

এই তো আমার জন্মদিনে আমাকে বলল লাজুক তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে, তুই খালামণি হবি। কাউকে বলবি না। নজর লাগবে। মাত্র সাড়ে পাঁচ মাসে কার নজর লাগল জানি না। তোর বাবুটা পৃথিবীর মুখটাই দেখল না! বাসের পেছনের সিটে বসেছিল পূজা। পেটের বাচ্চাটার ঝাঁকি লাগছিল এজন্য সামনে এসে বসেছিল। ছোটবেলায় মা হারানো মেয়েটা যখন মেয়ের মা হতে যাচ্ছিল তখন সারাক্ষণ বলত আমার মা আসছে। কে জানে যখন বাসটা ধাক্কা দিল তখন ও বাচ্চাটাকেই বাঁচাতে চাইছিল হয়তো। এজন্য সমস্ত আঘাতটা মাথাতেই লাগল, পেটে লাগল না। এত ব্যথা পাইছে মেয়েটা যে মৃত্যুর ৫-৬ ঘণ্টা পরও যখন কফিনে নামানো হচ্ছিল তখনো বিডিং হচ্ছিল। কফিনে নামানোর সময় টপটপ করে রক্ত পড়ছিল। সবাই শেষবারের মতো এগিয়ে গিয়ে পূজার বীভৎস হয়ে যাওয়া মুখটা দেখল। পাথরের মতো আমি পেছনে দাঁড়িয়ে থাকলাম। দেখতে পারিনি ওরে আমি। যে মুখে সারাক্ষণ হাসি দেখতাম সেই মুখটা এভাবে দেখতে চাইনি আমি। পূজা কোথাও একটু সামান্য ব্যথা পেলেও অস্থির হয়ে যেত। সবাইকে দেখাত। সারাক্ষণ সেটা নিয়ে টেনশনে বকবক করত। রাগ করতাম। বলতাম, পূজা তুই একট চুপ করবি? ও চুপ হয়ে গেছে একদম। এত ব্যথা পেয়েও মেয়েটা একটা কথা বলতে পারেনি!

আমাদের গণরুমের ছোট্ট যে বেডটায় পূজা আর আমি থাকতাম সেই বেডটার মতো ছোট্ট একটা কফিনে ঢুকে আমার চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল পূজা। এখনো মনে হচ্ছে, আমি একটা ঘোরের মধ্যে আছি। এই ঘোর কাটবে একটু পরেই। এরপর আমি দেখব যা হয়েছে সব একটা দুঃস্বপ্ন ছিল। পূজাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতাম আর বলতাম পূজা তোকে ধরে ঘুমাতে খুব মজা। তুই একটুও নড়িস না, মরার মতো ঘুমাস। সত্যিই পূজা মরে গেল, একটুও নড়ল না। ওর এই ঘুম আর কোনো দিন ভাঙবে না। পূজা সব সময় বলত আমার প্রেম, আমার বিয়ে, তন্ময়কে পাওয়া সবকিছুর পেছনে তোর অনেক সাপোর্ট ছিল। তুই একটা স্পেশাল ট্রিট পাস আমার কাছে। আমি বলতাম তোর কাছ থেকে তো একবার ট্রিট পাইছি এবার আমি ডাক্তার সাহেবের কাছ থেকে ট্রিট নেব। পূজা বলেছিল, তন্ময়ের ঢাকায় পোস্টিং হলে এক দিন আমরা দুজন তোর সঙ্গে দেখা করব।

আমি ঢাকায় আসার পর পূজা বলল, লাজুক ঢাকায় আসছিস, দেখা করবি না? আমি বললাম তুই এত দূরে থাকিস, এখন যাব না। নেক্সট উইকে রিমির বিয়েতে গেলে দেখা করব। আমি কেন গেলাম না গত সপ্তাহে তোকে দেখতে? আর কোনো নেক্সট উইকেই যে তোর সঙ্গে আমার দেখা হবে না। এত দূরে চলে গেছে পূজা! এত এত স্মৃতি কেমনে ভুলে যাব? আমার এই বাসায় পূজা কোনো দিন ছিল না। তবুও গত কয়েক দিন আমার মনে হচ্ছে পূজা মনে হয় এখানেই ছিল, এখানেই ওকে দেখছি ঠিক যেভাবে আমরা দুজন পাশাপাশি বালিশে মাত্র আধ হাত দূরত্বে শুয়ে থাকতাম। পূজা আমার কাছের মানুষ ছিল, সবাই সান্তনা দিচ্ছে নিজেকে শক্ত রাখতে। কিন্তু আমি তো ঘুমাতে পারছি না। চোখ বুজলেই ওকে দেখছি। রক্তে লাল হয়ে যাওয়া সাদা কাপড়টা দেখছি। এরপর ভেবেছি তন্ময়ের ওই ঘর ওই বিছানায় তন্ময় কীভাবে আছে! পূজা তো চলেই গেছে। কিন্তু ওর ভালোবাসার মানুষটাকে একদম নিঃস্ব করে চলে গেছে। পূজার জীবনে তন্ময়ই সবকিছু ছিল। পূজা মারা যাওয়ার দিন এনাম মেডিকেলে তন্ময়ের দিকে যতবার তাকিয়েছি শুধু মনে হয়েছে এক জীবনের সব ভালোবাসা পূজা ওকে দিয়ে গেছে। সিসিটিভি ফুটেজে ওর অক্সিডেন্ট দেখে বারবার মনে হয়েছে আজরাইল এসে মুহূর্তের মধ্যে ছোঁ মেরে পূজাকে নিয়ে গেল। আমার ডায়েরিতে পূজা লিখেছিল ‘আমি কি মরে গেছি লাজুক? যখনই কষ্ট হবে আমার কাছে ছুটে আসবি। একসঙ্গে গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদব।’ কেউ কি বলতে পারবে কোথায় ছুটে গেলে পূজার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে পারব? কেঁদে কেঁদেও যদি ওকে ভুলে যাওয়া যেত!

আজ ১১ জুন পূজার জন্মদিন। একটু পরপর পূজা তন্ময়ের সঙ্গে সেলফি তুলে পাঠাবে না আমাকে, ননস্টপ মেসেজ দিয়ে বলবে না, জানিস আজ এইটা হইছে ওইটা হইছে। ছোটবেলায় শুনতাম মানুষ মরে গেলে আকাশের তারা হয়ে যায়। কেন জানি না এত বড় হওয়ার পরে, এত লেখাপড়া করার পরে, বিজ্ঞান সম্পর্কে জানার পরেও আমি যখন আকাশের তারা দেখি তখন আমার মনে হয় এক একটা তারা এক একটা মৃত মানুষ। আমি যখনই রাতের আকাশের দিকে তাকাব, মিটিমিটি করে জ্বলতে থাকা তারা দেখে মনে হবে ওই তো পূজা, ওর ছোট্ট বাবুটাকে পাশে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।

লেখক : কবি, সাবেক শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত