বহুল প্রতিক্ষীত জাতীয় শিক্ষাক্রম সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। উদ্দেশ্য -এমন একটি ভবিষ্যত প্রজন্ম তৈরি করা যারা জাতীয় ইতিহাস,ঐতিহ্য,মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিজেকে সৃজনশীল,উৎপাদনমুখী,সুখী ও বৈশ্বিক নাগরিক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।
একবিংশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আগামী প্রজন্মকে সক্ষম করে গড়ে তোলার জন্য কর্মজীবনের সাথে সংগতিপূর্ণ ও মানসম্মত শিক্ষার্জনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রণীত হয়েছে নতুন এই জাতীয় শিক্ষাক্রম। যার মূলনীতি হচ্ছে -মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ, শিক্ষার্থীকেন্দ্রীক ও আনন্দময়, প্রাসঙ্গিক ও নমনীয়, সক্রিয় ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন, একীভূত, জীবন ও জীবিকা সংশ্লিষ্ট, বৈষম্যহীন, অংশগ্রহণমূলক, বহুমাত্রিক, আউটকাম ফোকাস।
নতুন শিক্ষাক্রমে প্রাথমিকে (প্রথম-পঞ্চম) সাতটি ও মাধ্যমিকে (ষষ্ঠ-দশম) দশটি অভিন্ন বিষয় পড়ানো হবে। এছাড়া মাধ্যমিক (একাদশ ও দ্বাদশ) শ্রেণিতে তিনটি আবশ্যিক ও তিনটি ঐচ্ছিক বিষয় সহ মোট ছয় বিষয়ের বারটি পত্র পড়ানো হবে। একটি অপশনাল বিষয় পড়ার সুযোগ থাকছে।
প্রাথমিকের সাতটি বিষয় হচ্ছে বাংলা, ইংরেজি,গণিত,সামাজিক বিজ্ঞান,বিজ্ঞান,ক্রীড়া ও শিল্পকলা এবং ধর্ম শিক্ষা। অন্যদিকে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণিতে যে অভিন্ন দশটি বিষয় পড়ানো হবে সেগুলো হচ্ছে -বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সামাজিক বিজ্ঞান, বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, জীবন ও জীবিকা, স্বাস্থ্য শিক্ষা, ধর্ম শিক্ষা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি।
বর্তমানে নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা নামে যে তিনটি বিভাগ আছে তা আর থাকছে না। এই গ্রুপ বিভাজন একাদশ শ্রেণিতে গিয়ে হবে। প্রাক প্রাথমিক থেকে দশম শ্রেণির মাঝে কোন পাবলিক পরীক্ষা হবে না। দশম শ্রেণি শেষে প্রথম পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি শেষে আরো দুটি।
এই শিক্ষাক্রমের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে - মূল্যায়ন পদ্ধতি। বলা হয়েছে প্রাক-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষাভিত্তিক বা সামষ্টিক কোন মূল্যায়ন হবে না। সম্পূর্ণ মূল্যায়ন হবে ধারাবাহিক অর্থাৎ শিখনকালীন সময়ে। চতুর্থ থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ৭০ ভাগ শিখনকালীন ও ৩০ ভাগ পরীক্ষাভিত্তিক , ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ৬০ ভাগ শিখনকালীন ও ৪০ ভাগ পরীক্ষাভিত্তিক, নবম ও দশম শ্রেণিতে ৫০ ভাগ শিখনকালীন ও ৫০ ভাগ পরীক্ষাভিত্তিক, এসএসসি পরীক্ষায় ২০ ভাগ শিখনকালীন ও ৮০ ভাগ পরীক্ষাভিত্তিক মূল্যায়ন হবে। এছাড়া
১১শ ও ১২শ শ্রেণিতে শিখনকালীন মূল্যায়ন হবে ৩০ ভাগ ও বাকি ৭০ ভাগ হবে পরীক্ষাভিত্তিক। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে পৃথক দুটি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে যার প্রথমটি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এবং পরেরটি বোর্ডের ব্যবস্থাপনায়।
অতীতে অনেক রঙিন স্বপ্ন, প্রত্যাশা আর অজস্র প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি নিয়ে এসেছিল ইংরেজি শিক্ষায় কমিউনিকেটিভ পদ্ধতি, স্কুল বেইজড অ্যাসেসমেন্ট(এসবিএ), মূল্যায়নে সৃজনশীল পদ্ধতি ইত্যাদি। জাতি দেখেছে ইংরেজি শিক্ষার কমিউনিকেটিভ পদ্ধতি কীভাবে ফ্লপ হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশব্যাপী শ্রেণিকক্ষে ইংরেজির গাইড বইকে একরকম বৈধতা দেওয়া হয়েছে। ইংরেজি শিক্ষায় গুণগত পরিবর্তনের স্বপ্ন তিমিরেই রয়ে গেছে। অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে, বিভিন্ন রূপরেখা নিয়ে স্কুল বেইজড অ্যাসেসমেন্ট এসেছিল শিখনকালীন মূল্যায়নের স্বপ্ন নিয়ে। এই বিষয়ের উপর সব শিক্ষকের প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করেও এটি নিয়ে আগানো গেলো না।
এরপর শিক্ষায় নোট-গাইড, প্রাইভেট কোচিং ও মুখস্তনির্ভরতা বন্ধে প্রবর্তন করা হয়েছিলো মূল্যায়নে সৃজনশীল পদ্ধতি। যার প্রায় সবকয়টি লক্ষ্যমাত্রা এখনো অপূরণীয় রয়ে গেছে। তেমনি জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এরও একই হাল দেখেছে জাতি। সেখানের উচ্চাভিলাসী এমন অনেক স্বপ্ন দেখা হয়েছে আসলে যা বাস্তবায়নযোগ্যই নয়।
এমনই এক বাস্তবতায় এসেছে নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রম। ইতোমধ্যে এই নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে নানা মতামত আসতে শুরু করেছে। নতুন এই শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জগুলোও আলোচনায় আসছে।
শোনা যাচ্ছে শিক্ষাজীবনের বারো বছর পর প্রথম পাবলিক পরীক্ষাটি হবে ১০ম শ্রেণির সিলেবাসের উপর। শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ১০টি বিষয় পড়লেও পাবলিক পরীক্ষা দিবে ৫টি বিষয়ের উপর। প্রতি বিষয়ে ৮০ নম্বরের পরীক্ষা নেয়া হবে,বাকি ২০ নম্বর শিখনকালীন মূল্যায়ন থেকে শিক্ষকগণ বোর্ডে পাঠিয়ে দিবেন। এছাড়া বাকি ৫টি বিষয়ের নম্বর পুরোটাই শিক্ষক বোর্ডে পাঠাবেন শিখনকালীন মূল্যায়ন থেকে।
আমাদের দেশের বর্তমান বাস্তবতায় এটি প্রায় অসম্ভব। দেশের মাধ্যমিক শিক্ষার সিংহভাগই বেসরকারি। এর মধ্যে আবার নন এমপিও ও কিন্ডারগার্টেন টাইপ প্রতিষ্ঠান আছে অনেক। এইসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ নামমাত্র বেতনে চাকরি করেন। তাঁদের বর্তমান ও ভবিষ্যত দুটোই অনিশ্চিত। শিক্ষকদের এহেন আর্থিক দৈন্যতার পাশাপাশি আছে রাজনৈতিক চাপ, আত্মীয়-অনাত্মীয়ের ব্যাপার, পরিচালনা পর্ষদ সদস্যদের হস্তক্ষেপ, ব্যাক্তিগত ভালোলাগা মন্দলাগার বিষয় সর্বোপরি নিজের প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার তাগিদ ইত্যাদি। এইসব উপেক্ষা করে একজন শিক্ষকের পক্ষে নিরপেক্ষ থাকা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
অন্যদিকে যদি বলা হয় শুধু পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে পাবলিক পরীক্ষার গ্রেড নির্ধারিত হবে, শিক্ষকদের পাঠানো নম্বর গ্রেড নির্ধারণে বিবেচিত হবে না, তখন পরীক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এবং বাকি বিষয়গুলোর পরিনতি হবে বর্তমানের ক্যারিয়ার শিক্ষা, স্বাস্থ্য বিজ্ঞান ও খেলাধুলার মতো। ঐ বিষয়গুলোর লার্নিং আউটকাম অর্জন তখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
তাই মূল্যায়ন ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি বলেই মনে করছি। চতুর্থ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতি বিষয়ে ৬০ নম্বর পরীক্ষাভিত্তিক ও ৪০ নম্বর শিখনকালীন মূল্যায়ন রাখা যেতে পারে। এতে পরবর্তী শ্রেণিতে প্রমোশন প্রদান ও মেধাক্রম নির্ধারণে জটিলতা কম হবে। তাছাড়া অপ্রিয় হলেও একথা সত্য যে,বিদ্যমান পরিস্থিতিতে শিখনকালীন মূল্যায়ন যত বেশি হবে এর নির্ভরযোগ্যতা তত হ্রাস পাবে।
দুটি পাবলিক পরীক্ষা -ই সংশ্লিষ্ট ক্লাসে পাঠ্য সবগুলো বিষয়ের উপর এবং ৮০ নম্বর পরীক্ষাভিত্তিক ও ২০ নম্বর শিখনকালীন করা যেতে পারে। এতে মূল্যায়নের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির পাশাপাশি, শিক্ষকের ক্ষমতায়ন ও শিক্ষার্থীদের মানবীয় গুণাবলির যথাযথ মূল্যায়নও সম্ভব হবে।
লেখক: শিক্ষক
