করোনা মহামারীর ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চাপে ফেলেছে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে। সরবরাহ সংকটের কারণে দেশে দেশে বেড়েছে খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম। যার প্রভাবে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই। অনেক দেশেই হু হু করে বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশেও মূল্যস্ফীতির উল্লম্ফনে গত কয়েক মাস ধরে প্রতিটি খাদ্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী। বেড়েছে অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও। আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটকে কেন্দ্র করে এসব পণ্যের দামের পালে লেগেছে নতুন হাওয়া। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক কিছু পণ্যের দাম হুট করেই অনেকটা বেড়ে গেছে। অথচ প্রস্তাবিত এ বাজেট পাস হতে এখনো দ্ইু সপ্তাহের বেশি বাকি।
রাজধানীর বাজারগুলো ঘুরে দেখা যায়, প্রস্তাবিত বাজেটে যেসব ইলেকট্রনিক পণ্যের দাম বাড়ানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেসব পণ্যের দাম ইতিমধ্যেই বেড়েছে। ইকো, হায়ার, স্যামসাং ও পিউরিটের মতো কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের দাম তরতর করে বাড়াতে শুরু করেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্টকে থাকা ইলেকট্রনিক পণ্যের মূল্য আগামী কোরবানির ঈদের আগে না বাড়লেও নতুন করে আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়েছে। এখনো যেসব কোম্পানি তাদের পণ্যের নতুন মূল্য নির্ধারণ করেনি সেসব কোম্পানি আগামী সপ্তাহের দিকে তাদের পণ্যের দাম নির্ধারণ করার সম্ভাবনা রয়েছে।
গতকাল রবিবার বাংলা মোটর, মালিবাগ ও মগবাজারে বিভিন্ন শোরুম ঘুরে দেখা গেছে, ইলেকট্রনিক পণ্যের মধ্যে ইকো ও হায়ারের ফ্রিজের ২ হাজার, স্যামসাংয়ের ৩২ ইঞ্চি টিভিতে ২ হাজার, দেড় টন এসিতে ৪ হাজার এবং পিউরিটের ১০ লিটার পানির রিসাইকেলিং মেশিনে ১ হাজার টাকা বেড়েছে।
বাংলা মোটরের স্যামসাং শোরুমের বিক্রয় প্রতিনিধি জাবের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটের কারণে অনেক ইলেকট্রনিকস পণ্যের দাম বেড়েছে। এখনো যেসব কোম্পানি তাদের পণ্যের নতুন করে দাম বাড়ায়নি তারাও আগামী সপ্তাহের মধ্যে বাড়িয়ে দেবে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে ৩২ ইঞ্চি স্যামসাংয়ের টেলিভিশন বর্তমানে ২৯ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা গত চার দিন আগেও ২৭ হাজার টাকায় বিক্রি হতো। বাজেট পেশ হওয়ার আগের সপ্তাহেও যে এসি ৯০ হাজার টাকায় বিক্রি হতো, তা বর্তমানে ৪ হাজার বেড়ে ৯৪ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে দেশের বাজারে এখনো যেসব এসি, ফ্রিজ, টেলিভিশনের মজুদ রয়েছে তা ঈদের আগে আর বাড়ার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু নতুন করে আমদানি করা সব পণ্যের দাম বাড়বে।’
মালিবাগের মিডিয়ার ইলেকট্রনিকসের ম্যানেজার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কাছে থাকা পণ্যগুলো আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে। এখনো কোনো পণ্যের দাম বাড়েনি। আগের দামেই মিডিয়ার এক টনের এসি ৩৫ হাজার, গ্রের এক টনের ৪৩-৪৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’
মগবাজারের সিতাক ইন্ডাস্ট্রির কর্মকর্তা গোলাম ফোরকান বলেন, ‘করোনার কারণে সব প্রতিষ্ঠান লোকসানের মুখে পড়েছে। আমরা যে দেশ থেকে পণ্য আমদানি করতাম সেখানেও আমাদের দেশের মতো করোনা ছোঁয়া ছিল। প্রস্তাবিত বাজেটের কোনো প্রভাব আমাদের কোম্পানিতে লাগেনি। তবে সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটে আমদানি করা পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানো হলে সব পণ্যের দাম বাড়বে।’
এদিকে খাদ্যপণ্যের বাজারে বাজেটের প্রভাব সেভাবে না পড়লেও অনেক পণ্যের দাম আগেই থেকেই কৌশলে বাড়িয়ে রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। বাজেট প্রস্তাব উত্থাপনের দিনই আরেক দফা বেড়েছে সয়াবিন তেলের দাম। সরকার নির্ধারিত নতুন দরে বর্তমানে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিনের দাম ১৮৫ টাকা হলেও ২০০ টাকার নিচে মিলছে না কোথাও। আর বোতলজাত এক লিটার সয়াবিনের খুচরা দাম হয়েছে ২০৫ টাকা। এছাড়া পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম হয়েছে ৯৯৭ আর এক লিটার খোলা পাম তেলের দাম হলো ১৫৮ টাকা।
এদিকে গতকাল কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, গত সপ্তাহের তুলনায় ব্রয়লার মুরগি দাম কেজিতে ১৫ টাকা বেড়েছে। বাজারে এক কেজি ব্রয়লার মুরগি কিনতে দাম পড়ছে ১৫৫-১৬০ টাকা। সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২৮৫-২৯০ টাকায়। কক বা লেয়ারের কেজি ২৯০ টাকা। ফার্মের ডিমের দাম প্রতি হালি ৩ টাকা বেড়ে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া গরুর মাংস প্রতি কেজি ৭০০ এবং খাসির ৯০০-৯৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কেজিতে ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়ে আলু ২৮-৩০, দেশি পেঁয়াজ ৩৫-৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দাম বেড়েছে দেশি ও বিদেশি রসুনের। গত সপ্তাহে যে দেশি রসুন কেজি ৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছে তা গতকাল ৮০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। আর আমদানি করা রসুন ১৩০-১৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আদা বিক্রি হচ্ছে ৮০-৯০ টাকা কেজি দরে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সামনে কোরবানি ঈদের কারণে আগামী সপ্তাহ থেকে আরও বাড়তে পারে সব ধরনের মসলার দাম।
দাম অপরিবর্তিত থেকে বাজারে প্রতি কেজি বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৪০, কাঁচা মরিচ ৯০, টমেটো ৬০-৭০, বরবটি ৫০-৬০, শসা ৪০-৪৫, পেঁপে ৫০, করলা ৪৫-৫০, মিষ্টি কুমড়া ৩০, চিচিঙ্গা ৪০, চাল কুমড়া ৩০, পটোল ৪০, কাঁকরোল ৬০, ঢেঁড়স ৪০, কচুরমুখি ৪০ টাকায়।
জাহিদুল ইসলাম নামে বেসরকারি এক কর্মী বলেন, ‘এমনিতেই সবকিছুর দাম বাড়তি। আশা করেছিলাম বাজেটের পর কিছুটা দাম কমবে। কিন্তু দেখলাম বাজেটের দিনই বাড়ল তেলের দাম। কয়েক দিন আগে গ্যাসের দামও বাড়ল। আমরা হচ্ছি বলির পাঁঠা।’
লিজা নামে এক ক্রেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবারের বাজেট আমাদের চলার পথ কঠিন করে দিয়েছে। ইনকামের কোনো খবর নেই তবে ব্যয়ের অনেক রাস্তা খোলা রয়েছে। গত কয়েক মাস ধরেই স্বল্প আয় দিয়ে চলতে কষ্ট হচ্ছে। এসব গল্প আমি কাউকে বলতেও পারি না। টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য ক্রয় করতে পারি না।’
