‘আমার ছেলে স্কুলে গিয়ে সহপাঠীর কাছে তার বাবার পদোন্নতির খুশির গল্প শোনে। সেই ছেলে বাসায় এসে আমাকে বলে, ‘তোমার কেন পদোন্নতি হয় না? তুমি কি খারাপ? সন্তানদের স্কুলে গিয়ে স্ত্রীও একই ধরনের কথা শুনে আসে। বছরের পর বছর কেন একই পদে থাকি বাসায় এসে এমন নানা প্রশ্ন করতে থাকে। কোনো সঠিক উত্তর না পেয়ে তারা ধরেই নেয় যে আমি মনে হয় খারাপ, তাই প্রমোশন হয় না’।
সম্প্রতি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পদোন্নতি প্রসঙ্গে আলাপচারিতায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) একজন পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) এভাবেই দেশ রূপান্তর-এর কাছে তার হতাশার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘২৯ বছরের চাকরি জীবনে কখনো কাজে ফাঁকি দিইনি। ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেছি কৃতিত্বের সঙ্গে। কোনো অনিয়মের আশ্রয় নিইনি। বিভাগীয় কোনো মামলা নেই। দীর্ঘ চাকরিজীবনে একটিবারের জন্যও কোনো তিরস্কার বা লঘুদণ্ড হয়নি। এসিআরেও কোনো লাল দাগ নেই। তারপরও পদোন্নতি হয় না। তাই চাকরি ছাড়তেও পারি না। কাজ করতেও এখন আর ভালো লাগে না। একটা সময়ে এই পদে থেকেই অবসরে চলে যাব।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পরিদর্শক পদে কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তাদের অধিকাংশই পদোন্নতি না পেয়ে অবসরে যান। পুলিশে পদোন্নতির নিয়ম অনুযায়ী সহকারী পুলিশ সুপারের (এএসপি) ৩৩ ভাগ শূন্যপদ পরিদর্শকদের মধ্য থেকে পূরণের কথা থাকলেও তা মানা হয় না। একইভাবে কনস্টেবল থেকে এএসআই ও এএসআই থেকে এসআই পদে বিভাগীয় পরীক্ষার মাধ্যমে পদোন্নতির মেধা তালিকায় স্থান পেলেও অনেকেই পদোন্নতি পান না। এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) এ কে এম শহীদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কনস্টেবল থেকে এএসআই পদে পদোন্নতির জন্য প্রতি বছর পরীক্ষা দিতে হয়। সেই পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হন তাদের নিয়ে একটি মেধাতালিকা করা হয়। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট শূন্যপদের বিপরীতে তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়। আর ইন্সপেক্টরদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে সিভিল সার্ভিস রুল ফলো করা হয়। এই নিয়ম অনুযায়ী পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে এএসপি পদে সরাসরি রিক্রুট হন ৬৭ ভাগ। বাকি ৩৩ ভাগ ইন্সপেক্টর থেকে এএসপি পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।’
পুলিশ বাহিনীতে ক্যাডার-নন ক্যাডার কর্মকর্তাদের দ্বন্দ্বের কারণে পরিদর্শকদের পদোন্নতি দেওয়া হয় না বলে যারা দাবি করেন তাদের তথ্য সঠিক নয় বলেও উল্লেখ করেন শহীদুল হক।
পুলিশের সাবেক এই শীর্ষ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আমার সময়কালেও অসংখ্য কনস্টেবল ও ইন্সপেক্টরের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বাহিনীতে সদস্য ও কর্মকর্তার সংখ্যা যেমন বেড়েছে তেমনি নতুন নতুন ইউনিট চালু হয়েছে, সেসব জায়গায় নতুন পদ সৃজন করে পদোন্নতি ও পদায়ন করা হচ্ছে।’
যদিও পদোন্নতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে ডিএমপির একটি থানায় পরিদর্শক পদে থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, প্রতি বছর বাহিনীতে যদি একশ’ সহকারী পুলিশ সুপারের পদ শূন্য হয়, তাহলে বিসিএসের মাধ্যমে ৬৭ জন ও বাহিনী থেকে ৩৩ জন পরিদর্শককে পদোন্নতি দিয়ে সহকারী পুলিশ সুপার করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু এই নিয়ম অনুসরণ করা হয় না।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত বছর ২১ জন নিরস্ত্র পরিদর্শক ও ৫ জন শহর ও যানবাহন পরিদর্শক মিলে ২৭ জনকে সহকারী পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরে একজনকেও দেওয়া হয়নি। যদিও বর্তমানে পুলিশ বাহিনীতে ৬ হাজার ৮০২ জন ইন্সপেক্টর পদে কর্মরত রয়েছেন। এদের মধ্যে নিরস্ত্র ইন্সপেক্টর চার হাজার ৯১৫ জন, সশস্ত্র ইন্সপেক্টর ৯১১ জন এবং শহর ও যানবাহন ইন্সপেক্টর পদে ৯৭৬ জন দায়িত্ব পালন করছেন। এদের মধ্যে ৫০ ভাগের বেশি ইতিমধ্যে এএসপি পদে পদোন্নতি পাওয়ার শর্ত পূরণ করেছেন। কিন্তু তারা তাদের কাক্সিক্ষত পদোন্নতি পাচ্ছেন না। নিয়ম অনুযায়ী ইন্সপেক্টর পদে ন্যূনতম ৫ বছর চাকরি করার পরই তিনি সহকারী পুলিশ সুপার হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। তবে পুলিশ বাহিনীতে হাজার হাজার কর্মকর্তার পরিদর্শক পদে পাঁচ বছর পূর্ণ হলেও তারা পদোন্নতি পাননি। এমনকি কেউ কেউ ১০ বছর, কেউবা আবার ১২ বছর অতিক্রম করেও পদোন্নতির দেখা পাননি।
কেন পদোন্নতি হচ্ছে না এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জে দায়িত্ব পালনকারী একজন পরিদর্শক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন ও বিসিএস অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারাই পদোন্নতি সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক পর্যায়ে ভূমিকা পালন করে থাকেন। এছাড়া ইন্সপেক্টরদের এসিআর ও সার্ভিস বুক মূল্যায়নের দায়িত্ব থাকে এসপি ও এডিশনাল ডিআইজির ওপর। তারা কখনোই ইন্সপেক্টরদের পদোন্নতি চান না।’
ইতিমধ্যে পদোন্নতি পাওয়ার শর্ত পূরণ করা একাধিক পুলিশ পরিদর্শক দেশ রূপান্তরকে বলেন, পদোন্নতি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী নির্ধারিত সময় অন্তর অন্তর পদোন্নতি হবে এটাই মনে করেন তারা। কিন্তু সরকারি অন্যান্য সংস্থায় এই নিয়ম পালন করা হলেও পুলিশের ক্ষেত্রে অধিকাংশ পরিদর্শক তাদের চাকরি জীবন এই পদ দিয়েই সম্পন্ন করেন। হতাশার কথা বলেছেন অনেক কনস্টেবল, এএসআই ও এসআইরাও। দীর্ঘদিন ধরে একই পদে চাকরি করলেও তাদের অনেকেরই পদোন্নতি হচ্ছে না। একাধিক এসআই দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চাকরি জীবনে ৬ থেকে ৭ বার পদোন্নতি হয়। কিন্তু তাদের জীবনে একবারের বেশি হয় না।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী বাহিনীতে বর্তমানে এসআই (নিরস্ত্র) ১৯৮১৪ জন, এসআই (সশস্ত্র) ২৭৪০ জন, সার্জেন্ট ১৮৬৯ জন, টিএসআই ৪৩৮ জন, এএসআই ১৮৬১৭ জন, এটিএসআই ২০৩৫ জন, এএসআই (সশস্ত্র) ৫৮০২ জন, নায়েক ৭৬৬২ জন ও কনস্টবল- ১১৯৮৮২ জন দায়িত্ব পালন করছেন।
২০০৩ সালের নভেম্বরে এসআই (শিক্ষানবিশ) পদে যোগ দেওয়া পুলিশের এক কর্মকর্তা বর্তমানে ঢাকা মহানগর পুলিশের একটি থানায় পরিদর্শক পদে কর্মরত। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিক্ষানবিশ এসআই থেকে পরিদর্শক হওয়ার পর পেরিয়ে গেছে ৯ বছর। এরমধ্যে কোনো পদোন্নতি পাননি। আগামী আরও ৯ বছর পরও পদোন্নতির কোনো সম্ভাবনা নেই বলে জানান তিনি।
পদোন্নতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে পুলিশের আরেক পরিদর্শক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পদোন্নতি প্রদানের ক্ষেত্রে নানা অনিয়মের ঘটনায় ২০০৩ সালের দিকে আদালতে একটি মামলা হয়। সেই মামলার রায়ের পর পরিদর্শকদের পদোন্নতি দেওয়া শুরু হয়। পদোন্নতি প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো নীতিমালা কিংবা বিধি না থাকলেও পুলিশ সদর দপ্তরের আর অ্যান্ড পিসি শাখার মাধ্যমে পদোন্নতির কিছু নিয়মকানুন অনুসরণ করা হয়ে থাকে। সরাসরি বিসিএসের মাধ্যমে যারা যোগদান করেন তাদের ৬৭ ভাগ আর নন-গেজেটেড প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে পরিদর্শকদের মধ্যে থেকে ৩৩ ভাগ পদোন্নতির কথা শুনেছি। তবে সেই আনুপাতিক হিসাবও মানা হয় না এখন।’
একইভাবে কনস্টেবল থেকে নায়েক ও এএসআই পদে পদোন্নতির আশায় থাকলেও তা না পাওয়ায় অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দাবি করেন, শতভাগ কনস্টেবলকে এএসআই পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। পরবর্তী ধাপে এএসআই থেকে ৫০ ভাগকে এসআই পদে পদোন্নতি দেওয়া হয় বিভাগীয়ভাবে। বাকি ৫০ ভাগ সরাসরি নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে নেওয়া হয়। এরপর এসআই পদের কর্মকর্তাদের বিভাগীয় পদোন্নতির মাধ্যমে পরিদর্শক করা হয় বলে জানান তিনি।
এই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, একমাত্র পুলিশ বাহিনীতেই পরিদর্শক পদের মতো নন-ক্যাডার প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা থেকে পিএসসির মাধ্যমে এএসপি ক্যাডারভুক্ত হওয়ার সুযোগ আছে। যা অন্য কোনো সরকারি অধিদপ্তরে নেই। তিনি আরও বলেন, পরিদর্শক থেকে এএসপি পদে পদোন্নতির জন্য কাজে গতিশীলতা ও বুদ্ধিমত্তাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়ে থাকে। তাই বলে কোটার নিয়ম কখনোই অমান্য করা হয় না।
ডিএমপির জনসংযোগ শাখার অতিরিক্ত উপকমিশনার হাফিজ আল আসাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতি বছর কনস্টেবল থেকে এএসআই ও এএসআই থেকে এসআই বা সমমর্যাদার বিভিন্ন কর্মকর্তাকে পদোন্নতির জন্য নির্ধারিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। সেই পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হন কিংবা যোগ্য বলে বিবেচিত হন তাদের শূন্যপদের বিপরীতে পদোন্নতি দেওয়া হয়ে থাকে। আর পরিদর্শকদের ডিপার্টমেন্টাল প্রমোশন কমিটির (ডিপিসি) সুপারিশ অনুয়ায়ী পদোন্নতি হয়ে থাকে।’
