কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি দলীয়ভাবে অংশগ্রহণ না করলেও সেখানকার নির্বাচনী কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছেন দলটির নেতারা। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে কী নির্বাচন হবে তা আমরা জানি। এ কারণে আমরা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে নির্বাচনে অংশ না নিলেও নির্বাচনের নামে কুমিল্লায় কী হচ্ছে তা আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল দায়িত্ব নেওয়ার পর নিরপেক্ষভাবে কথা বললেও বাস্তবে দেখা গেল তিনি অসহায় হয়ে পড়েছেন। নির্দেশনা দিয়ে তার বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। কুসিক নির্বাচন সম্পর্কে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে কুসিক নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় আমরা মনিরুল হক সাক্কু, নিজাম উদ্দিন কায়সারকে দল থেকে বহিষ্কার করেছি। কুসিক নির্বাচনে আমরা অংশ না নিলেও গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে নির্বাচনের নামে সেখানে কী হচ্ছে তা জানতে পারছি। তাতে মনে হচ্ছে সেখানে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। তাছাড়া সিইসি যেভাবে তার হতাশার কথা বলছেন তাতে আমাদের কথাই সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না।’
স্বতন্ত্র প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও তার কর্মী-সমর্থকরা বিএনপির নেতাকর্মীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনে (ইসি) অভিযোগ করার পরও ইসি তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। এক এমপিকে এলাকা ছাড়ার জন্য সিইসি অনুরোধ জানালেও তাকে এলাকা ছাড়া করতে পারেনি। স্থানীয় প্রশাসন এখনো সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। এ অবস্থায় নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে তা এখনই বোঝা যাচ্ছে। তবে নির্বাচন সুষ্ঠু হলে আমার বিজয় সুনিশ্চিত।’
বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি না। আমরা জানি আওয়ামী লীগের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। তাই অংশ নিইনি। আমি এলাকায় যাচ্ছি না। নির্বাচনের খোঁজখবর রাখছি না। তবে কেন্দ্র থেকে নিশ্চয়ই কুসিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’
২০২০ সালের ১২ নভেম্বর ঢাকা-১৮ ও সিরাজগঞ্জ-১ আসনের উপনির্বাচনের পর আর কোনো নির্বাচনে যায়নি বিএনপি। গত বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি দলটির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, বর্তমান সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনেও তারা যাবে না। কিন্তু বিএনপি নির্বাচন বর্জন করায় মনিরুল হক সাক্কু ও নিজাম উদ্দিন কায়সার দুজনই দল থেকে পদত্যাগ করে মেয়র পদে মনোনয়নপত্র জমা দেন। দল সেই পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অপরাধে গত ১৯ মে তাদের চিরতরে বহিষ্কার করে। একই সঙ্গে সাক্কু ও কায়সারের পক্ষে কাজ না করতে দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কেন্দ্র থেকে। একইভাবে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
কুসিক নির্বাচন সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল তার দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেক কথা বলেছেন। নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করে আসছিলেন। কিন্তু যখনই তার কথা কাজে প্রমাণের সুযোগ এলো তখন তিনি ব্যর্থ হলেন। এতেই বোঝা যায় নিরপেক্ষ সরকার না হলে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়, তা আবারও প্রমাণ হতে যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘সিইসি যেভাবে তার অসহায়ত্ব দেখাচ্ছে তাতে দেশের সুশীল সমাজ, সাধারণ জনগণ বুঝে ফেলেছে তাকে দিয়ে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। আমরা আগেই জানতাম এমনটা হবে। এজন্য আমরা দলীয়ভাবে অংশগ্রহণ করছি না।’
গতকাল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেছেন সিইসি। বৈঠক শেষে তিনি বলেছেন, ‘ভারত, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ সব দেশেই দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হচ্ছে।’ সিইসির এমন বক্তব্য প্রসঙ্গে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যতই দিন যাচ্ছে ততই সিইসি তার চরিত্র প্রকাশ করছেন। টিআইবির প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠককালে সিইসি যা বলেছেন তা আরও মারাত্মক। সিইসি স্থানীয় সরকারদলীয় এক এমপিকে এলাকা ছাড়ার জন্য বললেও তার কথা না শুনে ওই এমপি এলাকায় অবস্থান করছেন। সিইসি এখানে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচন মানে জনগণ ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবে না। আর কেউ কেউ সুযোগ পেলেও যাকে ভোট দেবে তাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে না। শুধু সরকারের প্রার্থীকেই সিইসি বিজয়ী ঘোষণা করবে দিন শেষে।’
