দেশে গত ২০০৮ সালে বিশুদ্ধ রক্ত পরিসঞ্চালন আইন করে পেশাদার রক্ত কেনাবেচা বন্ধ করে সরকার। কর্মসূচির অধীনে ৪৯৫ উপজেলার মধ্যে ২০০ উপজেলায় সরকারিভাবে ব্লাড ব্যাংক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু গত ১৪ বছরে মাত্র ৮৫টি উপজেলায় ব্লাড ব্যাংক স্থাপন করতে পেরেছে। সে হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার ৫৮ শতাংশ ও মোট উপজেলার ৮৩ শতাংশ উপজেলায় কোনো ব্লাড ব্যাংক করা যায়নি।
এমন অবস্থায় এসব উপজেলায় বিশুদ্ধ রক্তের জন্য এখনো মানুষকে নির্ভর করতে হচ্ছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও আত্মীয়স্বজনের ওপর। এভাবে রক্ত সংগ্রহ করতে গিয়ে বিশুদ্ধ রক্তের সংকট দেখা দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ছাড়াই রক্ত পরিসঞ্চালন করতে গিয়ে শরীরে বাসা বাঁধছে নানা রোগ।
রক্ত পরিসঞ্চালন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রক্তদানে রক্তদাতার হেপাটাইটিস-বি, সি, এইচআইভি, ম্যালেরিয়া ও সিফিলিস পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক। এ পরীক্ষাগুলো অবশ্যই করতে হবে।
এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রান্সফিউশন (রক্ত পরিসঞ্চালন) মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘রক্তদানে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশুদ্ধ রক্ত পরিসঞ্চালন ব্যবস্থা রাখতে হবে। এখন আর পেশাদার রক্ত কেনাবেচা হয় না। সুতরাং হাসপাতালগুলোতে ব্লাড ব্যাংক স্থাপন জরুরি। এর জন্য খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন হয় না। প্যাথলজি বিভাগের মাধ্যমেই ব্লাড ব্যাংক করা যায়।’
চাহিদার ৩০% স্বেচ্ছাসেবকরা দিচ্ছেন : দেশে গত পাঁচ বছরে স্বেচ্ছাসেবকের মাধ্যমে রক্তদান ৪ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক ডা. আসাদুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে রক্তের মোট চাহিদার ৩৪ শতাংশ আসত স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে। সেটা এখন কমে ৩০ শতাংশ হয়েছে। তবে কভিডের কারণে গত দুই বছরে মোট রক্তদান কমে এক-তৃতীয়াংশে নেমেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা। এমনকি কভিডের কারণে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর রক্ত সংগ্রহে কিছুটা ভাটা পড়েছে।’
এ বিশেষজ্ঞ জানান, দেশে বছরে রক্তের মোট চাহিদা ১০ লাখ ব্যাগ বা ইউনিট। সেটার ৩০ শতাংশ আসে স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে। বাকিটা আসে আত্মীয়স্বজন-পরিচিতদের মাধ্যমে। এর মধ্যে ৯ লাখ আসে নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন কর্মসূচির মাধ্যমে। বাকি ১ লাখ ব্যাগ অন্যভাবে ব্যবস্থা হচ্ছে। সেটার ক্ষেত্রে কোনো তদারিক নেই। এখনো অনিবন্ধিত ব্লাড ব্যাংকগুলো এসব রক্ত সরবরাহ করছে।
৮৫ উপজেলায় ব্লাড ব্যাংক : অধ্যাপক ডা. আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘২০০২ সালে বিশুদ্ধ রক্ত পরিসঞ্চালন আইন হলো। আইনের বিধি হলো ২০০৮ সালে। তারপর থেকেই পেশাদার রক্ত কেনাবেচা বন্ধ। তখন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল দেশের ২০০ উপজেলায় বিশুদ্ধ রক্ত পরিসঞ্চালন কর্মসূচির অধীনে ব্লাড ব্যাংক করা হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত হয়েছে মাত্র ৮৫ উপজেলায়। ৩০টি জেলায় এক হাজার শিক্ষার্থী ব্লাড ডোনারের তালিকা করতে পেরেছি। এসব তালিকা জেলা হাসপাতালের সুপারিন্টেন্ডেন্টের কাছে আছে। এ তালিকা বাড়াতে হবে।’ তিনি আরও জানান, সারা দেশে ২২৩টি সরকারি রক্তদান কেন্দ্র। ১৬২ বেসরকারি। আর্মির ১৩টি।
পরীক্ষা ছাড়া রক্ত নয় : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক (হাসপাতাল) ও রক্ত পরিসঞ্চালন বিশেষজ্ঞ ডা. শেখ দাউদ আদনান বলেন, ‘আমরা কি প্রয়োজনীয় রক্ত নিচ্ছি, নাকি ধারণা থেকে রক্ত নিচ্ছি সেটা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা যে রক্ত নিচ্ছি সেটা সঠিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিচ্ছি কি না, সেটা দেখতে হবে। যদি নিয়েই থাকি টেস্ট করছি কি না, টেস্ট করার ক্ষমতা কতটুকু, যে পদ্ধতিতে রক্ত পরীক্ষা করছি, সেখানে পিছিয়ে রয়েছি কি না, সেটাও দেখতে হবে।’
এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘পৃথিবীর অনেক দেশে রক্তের অনেক উপাদান দিয়ে চিকিৎসা ক্ষেত্রে অনেক কিছু তৈরি হচ্ছে। যেসব দেশ গরিব বা ডোনার কম, সেসব দেশ তার দেশে সংগৃহীত রক্তের প্লাজমা আরেক দেশকে দেয়। তখন সে প্লাজমা দিয়ে বিভিন্ন জিনিস তৈরি করে সরবরাহ করে। শ্রীলঙ্কা প্লাজমায় খুব উন্নত। তারা এটার একটা প্ল্যান্ট তৈরি করেছে। শ্রীলঙ্কা, ইরান, তুরস্ক এসব ক্ষেত্রে খুব উন্নত। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো সেটা হয়নি।’
তিনি জানান, বাংলাদেশে সর্বশেষ কভিড শুরু হওয়ার আগে রক্ত সংগ্রহ হয়েছিল ৯ লাখ ৮০ হাজার ব্যাগ বা ইউনিট। এর সঙ্গে যুক্ত হবে আনরিপোর্টেড আরও ১ লাখ। সব মিলে ১০-১১ লাখ ব্যাগ। কভিডের সময় সেটা এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। এ বছরের রিপোর্ট এখনো তৈরি হয়নি।
এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘স্বেচ্ছায় রক্তদানের জন্য পাঠ্যসূচিতে রক্তদানের বিষয় অন্তুর্ভুক্ত করতে হবে। অন্তত একটা গল্প থাকতে হবে রক্তদানের ওপর। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।’
দুই মাসেই রক্তদাতার রক্তে সব উপাদান পূরণ হয় : ডা. শেখ দাউদ আদনান বলেন, ‘কেউ যদি এক ব্যাগ রক্ত দেয়, তাহলে রক্তের ৫৫ ভাগ জলীয় অংশ বা পানীয় অংশ। এটা পূরণ হয়ে যাবে দেওয়ার আট ঘণ্টার মধ্যে। পানির মধ্যে যেসব প্লাজমা, প্রোটিনসহ অন্যান্য উপাদান থাকে, সেটা দেওয়ার এক দিন পর মধ্যে পূরণ হয়ে যাবে। ডব্লিউভিসি যেটা গেছে, সেটা ৬-৮ ঘণ্টার মধ্যে পূরণ হওয়া শুরু হবে। ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হবে। প্লাটিলেট ৭-১০ দিনে পুরো স্বাভাবিক হবে। সবচেয়ে বেশি যেটা যায় আরবিসি, সেটা ৫৬ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ পূরণ হবে। অর্থাৎ রক্তের মাধ্যমে যেসব উপাদান শরীর থেকে যায়, সেগুলো সব পূরণ হওয়ার যোগ্য এবং একজন রক্তদাতা দুই মাসের মধ্যে সে আবার যা ছিল সেই জায়গায় চলে আসবে।’
এমনকি যিনি নিয়মিত রক্ত দেন, কোনো দুর্ঘটনায় তার শরীরে রক্তক্ষরণ সহ্য করার ক্ষমতা বেশি হয় বলেও জানান এই রক্ত পরিসঞ্চালন বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘একটা দুর্ঘটনায় একজন পুরুষের থেকে একজন নারী বেশি বাঁচে। কারণ একজন নারীর শরীর থেকে রক্তক্ষরণের অভিজ্ঞতা প্রাকৃতিকভাবেই বেশি। ফলে একটা দুর্ঘটনায় রক্তক্ষরণ হলেও একজন নারী সহজেই শকে চলে যায় না। কিন্তু পুরুষ যায়। কারণ পুরুষ অভ্যস্ত নয় রক্তক্ষরণে। যে ডোনার এরকম দুর্ঘটনায় সহ্য করতে পারে। এছাড়া রক্তদানের একটা স্পিরিচুয়াল পার্ট আছে। যিনি রক্ত দান করেন, সেদিন তার খুব ভালো লাগে। পৃথিবীতে আসা তার কাছে সার্থক মনে হয়।’
মোট চাহিদার প্রায় ১১ শতাংশ পূরণ করছে কোয়ান্টাম : কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, দেশে বছরে রক্তের চাহিদা প্রায় ৮-১০ লাখ ইউনিট। দেশের মোট চাহিদার প্রায় ১১ শতাংশ পূরণ করছে কোয়ান্টাম। কিন্তু এখনো প্রয়োজনীয় রক্তের একটি বড় অংশ আসে পেশাদার রক্ত বিক্রেতাদের কাছ থেকে। অথচ বাংলাদেশের জনসংখ্যার তুলনায় রক্তের চাহিদা একেবারেই নগণ্য। তারপরও দেশ স্বেচ্ছা রক্তদানে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারেনি।
কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন ১৯৯৬ সাল থেকে রক্তদান কার্যক্রম শুরু করে। ২০০০ সালে নিজস্ব আধুনিক ল্যাব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সব নিয়ম মেনে নিরাপদ রক্তের জোগান দিচ্ছে। এ পর্যন্ত কোয়ান্টাম ১৪ লাখ ইউনিট রক্ত ও রক্ত উপাদান সরবরাহ করেছে। প্রসেসিং খরচ দেওয়ারও সামর্থ্য নেই এমন মানুষকে সম্পূর্ণ ফ্রি রক্ত সরবরাহ করছে সংগঠনটি। ২০২০ সালে করোনাকালে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ল্যাব সরবরাহ করেছে প্রায় ৮৫ হাজার ইউনিট রক্ত ও রক্ত উপাদান।
ফাউন্ডেশন জানায়, সাধারণত রক্তস্বল্পতা, থ্যালাসেমিয়া, হিমোফিলিয়া ইত্যাদি রোগীর প্রয়োজনে রক্ত দিতে হয়। এছাড়া প্রসূতির রক্তক্ষরণ, অপারেশন, অগ্নিদগ্ধ বা দুর্ঘটনাজনিত রোগীর ক্ষেত্রেও রক্তের প্রয়োজন হয়। ১৮ থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত একজন সুস্থ মানুষ রক্ত দেওয়ার উপযুক্ত থাকেন।
আজ বিশ্ব রক্তদাতা দিবস : পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় ‘রক্তদান সংঘবদ্ধতারই প্রকাশ, এ কাজে যুক্ত হোন, জীবন বাঁচান’। এ বছর বিশ্ব রক্তদাতা দিবসের বিশ্বব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজক দেশ মেক্সিকো। দিবসটিকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হবে মেক্সিকো সিটিতে।
কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন যথাযোগ্য মর্যাদায় রক্তদাতা দিবস পালনে একাধিক বর্ণাঢ্য কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে রক্তাদাতাদের পদযাত্রা, ব্লাড ক্যাম্প ও রক্তদাতা সম্মাননা অনুষ্ঠান। সকাল ১০টায় রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘর প্রাঙ্গণ থেকে রক্তদান সচেতনতামূলক বর্ণিল পদযাত্রা শুরু হয়ে শেষ হবে জাতীয় প্রেস ক্লাবে। অন্তত ৫০ বার এবং ২৫ বার রক্ত দিয়েছেন এমন প্রায় ২০০ স্বেচ্ছা রক্তদাতা এ পদযাত্রায় অংশ নেবেন। বেলা সাড়ে ১১টায় প্রেস ক্লাব অডিটরিয়ামে আয়োজিত হবে রক্তদাতা সম্মাননা অনুষ্ঠান।
