বিষয়টি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতি ক্রমাগত প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা সত্ত্বেও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর মধ্যে দেশে নির্বাচন কমিশন (ইসি) আইন করা যায়নি। পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে অবশেষে দেশে ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন, ২০২২’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। এই আইন অনুসারে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও চারজন নির্বাচন কমিশনার (ইসি) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো এই নির্বাচন কমিশন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে দেশবাসীকে একটা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারবে কি না?
এই নতুন কমিশনের একটি পরীক্ষা হতে পারে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হলো নির্বাচনকালীন সরকারের ভূমিকা কী হবে? সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যতম কেন্দ্রীয় ভিত্তি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান। তাই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ এটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রথম ধাপও বটে। খেয়াল করা দরকার বর্তমান নির্বাচন কমিশন আইন অনুযায়ী নির্বাচনের সময় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা নির্বাচন কমিশনের অধীনে কাজ করবেন। তারা নির্বাচন কমিশনের আদেশ শুনতে বাধ্য। কিন্তু সেই আদেশ কেউ না শুনলে কী হবে, সে বিষয়ে আইনে কিছুই বলা হয়নি। এখানে এখন পর্যন্ত আশাবাদের জায়গা হলো নতুন নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের প্রায় কারোর যোগ্যতা নিয়েও বড় কোনো প্রশ্ন উঠতে দেখা যায়নি। তবে সাংবিধানিক এই কমিশনের সদস্যরা কতটা মেরুদ- সোজা রেখে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন, সেটাই দেখার বিষয়। অবশ্য এটাও ঠিক যে, কমিশন যত আন্তরিকই হোক না কেন ক্ষমতাসীন সরকার এবং প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে মুখ্য হয়ে উঠতে দেখা যায়।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন যদিও স্থানীয় সরকারের নির্বাচন। তবুও এই নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েন এবং নির্বাহী ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের দায়িত্ব পালনের কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় বিপক্ষ প্রার্থীর অনিয়মের অভিযোগ সত্ত্বেও কমিশনের অপারগতা ইতিমধ্যে কমিশনের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছে। নির্বাচনী নিরপেক্ষ সুযোগ দিতে না পেরে নির্বাচন কমিশন যে বক্তব্য দিয়েছে তা ঘটনার দায়দায়িত্ব এড়ানোর কৌশল ও বর্তমান ব্যবস্থায় কমিশনের অসহায়ত্ব প্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়। এত অনিয়মের মধ্যেও ইসির অভিযোগের অপেক্ষায় থাকার বিষয়টিকে দায়িত্বে অবহেলা বলেই মনে করছেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা। যেসব বিষয় এই সুষ্ঠু নির্বাচনকে ব্যাহত করে সেগুলো যাতে না ঘটে তা নিশ্চত করা তাদের দায়িত্ব। যারা হুমকিধমকি দিচ্ছে, সহিংসতা করছে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা আছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার। যে প্রার্থীর পক্ষ নিয়ে এসব করা হচ্ছে তাদের প্রার্থিতা বাতিলেরও বিধান আছে। এরপরও যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে, তবে কমিশন নির্বাচন স্থগিত করতে পারে। নির্বাচনে অনিয়ম সহিংসতা হলে তা বাতিল করতে পারে তদন্ত সাপেক্ষে। নির্বাচন কমিশন যদি তাদের ক্ষমতা ব্যবহার না করে তবে অপরাধীরা সুযোগ নেবে।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচনের লড়াইয়ে শেষমেশ কে জিতবেন তা নিয়ে নানা আলোচনার পাশাপাশি উঠে আসছে নতুন এই কমিশনের নির্বাচন অনুষ্ঠানে নিরপেক্ষতা ও দক্ষতার প্রমাণ হিসেবে। এই নির্বানে বিএনপি অংশ না নিলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেওয়া মনিরুল হক সাক্কু প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন আওয়ামী লীগ আরফানুল হক রিফাতের। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী নিজাম উদ্দিন কায়সার নিজের অবস্থান জানান দিয়েছেন। এদিকে একজন জনপ্রতিনিধির এলাকা না ছাড়া নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়ালের বক্তব্য কুসিক নির্বাচনের মাঠে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কুসিক নির্বাচন নতুন নির্বাচন কমিশনের জন্যও তাই অগ্নিপরীক্ষা। এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে কমিশনের প্রতি সাধারণ মানুষ আস্থা রাখবে আর উত্তীর্ণ না হলে আস্থা হারাবে। এ জন্য নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে হবে এবং নিরপেক্ষতার পরিচয় দিতে হবে। দেশে আরেকটা জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। এ নিয়ে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলগুলোও এখন থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনই সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে না পারলে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে জনগণের আস্থা তৈরি হবে কীভাবে?
