বাংলাদেশ পরপর দুই বছর পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত বায়ুর দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। একইভাবে বিগত কয়েক বছর ধরেই ঢাকা পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত বায়ুর রাজধানী হিসেবে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গবেষণার বরাতে এসব খবর এরই মধ্যে জানা গেছে। নতুন খবর হলো, দীর্ঘমেয়াদি বায়ুদূষণের কারণে মানুষের গড় আয়ুতে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। বিশ্বব্যাপী পরিচালিত নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, দূষণের কারণে পৃথিবীর মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু কমেছে অন্তত দুই বছর। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে কমেছে পাঁচ বছর করে। বিশে^র সবচেয়ে বেশি দূষণের শিকার পাঁচ দেশের চারটিই এই অঞ্চলের। এর মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু কমেছে সাত বছর। আর ভারতের কমেছে পাঁচ বছর করে। ভারতের রাজধানী দিল্লি বিশে^র সবচেয়ে দূষিত বায়ুর রাজধানী। এতে দিল্লিবাসীর প্রত্যাশিত গড় আয়ু কমেছে ১০ বছর করে। আর বিশে^র দ্বিতীয় দূষিত বায়ুর রাজধানী ঢাকার বাসিন্দাদের গড় আয়ু কমেছে আট বছর। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের (ইপিআইসি) গবেষকরা স্যাটেলাইট তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বিশে^র বিভিন্ন দেশের বাতাসে ক্ষতিকর কণা ‘পিএম ২.৫’-এর মাত্রার হিসাব করেছেন। এই কণা ফুসফুসের ক্ষতি করে এবং নানাবিধ রোগের সৃষ্টি করে। গবেষকরা জানিয়েছেন বাতাসে ক্ষতিকর কণা ‘পিএম ২.৫’-এর উপস্থিতির মাত্রানুযায়ী বাংলাদেশই এখন বিশে^র সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণের দেশ। প্রশ্ন হলো, বিশে^র সবচেয়ে বেশি দূষিত বায়ুর দেশ, দ্বিতীয় দূষিত বায়ুর রাজধানী কিংবা দেশের মানুষের প্রত্যাশিত গড় আয়ু সাত বছর কমে যাওয়ার খবরকে আমরা কতটা গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছি আর বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে কী নীতি প্রণয়ন করছি, কী কর্মকৌশল গ্রহণ করছি?
ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের (ইপিআইসি) এই গবেষণা প্রতিবেদনের বরাতে মঙ্গলবার রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখন বিশে^র ৯৭ শতাংশ মানুষই এমন এলাকায় বসবাস করছে, যেখানে বায়ুদূষণের মাত্রা সহনীয় সীমা ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিবেদনটি থেকে বোঝা যাচ্ছে, বায়ুদূষণ কেবল বাংলাদেশের স্থানীয় সমস্যা নয় একটি গুরুতর বৈশি^ক সমস্যা। কিন্তু এটা মাথায় রাখা দরকার, এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশের একটি হিসেবে বাংলাদেশের পরিবেশ-প্রতিবেশগত সংকট অনেক বেশি। তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি বায়ুদূষণের প্রভাব দেশের মানুষের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে কাজ করবে। ইপিআইসির গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদি বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেঁধে দেওয়া বায়ুদূষণের সীমা অর্থাৎ দূষণকারী কণার পরিমাণ প্রতি ঘনমিটারে ৫ মাইক্রোগ্রামের সূচক প্রয়োগ করে হিসাব করা হয়, তাহলে দেশে মাথাপিছু গড় আয়ু ছয় বছর নয় মাস করে কমছে। আর কিছু এলাকায় দূষণের মাত্রা এতই বেশি যে, সেখানে গড় আয়ু কমার পরিমাণ নয় বছর। অন্যদিকে, বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজেদের নির্ধারিত সীমা অর্থাৎ প্রতি ঘনমিটারে দূষণকারী কণার উপস্থিতি ১৫ মাইক্রোগ্রামও অতিক্রম করে গেছে। ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর এই বায়ুদূষণ জীবনকাল সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশে সবচেয়ে দূষিত শহর ঢাকার বাসিন্দারা গড়ে আট বছর করে আয়ু হারাচ্ছেন। আর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহানগর চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের আয়ু কমছে সাড়ে ছয় বছর করে। খেয়াল করার মতো বিষয় হলো কেবল যে ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় মহানগরগুলোই বায়ুদূষণের শিকার তা নয়; গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের ৬৪ জেলার সব কটিতেই বাতাসে দূষণকারী কণার উপস্থিতি ডব্লিউএইচওর সহনীয় সীমার চেয়ে বেশি।
স্মরণ করা দরকার, এর আগে আরেকটি গবেষণা প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছিল যে, বিশ্বে এখন বায়ুদূষণের সবচেয়ে বড় উৎস বা হটস্পট হয়ে উঠেছে দক্ষিণ এশিয়া। আর বায়ুদূষণজনিত কারণে মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ পঞ্চম। বৈশ্বিক বায়ুদূষণের ঝুঁকিবিষয়ক ‘দ্য স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছিল। ওই গবেষণায় বাংলাদেশে বায়ুদূষণের নতুন এক বিপদের কথাও উঠে এসেছে। সেটি হলো ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড গ্যাস বেড়ে যাওয়া। যেসব এলাকায় জনসংখ্যা ও যানবাহন চলাচল বেশি এবং যেসব এলাকায় বেশি সংখ্যায় উন্নয়ন প্রকল্প চলছে, সেখানেই এই গ্যাস বাড়তে দেখা গেছে। ২০২০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের এক জরিপে দেখা গিয়েছিল, ঢাকার বায়ুদূষণের ৫০ শতাংশই হচ্ছে তরল জ্বালানি পোড়ানোর মাধ্যমে তৈরি হওয়া ধোঁয়া ও ধুলা থেকে। ৪০ ভাগ দূষণের উৎস খড়, কাঠ, তুষের মতো জৈব বস্তুর ধোঁয়া ও সূক্ষ্ম বস্তুকণা। কিন্তু কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে বায়ুদূষণ নিয়ে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। জনস্বাস্থ্যের জন্য বায়ুদূষণের হুমকিকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তাই গুরুতর এই সংকট মোকাবিলায় যথাযথ নীতিকৌশল ও কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি।
