করোনা মহামারীসহ বিভিন্ন কারণে কয়েক দফা পেছানোর পর অবশেষে শুরু হয়েছে ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’। দেশের ইতিহাসে ষষ্ঠ এই জনশুমারি হচ্ছে ডিজিটাল পদ্ধতিতে। তবে জনশুমারির প্রথম দিন গতকাল বুধবার প্রথম প্রহরে কাজে নেমে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে গণনাকারীদের। তথ্য দিতে ভীতি, অস্বস্তিসহ সাধারণ মানুষকে বোঝাতেই দিনের অর্ধেক সময় পার হয়েছে তাদের। অবশ্য দিন শেষে উৎসবের আমেজেই তথ্য নিয়েছেন গণনাকারীরা।
এদিকে জনশুমারির প্রথম দিন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও তার পরিবারের এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য সংগ্রহ করেন গণনাকারীরা। গতকাল সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও তার পরিবারের খানার তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরিসংখ্যান ব্যুরোর গণনাকারীরা রাষ্ট্রপতিকে গণনাভুক্ত করেন। এ সময় রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জনশুমারি ও গৃহগণনার তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সঠিক তথ্য দিয়ে এ শুমারি সফল করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
অন্যদিকে গণভবনে নিজের তথ্য দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রকল্পের গণনাকারী শুক্রাবাদ নিউ মডেল বিশ^বিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী ফাতেমা তুজ জোহরা ইনা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন। এ সময় প্রকল্পের পরিচালক মো. দিলদার হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
দিলদার হোসেন জানান, প্রধানমন্ত্রী ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’ কার্যক্রমের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানতে চান। এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে তা অবহিত করা হয়।
দিনাজপুরের হাকিমপুরের গণনাকারীরা জানান, বয়স্কদের বুঝতে সমস্যা হচ্ছে। গণনাকারীদের দেখে অনেকে সরকারি কর্মকর্তা ভেবে ভয়েও তথ্য দিচ্ছেন না। প্রথম দিনে মাঠে কাজ করতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হয়েছে গণনাকারীদের। নিজেদের ট্যাব পরিচালনার চেয়েও বেশি সময় দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে জনশুমারি সম্পর্কে বোঝাতে।
চাঁদপুরের কয়েকজন গণনাকারী জানান, ব্যাংকের হিসাব আছে কি না, এমন তথ্য নিতে গেলে অনেক পরিবারের সদস্যরাই অস্বস্তিতে পড়ে যান। কেউ কেউ ভয়ও পান। কিন্তু গণনাকারী যখন বোঝাতে সক্ষম হন যে ব্যাংকে কত টাকা আছে তা বলতে হবে না, তখন তথ্য দিয়েছেন। এ ছাড়া বয়স্কদের তথ্য নিতে বেশি সময় ব্যয় হচ্ছে।
গতকাল বর্ণাঢ্য আয়োজনে জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২২-এর র্যালি বের হয়। রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ভবন থেকে বিজ্ঞান জাদুঘর পর্যন্ত র্যালিটি যায়। যার নেতৃত্বে ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম। এতে আরও অংশ নেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব ড. শাহনাজ আরেফিন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মহাপরিচালক মো. তাজুল ইসলাম ও জনশুমারি প্রকল্প পরিচালক মো. দিলদার হোসেন। এ ছাড়া পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং বিবিএসের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সরকারের সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর, অধিদপ্তর ও সংস্থার কর্মকর্তারা, বাংলাদেশ স্কাউটস, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) ও গার্লস গাইডের সদস্যরা র্যালিতে অংশ নেন। তথ্য সংগ্রহের শুরুর দিনে ঢাকা ছাড়াও সারা দেশে একযোগে বিভাগ পর্যায়ে বিভাগীয় কমিশনারের এবং জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে র্যালি বের হয়।
বিবিএস জানায়, প্রকল্পের আওতায় গতকাল থেকে শুরু হয়ে ২১ জুন পর্যন্ত দেশের প্রতিটি খানার তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। গণনাকারীরা দেশের প্রতিটি খানায় গিয়ে ট্যাবলেটের মাধ্যমে কম্পিউটার অ্যাসিস্টেড পারসোনাল ইন্টারভিউইং (কাপি) পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করছেন। গত মঙ্গলবার রাত শূন্য সময় থেকে দেশের প্রায় ২০ হাজার স্পটে ভাসমান ও ছিন্নমূল মানুষ গণনার মাধ্যমে শুরু হয়েছে ষষ্ঠ জনশুমারি।
প্রকল্প পরিচালক মো. দিলদার হোসেন জানান, গতকাল ভোর ৬টা পর্যন্ত ভাসমান মানুষ গণনা করা হয়েছে। এরপর সকাল ৮টা থেকে শুমারির মূল কাজ শুরু হয়েছে, যা ২১ জুন শেষ হবে। সারা দেশে একযোগে ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৬৯৭ জন গণনাকারী ট্যাবের সাহায্যে সাত দিন ধরে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে এই শুমারি পরিচালনা করবেন। ৬৩ হাজার ৫৪৮ জন সুপারভাইজার, ৩ হাজার ৭৭৯ জন আইটি সুপারভাইজার, ৩ হাজার ৭৭৯ জন জোনাল অফিসার, ১৬৩ জন জেলা শুমারি সমন্বয়কারী এবং ১২ জন বিভাগীয় শুমারি সমন্বয়কারীর মাধ্যমে এই ডিজিটাল শুমারি সম্পন্ন হবে।
চলমান এ শুমারিতে সাময়িকভাবে কলেজ অথবা স্নাতকে পড়–য়া প্রায় সাড়ে চার লাখ তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। সাত দিনের এ কর্মসূচির জন্য প্রত্যেক গণনাকারী পাবেন ১০ হাজার ৫০০ টাকা করে। এ ছাড়া সুপারভাইজাররা পাবেন ১১ হাজার টাকা করে। এ ছাড়া বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাড়ে ৪ হাজারের বেশি কর্মচারী এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত রয়েছেন। পাশাপাশি বিবিএসবহির্ভূত বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রায় ৯০০ জন কর্মচারী জোনাল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
গণনাকারীদের জন্য মোট ব্যয় হবে ৩৯০ কোটি এবং সুপারভাইজারদের জন্য ৭৭ কোটি টাকা। দুই খাত মিলিয়ে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ৪৬৭ কোটি টাকা। তথ্য সংগ্রহের জন্য সব গণনাকারীর হাতে একটি করে ট্যাব দেওয়া হয়েছে। তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারদের সুরক্ষায় তাদের একটি করে ছাতাও দেওয়া হয়েছে।
