এখনো অবহেলিত বীরাঙ্গনারা

আপডেট : ১৭ জুন ২০২২, ০২:০৫ এএম

দেশে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক-সাংস্কৃতিক নেতিবাচক মনোভাবের কারণে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বীরাঙ্গনারা এখনো প্রান্তিকীকরণের শিকার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে. বীরাঙ্গনাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও অধিকার প্রাপ্তির প্রক্রিয়া যেখানে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বাস্তবায়ন করা আবশ্যক, সেখানে পরিকল্পনাহীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি, কাঠামোগত জটিলতা, অনিয়ম-দুর্নীতির সুযোগ, জবাবদিহির ব্যবস্থায় ঘাটতি রয়েছে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও সামাজিক সচেতনতা ও সংবেদনশীলতার ঘাটতি রয়েছে। বীরাঙ্গনাদের নিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি ও নারীবিষয়ক প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের নির্দিষ্ট কিছুসংখ্যক কাজ থাকলেও তা নারীবিষয়ক অন্য যেকোনো কাজের তুলনায় বেশ অপ্রতুল। বীরাঙ্গনাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও অধিকার দেওয়ার এ প্রক্রিয়াটি গতানুগতিক প্রক্রিয়া থেকে ভিন্ন হলেও এ প্রক্রিয়াটিও গতানুগতিক আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতিনির্ভর হয়ে আছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার ‘বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও অধিকার : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ এবং উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংস্থাটি। এ উপলক্ষে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে এ সংকট উত্তরণে ১০ দফা সুপারিশ দেয় টিআইবি।

ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় নানা ধরনের সুশাসনের ঘাটতি বিদ্যমান। বীরাঙ্গনাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও অধিকার প্রাপ্তির এই সংবেদনশীল বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বাস্তবায়ন করা দরকার। অথচ পরিকল্পনাহীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি, কাঠামোগত জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতি নির্ভরতা, অনিয়ম-দুর্নীতির সুযোগ, জবাবদিহি ব্যবস্থা ও সংবেদনশীলতায় ঘাটতি প্রক্রিয়াটিকে বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই হয়রানি ও হতাশাব্যঞ্জক করে তুলেছে। সামাজিক সচেতনতা ও সংবেদনশীলতার ঘাটতিও বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধাদের ন্যায্য স্বীকৃতি ও অধিকার প্রাপ্তিতে প্রবল প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে টিআইবির উপদেষ্টা নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের ও গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান উপস্থিত ছিলেন। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, কোয়ালিটেটিভ রাবেয়া আক্তার কনিকা। গবেষণাটি তত্ত্বাবধান করেছেন একই বিভাগের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শাহজাদা এম আকরাম। সংবাদ সম্মেলনটি সঞ্চালনা করেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক শেখ মন্জুর-ই-আলম।

এ বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহের পর বিশ্লেষণ করে গুণগত পদ্ধতিতে গবেষণাটি করা হয়েছে।

আবেদনের ৬ বছরেও ঘর পাচ্ছেন না : গবেষণায় দেখা যায়, গেজেটভুক্তির আবেদন হতে শুরু করে গেজেটভুক্তির জন্য সর্বোচ্চ কত দিনে মধ্যে কার্যক্রম নিষ্পত্তি করতে হবে তার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা আইনে বা বিধিতে উল্লেখ নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩ বছরেরও বেশি সময় লেগে যায়। এ ছাড়া আবেদনপ্রাপ্তির তারিখ থেকে পরবর্তী ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে আবেদনটি নিষ্পত্তি করার নির্দেশনা থাকলেও ভাতা পেতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩-৬ মাস বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। অন্যদিকে ‘বীর নিবাস’-এর ঘরের জন্য আবেদন করার ৬ বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও ঘর না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আবার এ ঘর পাওয়ার জন্য ন্যূনতম জমির মালিকানার শর্ত দরিদ্র ও ভূমিহীন বীরাঙ্গনাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সনদ প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা থাকায় বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি করে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, জাতীয় পরিচয়পত্রে যে বয়স উল্লেখ করা রয়েছে তা অনুমানভিত্তিক, যার সঙ্গে প্রকৃত বয়সের ব্যাপক ব্যবধান রয়েছে। এ ছাড়া কিছু কিছু ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারদের কাছ থেকে প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করাটাও কঠিন হয়ে পড়ে।

বীরাঙ্গনাদের খুঁজে বের করার পরিকল্পনা নেই : গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় পর্যায়ে বীরাঙ্গনাদের খুঁজে বের করার বা চিহ্নিত করার কোনো পরিকল্পনা নেই। সংবেদনশীলতা রক্ষার স্বার্থে বীরাঙ্গনা হিসেবে শুধু যারা স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসবেন তাদের গেজেটভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সুনির্দিষ্ট কাঠামো না থাকার কারণে গেজেটভুক্তির জন্য সরকারের এ আহ্বান অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছায় না। ফলে এখন পর্যন্ত তালিকাভুক্ত ৪৪৮ বীরাঙ্গনার মধ্যে ৪৩৩ জন জীবিত অবস্থায় নিজেদের পক্ষে তালিকাভুক্ত হয়েছেন এবং ১৫ বীরাঙ্গনার মৃত্যুর পর তাদের পরিবারের সদস্যরা তাদের প্রতিনিধি হয়ে নাম তালিকাভুক্ত করেছেন। তা ছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দ করা সেবার তথ্যও পরিকল্পিতভাবে স্থানীয় পর্যায়ে প্রচার না করায় যথাসময়ে তথ্য পান না বলে অভিযোগ রয়েছে বীরাঙ্গনাদের।

গবেষণায় উঠে এসেছে, উপজেলা পর্যায়ে বীরাঙ্গনা বা মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেটভুক্তির প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য বিশেষ কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত পদ নেই। উল্টোদিকে অধিকাংশ বীরাঙ্গনা শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘাটতি এবং বয়সের কারণে গেজেটভুক্তির জন্য নির্ধারিত কার্যক্রম যথাযথভাবে সম্পাদন করতে জটিলতার সম্মুখীন হয়ে থাকেন।

তথ্যের অসংগতি : গবেষণা অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এখন পর্যন্ত গেজেটভুক্ত বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৪৪৮ জন, সেখানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এমআইএসে এন্ট্রি রয়েছে ৪০২ জনের। দুই জায়গায় একই ব্যক্তির নাম এবং বাবা বা স্বামীর নামের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন বানান, পদবি এমনকি ভিন্ন ভিন্ন নামও রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে থাকা ৪৪৮ বীরাঙ্গনার তালিকার মধ্যে ৮৯ বীরাঙ্গনার নামের সঙ্গে এমআইএসে উল্লিখিত নামের ভিন্নতা এবং বাবা বা স্বামীর নামের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন বানান, পদবি দেখা গেছে। এমনকি ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে ২০৭ জনের ক্ষেত্রে। এ ছাড়া গেজেটে অনেকের নাম, ঠিকানায় ভুল থাকায় আবাসনের জন্য আবেদন করতে পারছেন না অনেকেই।

গেজেটভুক্তিতে নানা অসহযোগিতা : গবেষণায় আরও দেখা যায়, সরকারি বা স্থানীয় পর্যায়ে কোনো তালিকা না থাকা এবং পারিবারিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক চাপে পরিচয় গোপনের কারণে বীরাঙ্গনাদের খুঁজে বের করা প্রথম ও বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রে, দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপন করে থাকা বা পরিচয় প্রকাশে শঙ্কিত এসব বীরাঙ্গনা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা পরিচয় গোপন করার চেষ্টা করেছেন। বীরাঙ্গনাদের গেজেটভুক্তির প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় প্রত্যয়নের কিছু কিছু ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের একাংশ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও জনপ্রতিনিধিদের অসহযোগিতামূলক আচরণের অভিযোগ আছে। এ ছাড়া বীরাঙ্গনাদের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের যোগাযোগেরও ঘাটতি রয়েছে।

অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকার : গবেষণায় উঠে এসেছে, গেজেটভুক্তির বিভিন্ন ধাপে বেশির ভাগ আবেদনকারী বীরাঙ্গনাই নানা পক্ষ থেকে বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকার। কিছু কিছু প্রত্যয়নের সময় নিয়মবহির্ভূতভাবে টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া প্রশাসনিক পর্যায়ে কোনো আবেদন জমা দেওয়ার সময় পিয়ন বা সহকারীদের চা-নাশতা খাওয়ার টাকা দেওয়ার এক ধরনের অলিখিত নিয়ম রয়েছে। আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য কোনো কোনো পক্ষ থেকে অবৈধভাবে অর্থ দাবি করা হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিতর্কিত ব্যক্তিদের গেজেটভুক্ত হয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

নেতিবাচক মনোভাব বিদ্যমান : গবেষণায় দেখা গেছে, এখনো দেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিসরে বীরাঙ্গনাদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব বিদ্যমান। স্বাধীনতার পর বীরাঙ্গনাদের অনেককে পরিবারের আশ্রয় হারাতে হয়েছে বা স্বামী সংসার থেকে বহিষ্কৃত হতে হয়েছিল। পরিবারে ফেরা প্রায় সবাই এত বছর ধরে আড়াল করে রাখা বীরাঙ্গনা পরিচয় সামনে আনতে অনেকে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। অনেক ক্ষেত্রে স্বীকৃতি নেওয়ার জন্য আবেদন করতে রাজি হওয়া বীরাঙ্গনাদের অনেককেই পরিবার-পরিজনের কাছে নতুনভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজের চাপে গেজেটভুক্তির আবেদন জমা দেওয়ার পরও তা তুলে ফেলতে বাধ্য করা হয়েছে।

এখনো অপদস্থ হচ্ছেন : গবেষণায় আরও বলা হয়, গেজেটভুক্তির প্রক্রিয়ায় অন্যতম জটিলতা হচ্ছে যাচাই-বাছাই কমিটির সামনে নির্যাতনের ঘটনা বর্ণনা করা, যা কোনোভাবেই সংবেদনশীল নয়। স্বীকৃতিপ্রাপ্তির পরও বীরাঙ্গনাদের পরিবার ও সমাজের দ্বারা হেনস্তার শিকার হতে হয়। সরকারের সম্মানী ভাতাকে স্থানীয় পর্যায়ে ‘পাঞ্জাবিদের ভাতা’ উল্লেখ করে বীরাঙ্গনাদের অপদস্থ করা হয়। অনেকে এ ক্ষেত্রে নিজেদের স্বীকৃতি ও ভাতাপ্রাপ্তির বিষয়টি এড়ানোর জন্য বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করেন। ভাতার টাকাটি তিনি নিজের স্বামীর অথবা বাবার মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার সুবাদে পাচ্ছেন বলে সন্তানদের বলে থাকেন। আবার ভাতার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে বীরাঙ্গনাদের পারিবারিক চাপের মুখোমুখি হতে হয়। এমনকি ভাতার টাকার অংশ না দেওয়া হলে মেয়েকে তালাক দেওয়ার হুমকির নজিরও রয়েছে।

১০ দফা সুপারিশ : এসব সংকট উত্তরণে ১০ দফা সুপারিশ করেছে টিআইবি। এর মধ্যে রয়েছে বীরাঙ্গনাদের খুঁজে বের করার জন্য নির্দিষ্ট কাঠামো ঠিক করা, উপজেলা পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী ও তরুণ প্রজন্মের নাগরিকদের নিয়ে কমিটি গড়ে তোলা যারা স্থানীয় পর্যায়ে বীরাঙ্গনাদের খুঁজে বের করবে এবং তালিকাভুক্ত করতে সার্বিক সহায়তা করবে; সমাজে বীরাঙ্গনাদের সম্মানজনক অবস্থানের জন্য তাদের অবদানকে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা; মুক্তিযুদ্ধ ও নারীবিষয়ক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বা কাজে বীরাঙ্গনাবিষয়ক কার্যক্রমসমূহ আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে এবং গণমাধ্যমে বীরাঙ্গনাদের অবদান গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা; স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসকেন্দ্রিক বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠানে বীরাঙ্গনাদের সম্পৃক্ত করা; বীরাঙ্গনাদের সামাজিক স্বীকৃতির জন্য সচেতনতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা, যাতে বীরাঙ্গনারা নিজেদের প্রাপ্য সম্মান গ্রহণের জন্য এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ হন ইত্যাদি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত