পদ্মা সেতু দক্ষিণ অঞ্চলের লাইফ লাইন : স্পিকার

আপডেট : ১৯ জুন ২০২২, ০১:৫৫ এএম

পদ্মা সেতু দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের জন্য অর্থনৈতিক লাইফ লাইন রূপে কাজ করবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ‘নাগরিক দৃষ্টিকোণ, আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও মর্যাদার প্রেক্ষাপট রয়েছে। এদেশের একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেই কী প্রাপ্তি ও অর্জন সেটির বিশ্লেষণ করলে পদ্মা সেতু বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে। দেশের বাণিজ্য, আঞ্চলিক বাণিজ্য, দক্ষিণ এশিয়ায় সংযোগ, শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠা, কৃষি সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখবে এই সেতু।

গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘শেখ হাসিনার পদ্মা সেতু নির্মাণ : বিশ্ব ব্যবস্থায় বাংলাদেশ তথা উন্নয়নশীল দেশসমূহের এক যুগান্তকারী বিজয়’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন তিনি। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক উপ-কমিটি এই সেমিনারের আয়োজন করে।

ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, ‘দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বহু কাক্সিক্ষত-প্রতীক্ষিত পদ্মা সেতু আজ আর স্বপ্ন নয়, নয় কোনো লিরিক কল্পনা। খরস্রোতা পদ্মা নদীর বুকে ৬.১৫  কিলোমিটার দৈর্ঘ্য নির্মিত পদ্মা সেতু আজ বাংলাদেশে বাস্তবতা। পদ্মা সেতু আমাদের অহংকার। বিজয়ের সেতু পদ্মা। বাঙালির আত্মমর্যাদা এবং আত্মনির্ভরতার এক অনন্য সোপান। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনে ৫০ বছরের পথ চলায় আমাদের জাতীয় জীবনে সক্ষমতা ও আত্মগৌরবের এক অতুলনীয় নিদর্শন এবং মাইলফলক। সব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে বিশ্বব্যাংকের ভিত্তিহীন অভিযোগ উপেক্ষা করে সব প্রতিকূলতা বাধা-বিপত্তি জয় করে কোনো চাপের কাছে নতিস্বীকার না করে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে দেশের সর্ববৃহৎ পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্পন্ন করেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অদম্য সাহস, প্রেরণা, সততা, দৃঢ়তা ও দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার কারণেই সেই সঙ্গে বাংলার মানুষের অপার ভালোবাসার কারণেই এই সেতু নির্মাণ সম্ভব হয়েছে। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের বহুমাত্রিক ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে। পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ অঞ্চলের শিল্প বিপ্লব ঘটবে। মেগা প্রকল্প কেন্দ্র করে সেখানে শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠবে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে। সেতুতে রেল যোগাযোগ চালু হলে ঢাকা থেকে কলকাতা সংযোগ চালু হবে যেটা আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে। শুধু বাণিজ্যিক নয় আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখবে। তাছাড়া, আমরা জানি বরিশাল অঞ্চলে অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় দরিদ্র দশভাগ বেশি। এই দারিদ্র্য কমিয়ে আনতে কাজ করতে সহায়তা করবে এই পদ্মা সেতু। যোগাযোগ উন্নয়নের ফলে সেখানকার কৃষকরা তাদের যে ফসল রয়েছে তা বাজারমূল্য পাবে এতে তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটবে। এর ফলে এখানে কর্মসংস্থানের একটি বড় জায়গা তৈরি হবে।’

ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, পদ্মা সেতু কেবল ইট পাথরের তৈরি সেতু নয় এর সঙ্গে মিশে আছে আমাদের ভালোবাসা, আমাদের গৌরব। শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নেই এটা বাস্তবায়ন করেছেন। বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসার কারণেই এটি তিনি বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন। পদ্মা সেতু আমাদের বিজয়ের প্রতীক, আমাদের উন্নয়নের প্রতীক, আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতীক, আমাদের হার না মানার প্রতীক। পদ্মা সেতু আমাদের গণতন্ত্রের প্রতীক। গত ১০ বছরের দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত সফল করতে সাহায্য করেছে। আজ পদ্মা সেতু নিয়ে বাড়িতে আলোচনা হয়, পরিবারে আলোচনা হয়।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. সামসুল আলম বলেন, ‘২০০১ সালের ৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী মাওয়া প্রান্তে এটা উদ্বোধন করেছিলেন। তারপর কোনো কাজ হয়নি। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট তৈরি করেন। সেখানে এটা বাস্তবায়নের মেয়াদ ছিল ২০১৪-১৫ অর্থবছর। ২০০৭ সালে এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার ১৬১.৫১ মিলিয়ন টাকা। সে সময় ডলারের দাম ছিল প্রতি ডলার ৭০ টাকা। তারা তখন কিছু করে যেতে পারেননি। ২০০৯ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় এসে প্রথম বার এটির ব্যয় ২০০৯ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করেন। তারপর আবার ২০১৮ মেয়াদে বাড়ানো হয় ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। সর্বশেষ খরচ হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটা বলার অর্থ কীভাবে টাকার পরিমাণটা বেড়েছে। অর্থনৈতিক লাভ কী হবে সেটি প্রথম বলা হয়েছিল ১.২৩ শতাংশ জিডিপিতে যুক্ত হবে। আর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলায় জিডিপি হবে ২.৪ শতাংশ। তখন কিন্তু আমাদের পায়রা সমুদ্রবন্দর হয়নি, মংলা বন্দরও এত আধুনিকায়ন হয়নি। আমাদের পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রও ছিল না। এই যে পর্যাপ্ত বিদ্যুতের সুবিধা এখন। আগে সেটি ছিল না। তখন জিডিপির প্রবৃদ্ধি যে ধরা হয়েছিল সেটি কম ধরা হয়েছে। সবগুলো মিলিয়ে দেখলে আমাদের প্রবৃদ্ধির হার বাড়বে।’

অর্থনীতিবিদ ড. এম খলিকুজ্জামান বলেন, ‘সারা দেশে যে যোগাযোগ বিস্তৃত হলো সেটা আমরা জানি। অর্থনৈতিক অগ্রগতি হবে, অনেক শিল্প সৃষ্টি হবে, আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে। মংলা বন্দর, বেনাপোল বন্দর রয়েছে সেটি আগের তুলনায় বেশি ব্যবহার হবে। ফলে আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি হবে। আমাদের সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।’

পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য পানিসম্পদ ও জলবায়ু বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় পদ্মা সেতুর কোয়ালিটির (মান) বিষয়ে কোনো ধরনের কমপ্রোমাইজ (আপস) করা হয়নি। আমি পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজের সঙ্গে শুরু থেকেই ছিলাম, আমি বিষয়টা জানি। যত ধরনের দুর্যোগ হতে পারে, আমরা সব মাথায় রেখেই সেতু নির্মাণ করেছি। পদ্মার মতো নদীতে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানবে। কত জোরে আঘাত হানতে পারে, সেগুলো মোকাবিলা করবার মতো সক্ষমতা তৈরি করেই আমরা সেতু নির্মাণ করেছি।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানের সভাপতিত্বে সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন, সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার ড. গোলাম রহমান, আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদ প্রমুখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত