বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্যের অস্থিরতার জেরে দেশে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশের বাজারেও পড়েছে। মে মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ। এর আগের মাসে ছিল ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ ছিল। মে মাসে খাদ্যে এই মূল্যস্ফীতি এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশ্ববাজারে অস্থিরতা ও দেশে চলমান বন্যা পরিস্থিতির কারণে খাদ্যের দাম আরও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গতকাল রবিবার মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে। পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসওয়ারি বা মাসভিত্তিক) বিবিএস এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সাধারণ ভোক্তারা যেসব পণ্য বেশি কেনেন, সেগুলোর গড় দামের হিসাব সুনির্দিষ্টভাবে বিবিএসের হালনাগাদ তথ্যে উঠে আসেনি। বাস্তবতা হলো, সাধারণ ভোক্তাদের আরও বেশি দামে পণ্য কিনতে হয়।
বিবিএস প্রকাশিত তথ্যে শঙ্কা জাগিয়েছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি। খাদ্যের মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, মে মাসে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। এপ্রিলে যা ছিল ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ।
সরকারি সংস্থা বিবিএসের তথ্যে দেখা যায়, পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে গত মে মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ। এর অর্থ হলো, ২০২১ সালের মে মাসে যে পণ্য বা সেবার জন্য ১০০ টাকা খরচ করতে হতো, ২০২২ সালের মে মাসে সেই পণ্য বা সেবার জন্য ১০৭ টাকা ৪২ পয়সা খরচ করতে হয়েছে। এ ছাড়া ২০২১ সালের মে মাসে খাদ্যপণ্য বা খাবারের জন্য ১০০ টাকা খরচ করতে হতো, চলতি বছরের মে মাসে সেই খাবারের জন্য ১০৮ টাকা ৩০ পয়সা খরচ করতে হয়েছে।
বিবিএস সূত্রে জানা গেছে, গত মে মাসে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। গত বছরের মে মাসের খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল ৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি হয়েছে মে মাসে ৬ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, যা এপ্রিল মাসের চেয়ে কিছুটা কম। এপ্রিল মাসে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
বিবিএসের প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, গ্রামের চেয়ে শহরের মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেশি। শহরের মূল্যস্ফীতি ৮ ছুঁই ছুঁই, যা ৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ। অবশ্য গ্রামের মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। খাদ্যে মূল্যস্ফীতিও শহরাঞ্চলে ৯ শতাংশ ছুঁই ছুঁই করছে। মে মাসে শহরাঞ্চলে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৮৪ শতাংশে। এর আগের মাসেও তা ৬ দশমিক ৬৪ শতাংশে ছিল। গ্রামাঞ্চলে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশে, এর আগের মাসে অর্থাৎ এপ্রিলে ছিল ৫ দশমিক ৩১ শতাংশ।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, ২০১১-১২ অর্থবছরে সার্বিক গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১০ দশমিক ৬২ শতাংশ। ওই বছরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ১০ দশমিক ৪৭ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য হালনাগাদে দেখা যায়, ২০১২-১৩ অর্থবছরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ৭০ শতাংশে নেমে আসে। ওই বছরে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি হয় ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এর পর থেকে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচক নিম্নমুখীই ছিল।
বিবিএসের মে মাসের সার্বিক মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চার-পাঁচ মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের আশপাশে ছিল। মে মাসে তা ৭ শতাংশ পেরিয়ে গেল। এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতির এত বড় উল্লম্ফন গত কয়েক বছরে দেখা যায়নি।
উল্লেখ্য, ৯ জুন সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
বেশ কিছুদিন ধরেই সরকার বা বিবিএসের দেওয়া হিসাবের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বাস্তবে অনেক বেশি বলে আসছেন অর্থনীতিবিদরা।
মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার তথ্যটি বাস্তবভিত্তিক কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাধারণ ভোক্তারা যেসব পণ্য বেশি ভোগ করেন, সেটির প্রতিফলন ঠিকভাবে হয় না। সাধারণ ভোক্তারা আরও বেশি দামে পণ্য কেনেন। সেখানে মূল্যস্ফীতি আরও বেশি হয়েছে। তারা চাল, ডাল, গম, তেলসহ কয়েকটি পণ্য বেশি কিনে থাকেন। সেগুলোর মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের থেকেও বেশি। তিনি বলেন, ‘প্রথম কথা হলো বিবিএসের পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি যে বাড়ছে, বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি যে বাড়ছে, সেটা আমাদের নিম্ন আয়ের মানুষ বা স্থির আয়ের মানুষ, তাদের যে ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে, সেটারই একটা প্রতিফলন। দ্বিতীয়ত, যারা নিম্ন আয়ের মানুষ তারা যেসব পণ্য ভোগ করে, সেই পণ্যগুলোর মূল্যস্ফীতি বিবিএসের দেওয়া তথ্যের চেয়েও বেশি। তৃতীয়ত, এই মূল্যস্ফীতির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারে যে দাম বেড়েছে এবং সম্প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার যে অবমূল্যায়ন হয়েছে, সেটিও এখানে দায়ী। এই দুই ধরনের অভিঘাত এসে পড়েছে মূল্যস্ফীতিতে।’
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মূল্যস্ফীতি কখনোই এতটা বেশি হয়নি। অবশ্য এর আগের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এই হার ১০ শতাংশের আশপাশে ছিল। তবে সেটি কমে আসে পরে। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তৃতীয় মেয়াদে মূল্যস্ফীতির সর্বোচ্চ হার পাওয়া গেল গত মে মাসে। সরকারি হিসাবেই মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের ঘর ছাড়িয়ে ৭ দশমিক ৪২ শতাংশে উঠেছে। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও বেশি, ৮ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে সরকারকে পরামর্শ দিয়ে ড. মোস্তাফিজ বলেন, সরকার বাজার ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত করে, শুল্ক সমন্বয় করে, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে যে প্রাপ্যতা এবং এটার যে ভিত্তি তা বিস্তৃত করে খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি আরও বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে এ অবস্থা থেকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিতে পারে।
