উত্তর ও মধ্যাঞ্চল

জুলাই মাসে আরেক দফা বন্যার ঝুঁকি

আপডেট : ২১ জুন ২০২২, ০১:৫৬ এএম

স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যায় ডুবেছে সিলেট-সুনামগঞ্জসহ দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদ। উজানে থেকে নেমে আসা ঢল আর অতিভারী বর্ষণে সুরমা-কুশিয়ারার পানি প্রবাহিত হচ্ছে বিপদসীমার রেকর্ড উচ্চতায়। তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, যমুনা ও পদ্মার পানিও বিভিন্ন স্থানে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আবহাওয়া অধিদপ্তর চলতি মাসের বাকি কয়েক দিন দেশের বিভিন্ন এলাকায় যে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে তা নতুন করে বাড়াচ্ছে উদ্বেগ। আবহাওয়া অফিস বলছে, চলতি মাসের বাকি কদিন মধ্যাঞ্চল ছাড়া দেশের বেশিরভাগ এলাকায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে সিলেট-সুনামগঞ্জের পাশাপাশি ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা ও গাঙ্গেয় অববাহিকার বন্যা পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে ভোগান্তির কারণ হতে পারে। আর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, সপ্তাহখানেকের মধ্যে চলতি বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও জুলাই মাসে উত্তরাঞ্চলের ব্রহ্মপুত্র অববাহিকাসহ মধ্যাঞ্চলে বন্যা হতে পারে একাধিক দফায়।

গতকাল সোমবার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র ১৫ দিন মেয়াদি যে পূর্বাভাস দিয়েছে তাতে বলা হয়েছে, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার যমুনা নদীর বাহাদুরবাদ ঘাট পয়েন্ট দিয়ে গতকাল প্রতি সেকেন্ডে ৫৭ হাজার ঘন মিটার (কিউসেক) পানি প্রবাহিত হয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও মেঘালয়ে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে বুধবার তা বেড়ে প্রায় ৬০ হাজার কিউসেকে পৌঁছতে পারে। তবে আগামী এক সপ্তাহে তা কমে ৪০ হাজার কিউসেকের নিচে নামতে পারে। এতে ওই সময় ব্রহ্মপুত্র ও গাঙ্গেয় অববাহিকাসংশ্লিষ্ট নদ-নদীর পানি বিপদসীমার নিচে নেমে আসতে পারে। তবে জুলাই মাসের শুরু থেকে ফের বেড়ে উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের কয়েকটি এলাকা আরেক দফা প্লাবিত হতে পারে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, ৩ জুলাই থেকে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নদ-নদীগুলোর পানি আরও বিপদসীমা পেরিয়ে যেতে পারে। ওই সময় ৪৭ থেকে ৪৮ হাজার কিউসেক পানি প্রবাহিত হতে পারে বাহাদুরবাদ পয়েন্ট দিয়ে। ৫ জুলাইয়ের পর তা ৫০ হাজার কিউসেক অতিক্রম করতে পারে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জামালপুরের বাহাদুরবাদ ঘাট, পাবনার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও ভৈরববাজার পয়েন্টে পরবর্তী ১৫ দিন পানি বিপদসীমার ওপরে বা নিচে প্রবাহিত হওয়ার যে সম্ভাবনা রয়েছে তারও একটি ধারণা দিয়েছে। সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, বাহাদুরবাদ ঘাট পয়েন্টে এখনো পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ছয় দিন তা অব্যাহত থাকবে। পরের ছয় দিন তা বিপদসীমার সমতলে অবস্থান করতে পারে। এরপর জুলাই মাসের শুরু থেকে ফের বিপদসীমা ছাড়াতে পারে ওই পয়েন্টের পানি প্রবাহ।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী কয়েক দিন ভারতের মেঘালয় ও আসামে বৃষ্টি হলে বাংলাদেশে উজান থেকে পানি আসা বন্ধ হবে না। সে ক্ষেত্রে উজানের ঢলের সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে ভারী বৃষ্টি জুলাই মাসেও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূঁইয়ার ভাষ্য, উজানে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। দেশেও ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। এ বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে ব্রহ্মপুত্র ও সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকায় পানি ওঠানামা করবে। পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি ও শিলিগুড়ি অঞ্চলের ভারী বর্ষণের কারণে গাঙ্গেয় অববাহিকায়ও বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, মৌসুমি বায়ু হঠাৎ করে তীব্র শক্তি নিয়ে হিমালয়ের উঁচু পাহাড়গুলোতে আছড়ে পড়ছে, যা ভারী বৃষ্টি তৈরি করছে। এ অবস্থা এবার বর্ষাকালে একাধিকবার ঘটতে পারে। তাতে পুরো বন্যা না হলেও কয়েকটি এলাকায় জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর তিন মাস মেয়াদি পূর্বাভাসে বলেছে, জুলাই মাসেও বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় একাধিক মৌসুমি নিম্নচাপ সৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। তার মানে ওই মাসে দুই দফায় ভারী বর্ষণের ঝুঁকি আছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়।

এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাডিসনের ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিনের বায়ুমণ্ডল বিশেষজ্ঞ এবং দেশটির জাতীয় পরিবেশ তথ্য কেন্দ্রের প্রধান ও অধ্যাপক জিম কোসিনের নেতৃত্বে কয়েক বছর আগের এক গবেষণা বলছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নসহ নানা কারণে মৌসুমি নিম্নচাপের ধাবমান ক্ষমতা আগের তুলনায় কমেছে। সে কারণে একই জায়গায় আগের তুলনায় বেশি সময় অবস্থান করছে নিম্নচাপের কেন্দ্র। ফলে সমুদ্র থেকে আসা বিপুল মেঘমালা বেশি সময় ধরে বৃষ্টি হয়ে ঝরছে একই এলাকায়। ‘এ গ্লোবাল সেøাডাউন অব ট্রপিক্যাল সাইক্লোন ট্রান্সলেশন স্পিড’ শিরোনামে জিম কোসিনদের গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, ১৯৪৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর ঘূর্ণিঝড়গুলো পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের পর গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন যে, আলোচ্য সময়ের মধ্যে নিম্নচাপের এক স্থান থেকে আরেক স্থানে চলন সক্ষমতা আগের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি ধীরগতির হয়ে পড়েছে। আর ধীরগতির এ ঘূর্ণিঝড়ের মেঘে বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্প যোগ হয়ে বেশি বৃষ্টিপাত ঘটাচ্ছে। আর এ ঘটনাই বাড়াচ্ছে বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি। অধ্যাপক জিম কোসিন বলেন, স্থলভাগের মৌসুমি নিম্নচাপের এই ধাবমান ক্ষমতা কমে যাওয়ায় স্পষ্টভাবেই স্থানীয়ভাবে বৃষ্টিপাত বাড়াচ্ছে। বাড়াচ্ছে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত